তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে শব্দের লড়াই এই সময়ের আলোচিত ঘটনা। যে কারণে সম্পর্কে কিছুটা হলেও দূরত্ব তৈরি হয়। সাক্ষাৎকার নয়, একান্ত আলাপচারিতায় ভারতীয় হাইকমিশনার বললেন, কে বললো সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়! আমরা তো মুখিয়ে আছি প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে। দিল্লিতে তাকে আমরা উষ্ণ স্বাগত জানাতে চাই। আজ না হোক কাল তো সফর হবে। এই সফর নিয়ে অহেতুক কোনো বিতর্কের প্রয়োজন নেই। আমরা তো চাই এই সফর যেন গতানুগতিক কূটনৈতিক সফরে পরিণত না হয়। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাইলেন না। কূটনীতির মারপ্যাঁচে কিছু সময় হারিয়ে গেল তার খোলামেলা বয়ান।
ঢাকায় কেমন লাগছে? ভালো, খুব ভালো। তফাৎ খুব একটা তো দেখি না। ভাষা এক, খাওয়া-দাওয়াও প্রায় একই। চালচলন, আচার, আচরণেও মেলা মিল খুঁজে পাই। পার্থক্য শুধু অন্য দেশের নাগরিক। পরিচয়ে কূটনীতিক। তারপরও যাদের সঙ্গে কথা বলেছি— এতে আমি অভিভূত। সবাই আমাকে গ্রহণ করেছেন। এখানকার মানুষ দারুণ অতিথিপরায়ণ। সহজেই অন্যদেরকে আপন করে নিতে জানে। ঢাকায় এসেছি ক’দিন হলো। এই সময়ের মধ্যেই আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে যাদের সঙ্গেই কথা বলেছি তাতে আমি মুগ্ধ। সমস্যা আছে, সংকট আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে— এর সমাধানও আছে। আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই এসবের সুরাহা হতে পারে। দরজা বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে কেউ নন। ঢাকায় ৮৭ দিন অবস্থানের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর এটাই পর্যবেক্ষণ।
দু’দেশের সম্পর্কে আগে থেকেই টানাপড়েন চলছিল। বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতিতে পরিস্থিতি ছিল সরগরম। সবেমাত্র নির্বাচন হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তাগিদ অনুভব করছিলেন সবাই। যদিও পরিস্থিতি তেমন অনুকূল ছিল না। তবে জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের তরফে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছুটা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ঢাকায় আসাটা ছিল এক অভাবনীয় কূটনীতির অংশ।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি যোগ দেন। এটাও ছিল দু’দেশের সম্পর্ক জোরদারে ভিন্ন এক সংকেত। এই যখন অবস্থা, তখনই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ এক বার্তা নিয়ে ঢাকায় এলেন দীনেশ ত্রিবেদী। শুরু করলেন দূতিয়ালি। সাক্ষাৎ করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। আরও অনেকের সঙ্গে। বিদেশমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও কয়েক দফা মোলাকাত হলো। বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার কথা হলো। দীনেশ ত্রিবেদী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। বিদেশ মন্ত্রণালয়ের উপর শতভাগ নির্ভরশীল না হয়ে একজন রাজনীতিককে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর মধ্যে নরেন্দ্র মোদির নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ হিসাবনিকাশ ছিল। দীনেশ ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার প্রাক্তন সংসদ সদস্য। ছিলেন রেলমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা থেকে বি.কম এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি একজন প্রশিক্ষিত পাইলট। বিমান চালনায় তার যথেষ্ট দক্ষতা রয়েছে। রাজনীতিতে সফল, কূটনীতিতে কতোটা সফল হবেন এই পাইলট— তা সময়ই বলে দেবে। দিল্লিতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলন এবং অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে দাওয়াতপত্র নিয়েই মূলত গোলমাল হয়ে গেল। দাওয়াতপত্রে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না থাকায় ঢাকার তরফে আপত্তি জানানো হলো। বলা হলো, এই দাওয়াত যথাযথভাবে দেয়া হয়নি। ভারত অবশ্য বারবারই বলেছে, দু’দফা আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপর জানানো হয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে। যাইহোক, এই দাওয়াতপত্র নিয়ে কূটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে বলেই মনে হয়। দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে— এমন মন্তব্যও করেন তিনি। এর পরপর দিল্লি চলে যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত আলোচনায় মিলিত হন। যে ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয় যথেষ্ট কৌতূহল জাগিয়ে।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে শব্দের লড়াই এই সময়ের আলোচিত ঘটনা। যে কারণে সম্পর্কে কিছুটা হলেও দূরত্ব তৈরি হয়। সাক্ষাৎকার নয়, একান্ত আলাপচারিতায় ভারতীয় হাইকমিশনার বললেন, কে বললো সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়! আমরা তো মুখিয়ে আছি প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে। দিল্লিতে তাকে আমরা উষ্ণ স্বাগত জানাতে চাই। আজ না হোক কাল তো সফর হবে। এই সফর নিয়ে অহেতুক কোনো বিতর্কের প্রয়োজন নেই। আমরা তো চাই এই সফর যেন গতানুগতিক কূটনৈতিক সফরে পরিণত না হয়। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাইলেন না। কূটনীতির মারপ্যাঁচে কিছু সময় হারিয়ে গেল তার খোলামেলা বয়ান।
ওদিকে একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ব্যাপারে ভারত কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি নয়। তবে, ওসমান হাদির দুই হত্যাকারীকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে ভারত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। বলেছিল, বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনো তাই করছে। তাতে আরও বলা হয়, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিক লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
একই সময়ে তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ার খবরে বাংলাদেশে হতাশা তৈরি হয়। এর ছেদ পড়ে সম্পর্কে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দু’দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাংলাদেশের তরফে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জবাবে খলিল বলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়— এটা আমি মানতে রাজি নই। আমরা আরও সুসম্পর্ক চাই। যা বারবার বলেছি। বল এখন দিল্লির কোর্টে। ওয়াকিবহাল কূটনীতিকরা বলছেন, দু’দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উষ্ণ করার ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু কোথায় যেন একটা দেয়াল। যে দেয়াল ভাঙতে না পারলে সুসম্পর্কের আওয়াজ বাতাসে উড়ে বেড়াবে। কাগজ-কলমে বন্দি হবে না।
