ইতালিতে বাঁধনকে হেনস্তা, ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

ইতালিতে বাঁধনকে হেনস্তা, ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

ফন্ট সাইজ:

ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তা ও হামলার ঘটনায় ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। একইসঙ্গে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি অবহিত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও বাঁধনকে সর্বোচ্চ কনস্যুলার সহযোগিতা দেয়ার 
উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টায় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের বৈঠক শুরু হয়। পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। গত সোমবার দিবাগত রাতে ফেসবুক লাইভে এসে হেনস্তার বর্ণনা দেন অভিনেত্রী বাঁধন। তিনি জানান, তাকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারা হয়েছে, মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিকভাবেও হেনস্তা করা হয়েছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তার ওপর এমন হামলা চালানো হয়েছে বলেও জানান অভিনেত্রী বাঁধন। তার ওপর এই হামলায় দেশের বিনোদন অঙ্গনসহ সকল রাজনৈতিক ও সচেতন মহল নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। একইসঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। সংসদে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন সংসদ সদস্যরা।

রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, বাংলাদেশের একজন পরিচিত অভিনেত্রী বিদেশে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়াকে তার বিরুদ্ধে হামলার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া বিএনপি, জামায়াত বা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষ বিদেশে গেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন তাদের হেনস্তা ও হামলা করছে। এমনকি তাদের দেখে নেয়ার হুমকিও দেয়া হচ্ছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, তিনি জাতিসংঘের একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময়ও এ ধরনের হামলার শিকার হয়েছিলেন।

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় জড়িত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় আনতে সরকারের পরিকল্পনা কী এবং এ বিষয়ে সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা জানতে চান তিনি। এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, আরেকজন সংসদ সদস্যও একই বিষয়ে কথা বলেছেন। দুই সংসদ সদস্যের উত্থাপিত বিষয় নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে সংসদে একটি বক্তব্য দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সংসদে এটি তার প্রথম বক্তব্য। শুরুতেই তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে জীবন দেয়া সব জুলাইযোদ্ধাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একইসঙ্গে আহত সব জুলাইযোদ্ধাকেও স্মরণ করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে স্বৈরাচারী ও সন্ত্রাসী শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই মহান জাতীয় সংসদে আসায় সরকারি দলের ট্রেজারি বেঞ্চের সব সদস্য এবং বিরোধী দলের সব সদস্যকে অভিনন্দন জানাই।

হুমায়ুন কবির বলেন, একজন জুলাইযোদ্ধার ওপর হামলা মানে এই দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর হামলা।
আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ৭ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন ইতালির ভেনিস শহরে তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে একটি পার্কে অবস্থান করছিলেন। এ সময় বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়া আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তার ওপর কাপুরুষোচিত হামলা চালায়।
তিনি বলেন, আজ সকালে আমি পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। একইসঙ্গে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি, যাতে আমরা ইতালির পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করতে পারি এবং মিস বাঁধনকে সর্বোচ্চ কনস্যুলার সহযোগিতা দিতে পারি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্থানীয় পুলিশকে ঘটনাটি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। রোমে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং মিলানে বাংলাদেশের কনস্যুলেটকে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের দূতাবাস ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করবে এবং এ ঘটনার বিষয়ে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান তুলে ধরবে। একইসঙ্গে বাঁধনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কনস্যুলার সহযোগিতা দেয়ার জন্য দূতাবাস ও কনস্যুলেটকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে নির্বাচিত সরকার দীর্ঘদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। যারা এদেশ লুট করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, এই দেশ লুটিং, কিলিং পিপল- যারা করেছে, তাদের আমরা এই দেশে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা, ইনশাআল্লাহ, নেবো।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজ একটি গর্বের দিন। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতিত্ব গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি শক্ত অবস্থান। বাংলাদেশ এখন কোনো দেশের দাসত্ব বা গোলামি করবে না। বাংলাদেশ তার নিজস্ব পথে চলবে।
ঘটনার বিষয়ে বাঁধন ফেসবুক লাইভে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তার ওপর এমন হামলা চালানো হয়। এ সময় নিজেদের আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। মুহূর্তেই রাতে ছড়িয়ে পড়ে বাঁধনের ওপর হামলার একাধিক ভিডিও। অভিনেত্রী আরও অভিযোগ করেন, তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বলা হয়। মূলত ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ইতালিতে গেছেন বাঁধন। বর্তমানে তিনি মেস্ত্রে শহরে অবস্থান করছেন।

সোমবার রাতে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে তিনি স্থানীয় একটি পার্কে গেলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বাঁধন সোমবার জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ইতালিতে অবস্থিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি বলেন, হামালাকারীদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে। এদিকে মানবজমিনকে বাঁধন বলেন, হঠাৎ করেই পার্কে এমন ঘটনার শিকার হই। তারা আমার পিছু নিয়ে নানা ধরনের গালিগালাজ করতে থাকেন। পথরোধ করে ভিডিও করতে থাকেন। পাশাপাশি সে সময় আমার ওপর পানি ও কোমল পানীয় ছুড়া হয়। আমার মোবাইল ফোন ফেলে দেয়া হয়। শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। তখন মনে হচ্ছিল আমাকে বুঝি তারা মেরেই ফেলবে। বাঁধন আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, আমি দমে যাওয়ার মতো মানুষ নই। জুলাইতেও আমাকে দমানো যায়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দমানো সম্ভব নয়। আমি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবেই দেশে ফিরবো।

এরইমধ্যে সেই প্রস্তুতি চলছে। সাপোর্ট করার জন্য ধন্যবাদও জানান বাঁধন। তিনি বলেন, প্রত্যেকটা মানুষ আমাকে যেভাবে সাপোর্ট করেছেন আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি একজন গর্বিত বাংলাদেশি। আমার দেশের মানুষ আমার বিপদে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। সবার জন্য ভালোবাসা। আমি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি মনে করি সেটা আমার জীবনের সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি। আমি গর্বিত একজন জুলাইযোদ্ধা। আমাকে সবাই একটা কথাই বলছেন, বাঁধন সাহস হারাবেন না। আসলে বাঁধন সাহস হারাবার জন্য জন্মায় নাই। এ কথাটা মনে রাখা প্রয়োজন। আমাকে ভয় দেখানো কিংবা ভেঙে ফেলা এত সহজ না। আমি আমার ভাই কিংবা তার পরিবার যেভাবে হ্যারাস হয়েছে তার জন্য আমি আপসেট। এটা ন্যক্কারজনক। এটার শেষ আমি দেখে ছাড়বো এতটুকু বলতে পারি।