দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে জ্বালানি সংকট এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, ব্যাংকঋণ ও রাজস্ব-সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের ঘাটতি, কম চাপ, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এবং বাড়তি দামে এলএনজি আমদানির কারণে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন বিনিয়োগ থেমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়বে। ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তা এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মো. সহিদুল হক মোল্লা আলাপাকালে এসব কথা বলেন। তিনি মনে করেন, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তাই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় খণ্ডিত পদক্ষেপ নয়; বিদ্যুৎ, গ্যাস, এলএনজি, শিল্প, সার ও বিনিয়োগকে নিয়ে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে শুধু কারখানা নয়, পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের আর্থিক ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাবে, সংকটের তীব্র সময়ে শিল্প খাতে দৈনিক উৎপাদন ক্ষতি দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। এমনকি কারখানাগুলো গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতায় চললেও দৈনিক ক্ষতি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সহিদুল হক মোল্লা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস শিল্পের প্রাণশক্তি। এ দুটির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ছাড়া কোনো কারখানাই তার পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না। বর্তমানে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়েছে। কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে সমস্যা হয়, সরকারের রাজস্ব কমে এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহণ, কাঁচামাল, সরবরাহ ও সেবা খাতও ক্ষতির মুখে পড়ে। ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক।
এদিকে, নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ স্থগিত থাকায় বর্তমানে ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন আটকে আছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে সহিদুল হক মোল্লা বলেন, একজন উদ্যোক্তা জমি কেনা, ভবন নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আমদানি ও ব্যাংকঋণের মতো বড় বিনিয়োগের আগে নিশ্চিত হতে চান-কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না। এখন সেই নিশ্চয়তা না থাকায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরকার নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান চায়, অন্যদিকে শিল্পের মৌলিক জ্বালানি নিশ্চিত করতে না পারা বড় বৈপরীত্য। তার মতে, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। নতুন শিল্প না হলে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। আবার বিদ্যমান শিল্প উৎপাদন কমালে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও বাড়বে।
সাম্প্রতিক সংকটে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধানও প্রকট হয়েছে। আগস্টে গড় দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি), যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ এমএমসিএফডি; জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের হিসাবে প্রকৃত চাহিদা ৪ হাজার এমএমসিএফডিরও বেশি।
জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে টার্মিনালটি আংশিক চালু হলেও কয়েক দফা সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে গ্যাস দিতে গিয়ে শিল্পে সরবরাহ কমে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। গ্যাস কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী নেতা সহিদুল হক মোল্লা বলেন, এভাবে একটি সংকট আরেকটি সংকটকে গভীর করছে। গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ কমে, বিদ্যুৎ কমলে শিল্প উৎপাদন কমে, উৎপাদন কমলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর বিকল্প ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করলে পণ্যের দাম বাড়ে, যা মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করে।
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে সরকারকে বাড়তি এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কাতারের সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে যে ধরনের জ্বালানি ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেটিকে আরও বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কাতার ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছিল। ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট ও বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আগস্টে একটি এলএনজি কার্গো কিনতে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২৩.৯৩ ডলার পর্যন্ত দাম অনুমোদন করা হয়েছে। অন্য একটি কার্গোর দাম ছিল ২২.৩৫ ডলার। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরেও সরকার ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা করেছে; এর মধ্যে আটটির ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে সহিদুল হক মোল্লা বলেন, স্পট মার্কেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দাম ও সরবরাহ- দুটিরই অনিশ্চয়তা। সংকটের সময়ে একই গ্যাস অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেটের ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু কোনোভাবেই শুধু স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকি আরও স্পষ্ট। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার খবর এসেছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি কার্গো হরমুজের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের মতো অস্বাভাবিক ব্যবস্থাও নিতে হয়েছে। এশিয়ার স্পট এলএনজির দামও সংঘাতের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সহিদুল হক মোল্লার মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট থেকে বের হতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। পুরোনো কূপের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং সঞ্চালন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির উৎসও বহুমুখী করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রেখে যুক্তিসংগত দামে গ্যাস কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন আর শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিভাগের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, ব্যাংকিং খাত এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্প ও বিদ্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরিয়া সার উৎপাদনও গ্যাসনির্ভর। দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে বাড়তি দামে সার আমদানি করতে হয়। বিশ্বব্যাংকও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খাদ্য, সার ও জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহের অস্থিরতাকে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকার জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সহিদুল হক মোল্লা বলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা। নতুন বিনিয়োগকারীদের গ্যাস সংযোগের বিষয়ে স্পষ্ট নীতি দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের চাহিদাকে সমন্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, একজন উদ্যোক্তা যখন নিশ্চিত হবেন যে বিনিয়োগ করলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাবেন, কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন, তখনই আস্থা ফিরবে। তার মতে, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, রপ্তানি ও রাজস্ব বাড়বে। আর উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ কমবে।
