চট্টগ্রামের পৃথক অভিযানে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ৭ সহযোগীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোনের পাশাপাশি একটি একনলা কাটা বন্দুকসহ বিপুলসংখ্যক দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এসপি মো. মাসুদ আলম।
এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. জুনায়েত কাউছার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ, হাটহাজারী মডেল থানার ওসি মো. জাহিদুর রহমান, সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের অন্যরাও উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ জানায়, সোমবার গভীর রাত থেকে টানা ২৪ ঘণ্টা হাটহাজারী, বায়েজিদ বোস্তামী ও খুলশী থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনের সহযোগী চাঁদাবাজ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো- কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বার (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০) ও নুরুল আলম (৪০)। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করতো। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে বিদেশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতো তারা।
সম্প্রতি হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার এক চিকিৎসকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে পুলিশ পাহারায় থাকলেও তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই কায়দায় বড়দীঘির পাড় এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছেও চাঁদা দাবি করা হয়। পুলিশ জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে আগে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন সন্ত্রাসীকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও কাজে লাগানো হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিভিন্ন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করলেও নিজেদের একটি পৃথক চাঁদাবাজ চক্র গড়ে তুলেছিলো। বিত্তবান ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের টার্গেট করতো তারা। অভিযানে একটি তলোয়ার, একটি চাপাতি, একটি ছুরি ও একটি টিপছোরাসহ চারটি অস্ত্র এবং চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার আহমদ রেজা শাকিলের বিরুদ্ধে অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও হত্যাচেষ্টাসহ আটটি মামলা রয়েছে। মো. মানিকের বিরুদ্ধে মাদক ও ডাকাতির প্রস্তুতির দু’টি মামলা রয়েছে। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পৃথক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে সংঘর্ষ ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো- সাদেক (২৯), কামরুল (৩৯) ও হানিফ (৩৪)। পুলিশের তথ্যমতে, গত ১লা সেপ্টেম্বর বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সীতাকুণ্ডে পৃথক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে পরে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের সময় কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অস্ত্র প্রদর্শনে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে অভিযান শুরু করে জেলা পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেয়া তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে সীতাকুণ্ড থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১টি ধারালো ছুরি, তিনটি কিরিচ, একটি দা ও ১৫টি লাঠি উদ্ধার করা হয়। পরে একটি দেশীয় তৈরি একনলা কাটা বন্দুকও উদ্ধার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অপরাধী যে দলেরই হোক বা যে রাজনৈতিক পরিচয়ই ব্যবহার করুক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, সংঘর্ষ ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। একইসঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
