বিধবার শেষ ভরসাটাও হলো ঝাঁজরা ঝাঁজরা

বিধবার শেষ ভরসাটাও হলো ঝাঁজরা ঝাঁজরা

ফন্ট সাইজ:

অভাগা যেদিকে চায়, সাগর যেন সেদিকেই শুকিয়ে যায়— মনোয়ারা বেগমের জীবনের গল্পটা যেন সেই প্রবাদকেই সত্যি করে তুলেছে। প্রায় তিন মাস আগে স্বামী জিয়া উদ্দীনের মৃত্যুতে একা হয়ে পড়েন তিনি। স্বামী হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই সংসারের প্রয়োজন মেটাতে হাত দিতে হয় দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয়ে। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করছিল আরেক নির্মম আঘাত। শেষ সম্বল হিসেবে রাখা ২ লাখ টাকা পোকায় কেটে করেছে ঝাঁজরা। শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম। তার স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। আর মনোয়ারা ভোগাই নদী থেকে পাথর সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন।

দু’জনের সামান্য আয়েই চলতো সংসার। অভাবের মধ্যেও দুই মেয়েকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন তারা। মেয়েদের বিয়ে দেয়ার পরও থামেনি তাদের পরিশ্রম। সংসারের খরচ মিটিয়ে যা কিছু বাঁচতো, তা জমাতেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে। খুচরা টাকা জমিয়ে পরে ভাঙিয়ে এক হাজার টাকার নোট করতেন তারা। এভাবেই প্রায় ১০ বছরে জমেছিল ২ লাখ টাকা। প্রায় আট মাস আগে সেই টাকা একটি জর্দার কৌটায় রেখে দেন মনোয়ারা। ঘরের এক পাশে রাখা সেই কৌটাটিই হয়ে উঠেছিল তাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ছোট্ট আশ্রয়। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের প্রয়োজনে সম্প্রতি সেই কৌটায় হাত দেন মনোয়ারা। কৌটার মুখ খুলতে গিয়ে দেখেন, সেটি আটকে আছে। অনেক চেষ্টা করেও খুলতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কৌটার মুখ কেটে ফেলেন। এরপর ভেতরের দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান তিনি। দেখেন, পোকায় কেটে টাকার নোটগুলো ঝাঁজরা হয়ে গেছে। কোনো নোটে অসংখ্য ছিদ্র, কোনোটি আবার ছিঁড়ে টুকরা টুকরা। যে টাকা একদিন একমুঠো করে জড়ো করেছিলেন তারা, যে সঞ্চয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিপদের দিনের আশ্বাস— সেই অর্থই এখন মূল্যহীন কাগজ। টাকার অঙ্ক জানতে চাইলে মনোয়ারা জানান, কৌটায় প্রায় ২ লাখ টাকা ছিল। কিছুদিন আগেও খুচরা টাকা ভাঙিয়ে এক হাজার টাকার নোট করে রেখেছিলেন তারা। প্রায় এক দশকের কষ্টের সেই সঞ্চয় এখন তার চোখের সামনে শেষ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনোয়ারা বেগম বলেন, এই টাকাডা আছিল আমার শেষ ভরসা। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। দশ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল।

স্বামী নেই, আগের মতো কাজও নেই। ভোগাই নদীতে আগের মতো পাথরও পাওয়া যায় না। ফলে আয়-রোজগারের পথও সংকুচিত হয়ে এসেছে। জীবনের এই কঠিন সময়ে দীর্ঘদিনের সঞ্চয়টুকুও হারিয়ে এখন অনেকটা নিঃস্ব মনোয়ারা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল মালেক বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ আছে কি না, তা দেখা হবে। ভবিষ্যতে নগদ টাকা দীর্ঘদিন অনিরাপদ স্থানে না রেখে ব্যাংক বা নিরাপদ মাধ্যমে সংরক্ষণের পরামর্শ দেন তিনি।