আবুল কালাম আজাদের আপিলের সুযোগ নেই, অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশ বেআইনি: চিফ প্রসিকিউটর

ফন্ট সাইজ:

যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবুল কালাম আজাদ আপিল করতে পারবেন—এই শর্তে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে আদেশ দিয়েছিল, সেটি বেআইনি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারায় রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করা না হলে পরবর্তীতে সেই আপিল গ্রহণযোগ্য হবে না।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই বিধান সবার জন্য প্রযোজ্য—সেটি শেখ হাসিনা, আবুল কালাম আজাদ কিংবা অন্য কোনো পলাতক আসামি হোক, অথবা কারাগারে থাকা কেউ হোক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ছাপিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নির্বাহী আদেশের নেই। কাজেই, সরকারের আদেশের যে অংশে আপিল করার শর্তে আবুল কালাম আজাদকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল, সেটি অবৈধ ও বেআইনি ছিল। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার আওতায় কোনো সাজা স্থগিত করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।
তিনি বলেন, তার সাজা স্থগিত করার বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সেই ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। সরকার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করলে প্রসিকিউশনের কোনো আপত্তিও নেই। আবুল কালামের আপিল ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ বা নথিভুক্ত করেননি। তাই তার মামলায় আপিল বিভাগে এমন কোনো বিচারাধীন কার্যক্রম নেই, যার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হতে পারে। শুনানির সময় আপিল বিভাগের বিচারকরাও একই ধরনের মতামত দিয়েছিলেন। তিনি জানান, আজাদের আইনজীবীরা পরবর্তী সময়ে হয়তো আইনি অবস্থানটি বুঝতে পেরেছিলেন এবং সে কারণেই আপিলের বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেননি। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ৩০ দিন পার হয়ে গেলে সেই রায় কার্যকর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প আমি দেখি না।

সরকার আজাদের সাজা স্থগিত করতে বাধ্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল বলেন, এটি বাধ্যবাধকতা বা নজিরের বিষয় নয়। ৪০১ ধারা সরকারকে একান্ত নিজস্ব বিবেচনামূলক ক্ষমতা দিয়েছে। সরকার যেকোনো সময় যেকোনো সাজা স্থগিত, মওকুফ এমনকি বাতিলও করতে পারে।
২৪ ঘণ্টার পর আটক গোপন রাখলে গুমের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের আওতায় ২৪ ঘণ্টার পর কোনো ব্যক্তির আটকের তথ্য গোপন করা, আটকের স্থান সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত না করা কিংবা তাকে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা গুমের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নতুন আইনটি দেশে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। নতুন আইনে গুমের একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই সময়ের পরও যদি ওই ব্যক্তির আটকের বিষয়টি গোপন রাখা হয়, আটকের স্থান জানানো না হয়, তাকে আইনগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় বা তার স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টা পর থেকে যে সময় পর্যন্ত এসব করা হবে, সেটি গুমের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো পর্যালোচনা হবে: চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এতদিন গুমের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট আইন না থাকায় ট্রাইব্যুনালের সামনে থাকা অভিযোগগুলো নতুন আইনের আলোকে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে। তিনি বলেন, যেসব গুমের ঘটনা ব্যাপক মাত্রা বা পদ্ধতিগত অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হবে, সেগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় আসবে। আর যেসব ঘটনা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত অপরাধের মধ্যে পড়বে না, সেগুলো স্বতন্ত্র গুমের অপরাধ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হবে। আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর সেগুলো আমরা নতুন আইনের পরিপ্রেক্ষিতে পর্যালোচনা করবো। এরপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে, কক্সবাজারের টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদসহ তিন সেনা কর্মকর্তার জামিন শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ২৪শে সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। একইদিন এ মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানি হবে। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন।