দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে টোটাল এনার্জিসের কাছ থেকে দরপত্র ছাড়াই এবার ১৮ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ‘জরুরি গ্যাসের চাহিদা’ পূরণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আগামী অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুই কার্গো করে এই এলএনজি কেনা হবে। প্রয়োজনে উভয়পক্ষের সম্মতিতে ১৮ কার্গোর অধিক কেনা হতে পারে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে ‘সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’। এ ছাড়া সার আমদানিসহ ১২টি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ক্রয় কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এর আগে গত অগাস্টে দরপত্র ছাড়া দুই দফায় ২২ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। ১৯শে আগস্ট সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৭টি কোম্পানি থেকে ২ কার্গো করে মোট ১৪টি কার্গো এলএনজি কেনার। তার আগে ৬ আগস্ট একইভাবে ৮ কার্গো এলএনজি এবং দেশের ‘আপৎকালীন’ এলপিজি চাহিদা পূরণ ও বাজারের ‘স্থিতিশীলতা’ নিশ্চিত করতে ৫ হাজার টন এলপিজি আমদানিরও সিদ্ধান্ত হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, বৈঠকে প্রয়োজনে দু’পক্ষের (সরকার ও টোটাল এনার্জিস) সম্মতিতে আরও অতিরিক্ত কার্গো এলএনজি কেনার নীতিগত অনুমোদন হয়েছে। দরপত্র ছাড়া সরাসরি কেনাকাটা করতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের নীতিগত অনুমোদন লাগে। তবে ডিজেল, উড়োজাহাজের জ্বালানি ও ফার্নেস অয়েল কেনার পাঁচটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়নি। এসব প্রস্তাবে সুপারিশ করা দরদাতাদের সঙ্গে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত মূল্য ও ভিত্তিমূল্য নিয়ে আলোচনা করে পাওয়া দর পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে টোটাল এনার্জিসের কাছ থেকে সরাসরি এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। প্রতি একক এলএনজির দর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জেকেএম মূল্যের সঙ্গে দশমিক শূন্য ছয় ডলার যোগ করে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পাঁচটি প্যাকেজে ডিজেল, জেট এ-১ ও ফার্নেস অয়েল কেনার প্রস্তাব করা হয়। এসব প্যাকেজে মোট সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য প্রায় ১১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। তবে পাঁচটি প্যাকেজের কোনোটির ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত ক্রয় অনুমোদন দেয়া হয়নি।
পিজি-১ প্যাকেজের আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল এবং ৫০ হাজার টন জেট এ-১ কেনার প্রস্তাব করা হয়। এর সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য ধরা হয় ৪ হাজার ৮০৩ কোটি ২ লাখ টাকা। এ প্যাকেজে ট্রাফিগুরা প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা দরদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পিজি-২ প্যাকেজে ২ লাখ থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং ৪০ হাজার টন জেট এ-১ কেনার প্রস্তাব করা হয়। এর সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য ৪ হাজার ৩২৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ প্যাকেজে ভিটল এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা দরদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পিজি-৩ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন ডিজেল কেনার প্রস্তাব করা হয়। এর সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য ৭৯২ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ প্যাকেজে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা দরদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পিজি-৪ প্যাকেজে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টন ডিজেল কেনার প্রস্তাব করা হয়। এর সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য ১ হাজার ১৮৯ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রেও ভিটল এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা দরদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পিজি-৫ প্যাকেজের আওতায় ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল কেনার প্রস্তাব করা হয়। এর সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য ৮০১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ প্যাকেজে ট্রাফিগুরা প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা দরদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এক কার্গো এলএনজি আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির প্রস্তাবিত দর ধরা হয়েছে জেকেএম+০.০৬ ডলার।
বৈঠকে বেসরকারি পর্যায়ে বেলারুশ থেকে ‘মেসার্স সুফলা ট্রেডিং কর্পোরেশন’-এর মাধ্যমে ৩০ হাজার টন এমওপি সার আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি টন ৩৯৮.৯৭ ডলার দরে এতে ব্যয় হবে ১ কোটি ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ১০০ ডলার।
অপর দু’টি প্রস্তাবের মধ্যে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে বিএডিসি ও মরক্কোর ‘ওসিপি নিউট্রিক্রপস এসএ’ থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি টন ৮৮৯.৩৩ ডলার দরে এতে ব্যয় হবে ৪৩৯ কোটি ৮৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় সৌদি আরব-এর ‘সাবিক ‘এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি’ থেকে ৪০ হাজার টন বাল্ক গ্রানুলার ইউরিয়া সার আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি টন ৩৯১.৬৬ ডলার দরে এতে ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে উন্মুক্ত দরপত্র (জাতীয়) পদ্ধতিতে ১ কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্রান তেল এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৯ হাজার টন ছোলা ক্রয়ের দু’টি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ লিটার পেট বোতলে ৩টি প্রতিষ্ঠান (মজুমদার ব্রান অয়েল মিলস লিমিটেড ৬০ লাখ লিটার; গ্রিন অয়েল অ্যান্ড পোল্ট্রি ফিড ইন্ডস্ট্রিজ ২০ লাখ লিটার ও প্রধান অয়েল মিলস লিমিটেড ২০ লাখ লিটার) ১ কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্রান তেল সরবরাহ করবে। প্রতি লিটার ১৮১ টাকা ৫০ পয়সা দরে এতে ব্যয় হবে ১৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, অন্যান্যের মধ্যে পৃথক প্রস্তাবের দু’টি প্যাকেজে জাইকার অর্থায়নে ৩৬৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন; ১৪৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেটের সুনামগঞ্জে ২০২২ সালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-সেতু-কালভার্ট পুনর্নির্মাণ; ২৭৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্বব্যাংবের অর্থায়নে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে পরিবহন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ উন্নয়নে দুটি পৃথক পূর্ত কাজের প্যাকেজের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
