চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে জাতীয় শুটিং ফেডারেশনের কার্তুজ ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)-এর পরিচালক টিটন খিসা এই তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২০ সাল থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্লাবের উত্তোলিত গুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব তলব করেছে এনএসসির এই কমিটি। উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতে অবৈধভাবে গোলাবারুদ কেনাবেচা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পটুয়াখালী রাইফেল ক্লাবের গোলাম মোস্তফা মিন্টু, রাজধানী শুটিং ক্লাবের মীর দৌলত হোসেন এবং চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের আব্দুল মালেককে গুরুত্বপূর্ণ সাব-কমিটিগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করেছে ফেডারেশন। ফেডারেশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় অ্যাডহক কমিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাকিফ শামীম সম্পূর্ণ একক কর্তৃত্বে এই বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসিত করেছেন।
এমনকি গণঅভ্যুত্থান দমনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিদ্ধ সেই ‘রাজধানী শুটিং ক্লাব’কে তিনি নতুন করে গুলিও বরাদ্দ দিয়েছেন। শুটিং ক্লাব সুত্রে জানা যায়, জুলাই আন্দোলন দমনে ক্লাবের গুলি অবৈধভাবে ব্যবহারের প্রথম তদন্ত শুরু হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। গুলির হিসাব চেয়ে ৯টি ক্লাবকে চিঠি দিলে মাত্র ৪টি ক্লাব জমা দেয়। পিরোজপুর রাইফেল ক্লাবের গোলাম মোস্তফা মিন্টু ১২ বোর বন্দুকের কার্তুজ ১১ হাজার ৩৫টি, পয়েন্ট ২২ বোর (৫.৫০ এয়ার প্লেটর্স) ২৬ হাজার, পয়েন্ট ২২ বোর কার্তুজ ৯ হাজার ৯০০টি, পয়েন্ট ১৭৭ এয়ার প্লেটর্স ১ লাখ ১৫ হাজার এবং ৩টি এয়ার রাইফেলস (মডেল ৬৩৪) গুলি উত্তোলন করলেও ক্লাবের নথিপত্রে উল্লেখ করেননি। রাজধানী শুটিং ক্লাবের মীর দৌলত হোসেন ১২ বোর বন্দুকের কার্তুজ ২৯ হাজার ৯০টি, পয়েন্ট ২২ বোর (৫.৫০ এয়ার প্লেটর্স) ৫১ হাজার ৫০০টি, পয়েন্ট ২২ বোর কার্তুজ ২৩ হাজার ৮৫০টি, পয়েন্ট ১৭৭ এয়ার প্লেটর্স ২ লাখ ৯৮ হাজার ৫০০টি, ৭এমএম কার্তুজ ২০টি, ৩২ বোর কার্তুজ ২৪০ এবং ৮টি এয়ার রাইফেলস (মডেল ৬৩৪) উত্তোলন নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। ফেডারেশনের বরাদ্দপত্র অনুযায়ী অস্ত্র ও গুলি উত্তোলনের সময় সংশ্লিষ্ট ক্লাব সভাপতি এবং জেলা পর্যায়ের ক্লাবের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক অথরাইজেশন গ্রহণ করা জরুরি। কিন্তু অভিযুক্ত ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয়নি। এ কারণে বিপুল পরিমাণ গুলি সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায়। চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে প্রায় একই রকম অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে এই তিন ব্যক্তিকে তদন্তের আওতায় আনছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত কমিটি। তদন্তের আওতায় থাকলেও ফেডারেশনের অর্থ উপ কমিটি এবং আমদানি ও বরাদ্দ উপ কমিটির সদস্য করা হয়েছে রাজধানী শুটিং ক্লাবের মীর দৌলত হোসেনকে। মিলনায়তন, খাদ্য ও আবাসন এবং প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির সদস্য করা হয়েছে পটুয়াখালী রাইফেল ক্লাবের গোলাম মোস্তফা মিন্টুকে। প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের আব্দুল মালেককে।
যদিও তিন জনই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যথারীতি অস্বীকার করেছেন। এদের উপ-কমিটির সদস্য করা নিয়ে যখন ফেডারেশন সরগমর তখন প্রায় নির্বিকার অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাকিফ শামীম। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘উপ-কমিটির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ ম্যাটার (বিষয়), তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। আমরা তদন্ত কমিটিকে সহযোগিতা করছি। তদন্ত রিপোর্ট যেভাবে আসবে সেইভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে আমরা এসব উপ-কমিটিগুলো আবার রিভিউ করবো।’ সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে সকল উপ-কমিটির সদস্য থাকেন। তবে এখানেও ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন শামীম। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আমদানি ও বরাদ্দ উপ-কমিটির আহবায়ক বনে গেছেন তিনি। অভিজ্ঞ সংগঠক নতুন অ্যাডহক কমিটির সহ-সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ বাবলুকে কোনো কমিটিতেই রাখা হয়নি। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) জাহেদ পারভেজ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্টের দোসরের কোনভাবে ফেডারেশনের পূনর্বাসনের সুযোগ নাই। এছাড়া যারা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তারা কিভাবে বিভিন্ন সাব কমিটিতে সুযোগ পায়। আমি বিষয়টি শুনেছি। দ্রুতই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবো।’
