বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানিতে এনবিআর’র কড়াকড়ি, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র বিরোধিতা

ফন্ট সাইজ:

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার জন্য বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্থানীয় শিল্প রক্ষা এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতি সুতা আমদানি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে রপ্তানিকারকরা ব্যাংক গ্যারান্টি সাপেক্ষে এই সুতা আমদানি চালিয়ে যেতে পারবেন। গত সোমবার এনবিআর’র দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস: রপ্তানি ও বন্ড) কাজী রায়হানুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি সাধারণ আদেশ জারি করা হয়। নতুন এই শর্তযুক্ত প্রক্রিয়ার অধীনে, রপ্তানি আয় দেশে আসার পর ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে। এই অব্যাহতির জন্য সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠন- বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা বিটিএমএ থেকে সার্টিফিকেট জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে এখন থেকে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা নন-বন্ডেড কারখানাগুলো ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে অনুসরণ করে থাকে। পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্পখাতে আরও চাপ সৃষ্টি হবে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নিট ফেব্রিক আমদানির নীতি সংশোধনের বিষয়ে যখন সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে, ঠিক এমন সময়ে পোশাক খাতের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত অনভিপ্রেত। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় শিল্প রক্ষা এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন এবং অন্যান্য অংশীজন দীর্ঘকাল ধরে কাজ করে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সুপারিশ এনবিআর’র কাছে পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের মেয়াদে গঠিত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয় এবং এনবিআর এখন তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট এইচএস কোডের (৫২০৫, ৫২০৬ এবং ৫২০৭) আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানির ক্ষেত্রে এই শর্ত প্রযোজ্য হবে।

আদেশ জারির সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হবে। তবে যেসকল চালানের বিল অব লেডিং (বি/এল) ইস্যু করা হয়েছে বা আদেশ জারির তারিখের আগেই চালান সম্পন্ন হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। টেক্সটাইল মিল মালিকদের প্রতিক্রিয়া: বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে টেক্সটাইল মিল মালিকরা। তাদের মতে, এটি সুতা আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা স্থানীয় টেক্সটাইল ও পোশাক প্রস্তুতকারকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক পরিচালক রাজীব হায়দার মুন্না বলেন, রাজস্ব আহরণ এবং পোশাক রপ্তানির সঙ্গে জড়িত পশ্চাৎ ও সম্মুখ সংযোগ (ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ) শিল্পের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে এই পদক্ষেপ দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। তাছাড়া, টেক্সটাইল মিল মালিকরা জানিয়েছেন যে, এই উদ্যোগটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত রূপান্তর (টু-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন) এবং ন্যূনতম ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সংক্রান্ত শর্ত পূরণে দেশটিকে সাহায্য করবে, যা জিএসপি-প্লাস যুগে এলডিসি উত্তরণের পরও বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র প্রতিক্রিয়া: সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে শীর্ষ পোশাক শিল্প এসোসিয়েশন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। তারা অভিযোগ করেছে যে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং স্থানীয় মিলগুলো থেকে সুতা কেনা বাধ্যতামূলক করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে এই অন্যায্য ও পূর্বালোচনা ছাড়াই নেয়া সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন দুই সংগঠনের নেতারা।

বাণিজ্যমন্ত্রী বরাবর পাঠানো চিঠিতে এই ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়, যা স্বাক্ষর করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। পাশাপাশি, বাণিজ্য সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছেও এই আবেদনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে, যাতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হয়।