এএফডি’র উত্থানে চরম বিপাকে জার্মান চ্যান্সেলর

ইউরোপের জন্য অশনিসংকেত

এএফডি’র উত্থানে চরম বিপাকে জার্মান চ্যান্সেলর

ফন্ট সাইজ:

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) বড় জয় দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মূলধারার রাজনীতির প্রতি মানুষের হতাশার মুখে থাকা ইউরোপের অন্যান্য নেতাদের জন্যও এ ফলাফল সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে।
রোববারের নির্বাচনের পর স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজ্য পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সামান্য দূরে রয়েছে এএফডি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানিতে চলে আসা ঐকমত্যভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিরোধিতার প্রধান মুখ হয়ে উঠেছে দলটি।

মের্ৎসের রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) পার্লামেন্টারি নেতা থরস্টেন ফ্রাই এই ফলাফলকে ‘দেশের জন্য একটি যুগসন্ধিক্ষণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে ক্রমেই মেরুকৃত হয়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জীবনযাত্রার ব্যয়, পেনশন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলেন মের্ৎস। এ সময় তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে।
এআরডি টেলিভিশনের জন্য ইনফ্রাটেস্ট ডিম্যাপ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, রাজ্যটির ৮৭ শতাংশ ভোটার মের্ৎস সরকারের কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট। জেডডিএফ টেলিভিশনের পৃথক এক জরিপে তিন-চতুর্থাংশ মানুষ মনে করেন, মের্ৎস তার দলের নির্বাচনী ফলাফলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এমনকি সিডিইউ সমর্থকদের প্রায় অর্ধেকও একই মত দিয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দেয়া মন্তব্যে মের্ৎস সোমবার সিডিইউর নির্বাহী বোর্ডকে বলেন, এই ফলাফল তার দলকে ‘ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে’।
তবে বিল্ড সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আবারও এএফডির সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। এএফডি বলেছে, স্যাক্সনি-আনহাল্টের এই জয় ২০২৯ সালের নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পথে তাদের প্রথম পদক্ষেপ।

বিশ্বজুড়ে ‘জনতুষ্টিবাদী ঢেউ’
ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে কট্টর ডানপন্থী দল ইতিমধ্যে সরকার পরিচালনা করছে। তবে জার্মানির কোনো রাজ্য নির্বাচনে এএফডির এবারের ফলাফল এখন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে ভালো ফল। আগামী কয়েক মাসে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের জন্যও এটি জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সে জনমত জরিপগুলো বলছে, আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালি জয়ী হতে পারে। দেশটির অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউর স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফলকে ‘খুব, খুব উদ্বেগজনক সংকেত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আরটিএল রেডিওকে তিনি বলেন, ‘এটি দেখাচ্ছে, আমরা এমন একটি জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা এখন বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে।’

স্যাক্সনি-আনহাল্টে প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস। রয়টার্স বলছে, ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ এবং মের্ৎসের সতর্কতা উপেক্ষা করে ভোটাররা অভিবাসনবিরোধী এএফডিকে ভোট দিয়েছেন। অস্বাভাবিকভাবে বেশি ভোটার উপস্থিতির মধ্যেও শ্রমিক, পুরুষ ভোটার এবং তরুণদের বড় একটি অংশ এএফডিকে ভোট দিয়েছেন।
৩৫ বছর বয়সী প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ডের নেতৃত্বে এএফডি এই সাফল্য পেয়েছে। টিকটকে সক্রিয় জিগমুন্ড নির্বাচনী সমাবেশ ও সভায় হাজার হাজার মানুষকে আকৃষ্ট করেছেন। তিনি ‘ভালো, পুরোনো, নিরাপদ জার্মানি’ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এএফডিকে ‘উগ্রপন্থী’ ডানপন্থী দল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলেও স্যাক্সনি-আনহাল্টে দলটির সাফল্যে তা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ’
বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থরস্টেন ফাস বলেন, ‘এএফডি এখন অত্যন্ত দৃশ্যমান একটি রাজনৈতিক শক্তি। অন্য দলগুলোর তুলনায় নিজেদের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তারা অনেক বেশি কার্যকর।’
তিনি বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচেষ্টার সামনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।’
মের্ৎসের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। জার্মানির শিল্পভিত্তি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থায় সংস্কার আনার চেষ্টা করছেন তিনি, যা পূর্ব জার্মানির মানুষের মধ্যে বিশেষভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

গত সপ্তাহে ভক্সওয়াগেন এজির ঘোষিত বড় ধরনের পুনর্গঠন পরিকল্পনাও ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির কঠিন পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করেছে। পরিকল্পনাটির ফলে বিশ্বজুড়ে ৫০ হাজার পর্যন্ত কর্মসংস্থান কমতে পারে এবং জার্মানিতে বড় কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের স্থবিরতা থেকে জার্মান অর্থনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধের কারণে আংশিকভাবে বেড়ে যাওয়া জ্বালানি ব্যয়ও এএফডির জন্য আক্রমণের সহজ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। দলটি যুক্তি দিচ্ছে, কিয়েভকে জার্মানির সমর্থন অপ্রয়োজনীয়ভাবে মস্কোকে ক্ষুব্ধ করেছে এবং এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে।

২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসেন মের্ৎস। অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে কঠোর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের আর্থিক সতর্কতার নীতি থেকে সরে এসে জার্মানির দুর্বল হয়ে পড়া সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েক শ বিলিয়ন ইউরো ঋণ নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
কিন্তু বিশেষ করে পূর্ব জার্মানির ভোটাররা এখন পর্যন্ত এসব পরিকল্পনার জন্য তাকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা দেননি। কারণ পরিকল্পনাগুলোর দৃশ্যমান ফলাফল এখনো খুব কম।