শেখ হাসিনাকে আসতে হবে না, তাকে সরকার ধরে আনতে চায়। এসব বিষয় নিয়ে সরকারের মধ্যে কোনো লুকোচুরি নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। একইসঙ্গে বাংলাদেশের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ভারতীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ হওয়ায় সরকারের অসন্তুষ্টির কথাও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল সচিবালয়ে পিআইডি’র সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা নিজে ফিরুন বা সরকার তাকে ফিরিয়ে আনুক, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো কৌশল নেই। ‘শেখ হাসিনাকে সরকার ফিরিয়ে আনতে চায় কি না এ নিয়ে কেউ কেউ যে ধরনের অনুমান করছেন, তা সঠিক নয়। ভারতের ওপর চাপ তৈরির জন্য প্রত্যর্পণের দাবি তোলা হচ্ছে- এমন কোনো কৌশল সরকারের নেই। ভারত সরকারকে বিষয়টি শর্ত হিসেবে দেয়া হয়েছিল এবং সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রায়ই বলছি, শেখ হাসিনা, আপনি আসবেন না, আপনাকে আমরা ধরে নিয়ে আসতে চাই। আপনি আসামি, আপনি পলাতক আসামি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের বরাত দিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) দেশে ফিরে তার বিরুদ্ধে হওয়া বিচার পুনর্বিবেচনার সুযোগও পাবেন না। টেকনিক্যালি এখন ব্যাপারটা এ রকম, তিনি আসবেন এবং তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে। আমরা তাকে ধরে আনতে চাই।
ভারতীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা নিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রত্যর্পণ না হওয়া পর্যন্ত অন্তত তিনি (হাসিনা) যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে না পারেন, ভারত সরকারের কাছ থেকে সে বিষয়ে পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছিল বাংলাদেশ। আমরা প্রত্যাশা করবো, ভারত সরকার এই বিষয়ে তার ওপর একটি বিধিনিষেধ দেবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার দাবি শক্তিশালী এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের কোনো দ্বিধা নেই। ভারত চাইলে (হাসিনাকে ফেরত দিয়ে) সম্পর্ক উন্নয়নে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারে। লোডশেডিং সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা জানান, ২০২৩ ও ২০২৬ সালের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় লোডশেডিংয়ের চিত্র তুলনা করলে দেখা যায়, জুন ও জুলাইয়ে ২০২৬ সালে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কম ছিল।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের জুনে প্রতিদিন গড়ে লোডশেডিং ছিল ৯৬৯ মেগাওয়াট। ২০২৬ সালের জুনে তা দাড়ায় ৭৪১ মেগাওয়াটে। একইভাবে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গড়ে লোডশেডিং ছিল ৬১৩ মেগাওয়াট, যা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ছিল ৪৬০ মেগাওয়াট। তবে আগস্টের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের আগস্টে গড় লোডশেডিং ছিল ৩৬০ মেগাওয়াট। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১ হাজার ৫৬৫ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। আগস্টে কী সংকট হয়েছিল সবাই সেটা জানেন।
এদিকে ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল নাকি অন্য কিছু।
উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল নয়, ‘ইটস অ্যা মাফিয়া গ্যাং। তাদের মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা নেই। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকার এই পরিবর্তন এনেছে। নতুন বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বোয়িং কেনার অর্থ সরকারকে এখনই এককালীন পরিশোধ করতে হচ্ছে না, ধাপে ধাপে দীর্ঘ সময় ধরে এই পেমেন্ট দেয়া হবে। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এয়ারবাস’ থেকেও বিমান ক্রয়ের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দীর্ঘসূত্রিতার সমালোচনা করে ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা বলেন, দেড় বছর সময় পাওয়া সত্ত্বেও বিগত সময়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারকে দ্রুততম সময়ে জনগণের সাময়িক ক্রাইসিস কমাতে চীনের সঙ্গে চুক্তিসহ জরুরি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ‘এল নিনো’ আবহাওয়া পরিস্থিতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তবে বর্তমানে দেশে ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে খাদ্যের সর্বোচ্চ মজুত রয়েছে। সম্ভাব্য খাদ্য সংকট সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
