এক দশকের মধ্যে বৃটেন ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক সবচেয়ে তলানিতে এসে পৌঁছেছে। দখল করা পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিতে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে বৃটিশ সরকার। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসরাইল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বৃটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্য এখন বৃটেন। তবে ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডাসহ ১২টি দেশ একসঙ্গে একই পদক্ষেপ নেয়ায় ইসরাইলের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। লন্ডনের কর্মকর্তারা আগে থেকেই জানতেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন নীতিতে এত বড় পরিবর্তনের পর ইসরাইলের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া আসবে। তবে ইসরাইল কত দ্রুত এবং কতটা তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা তাদের অনেকটা বিস্মিত করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
পূর্ব জেরুজালেমে বৃটিশ কনস্যুলেটটি পশ্চিম তীরের কার্যক্রম পরিচালনা করে, রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে। সেই কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল। ‘ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার’ থেকে বৃটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে নেয়াও অত্যন্ত বৈরী পদক্ষেপ। গত বছর গাজা উপত্যকায় স্থিতিশীলতা ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব পদক্ষেপ স্পষ্ট করে যে, মঙ্গলবার বৃটেন ও ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডাসহ আরও ১১টি দেশের নেয়া সিদ্ধান্তে ইসরাইল গভীরভাবে বিচলিত।
দখলীকৃত অঞ্চলে বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্য ইসরাইলের মোট রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ নাও হতে পারে। কিন্তু এসব পণ্যকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। দশকের পর দশক বৃটেনসহ অন্যান্য দেশের সরকার দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে বিবেচনা করে এলেও সেখানে উৎপাদিত বা তৈরি পণ্য নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সঙ্গে বৃটেন একমত। অর্থাৎ ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতিসহ পুরো দখলদারত্বই অবৈধ- এ কথা ঘোষণা করার পর বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এর প্রতিফলন থাকা উচিত।
এ কারণেই শুধু বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নয়, বরং বসতিগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো বা অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এমন অস্ত্র বিক্রিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা ‘দখলদারিত্বে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে’। এসব পদক্ষেপ অনেকের প্রত্যাশার চেয়েও কঠোর। শুধু পদক্ষেপগুলোই নয়, বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আবেগপূর্ণ এবং কিছু ক্ষেত্রে গভীরভাবে ব্যক্তিগত বক্তব্যের ভাষাও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নিজেকে ‘গর্বিত বৃটিশ ইহুদি’ এবং ‘ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি অবিচল সমর্থক’ হিসেবে উল্লেখ করে মিলিব্যান্ড তার পূর্বসূরিদের প্রায় সবার তুলনায় ইসরাইলের বিষয়ে আরও সরাসরি ও কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন।
একজন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলছেন, বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নির্মূলের’ জন্য তারা দায়ী। একই সঙ্গে তিনি বলছেন, ইসরাইল সরকার ‘এর দিকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছে’। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মিলিব্যান্ড একে বৃটিশ নীতিতে একটি ‘নতুন সূচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে মঙ্গলবারের পরিস্থিতিতে এটি অনেক সময় নীতিতে আমূল পরিবর্তনের মতোই মনে হয়েছে। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে বৃটেন-ইসরাইল সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।
ইসরাইলে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তপ্ত ও অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা হয়তো ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’আরের কঠোর প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছে। তবে অধিকাংশ ইসরাইলিই তার ক্ষোভের সঙ্গে একমত হয়েছেন বলে ধারণা করা যায়। অনেক ইসরাইলি কিছু বসতি স্থাপনকারীর সহিংস ও ধর্মীয় উগ্র মতাদর্শকে গভীরভাবে সমস্যাজনক মনে করেন। কেউ কেউ তাদের জাতীয়ভাবে বিব্রতকর বলেও মনে করেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা ইসরাইলি বসতিগুলো অবৈধ- এ কথার সঙ্গে তারা একমত। গত বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট তার উত্তরসূরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিযোগ তোলেন। অধিকাংশ ইসরাইলি তার সঙ্গে তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করবেন। তবে আন্তর্জাতিক নিন্দার দেয়াল যে ক্রমেই তাদের ঘিরে ফেলছে, তা তারা অনুভব করতে পারছেন। ইউরোভিশন বা বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ, ইসরাইলি নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং এখন বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা- এসবই তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আত্মরক্ষামূলক মনোভাব তৈরি করছে।
