শেয়ারবাজারে বিদেশি পুঁজি টানতে বড় সংস্কারের তাগিদ

শেয়ারবাজারে বিদেশি পুঁজি টানতে বড় সংস্কারের তাগিদ

ফন্ট সাইজ:

অর্থনীতির আকারে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু সেই অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি এখনো দেখা যায় না শেয়ারবাজারে। বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অবস্থান মাত্র ৬ শতাংশের মতো। বিপরীতে ভারতে এ হার ২০২৫ সালে প্রায় ১২৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে সাম্প্রতিক হিসাবগুলোতে ৫০ শতাংশের বেশি এবং তুরস্কেও বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সূচকের গতিও একই চিত্র দিচ্ছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রধান শেয়ারসূচক যেখানে আনুমানিক ৩০ শতাংশের মতো বেড়েছে, সেখানে ভিয়েতনাম প্রায় ১৩৪ শতাংশ, ভারত প্রায় ৩০০ শতাংশ এবং তুরস্ক প্রায় ১ হাজার ৩০০ শতাংশ এগিয়েছে। ফলে অর্থনীতির আকার বাড়লেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এখনো বড় ও গভীর বাজার হয়ে উঠতে পারেনি। এ বাস্তবতায় বিদেশি পুঁজি টানার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে- ভালো কোম্পানি বাজারে আনা, সুশাসন নিশ্চিত করা, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো, তারল্য তৈরি করা এবং নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সূচক বাড়ানো বা বিদেশে রোডশো করলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রথমে দেখবেন বাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানি আছে কি না, কোম্পানির হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য, বিনিয়োগের অর্থ কত দ্রুত দেশে আনা ও ফেরত নেওয়া যায় এবং বাজারের নিয়ম আগামী কয়েক বছর স্থিতিশীল থাকবে কি না। শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেন বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র এখনো হতাশাজনক। ২০২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেন। বিপরীতে কেনেন প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার। ফলে বছর শেষে তাদের নিট বিক্রি দাঁড়ায় প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশিদের মোট লেনদেন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেও তার বড় অংশই ছিল কেনাবেচার লেনদেন। অর্থাৎ লেনদেন বাড়া মানেই নতুন বিদেশি পুঁজি আসা নয়। নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি লেনদেনে কিছুটা উল্লম্ফন দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা আবার কমেছে। এপ্রিলেই বিদেশিরা প্রায় ১২৪ কোটি টাকা তুলে নেন। এই পরিস্থিতিই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আস্থাও তৈরি হয়নি।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে শুধু সূচকের চোখে দেখতে নারাজ। তিনি বলেছেন, সূচকের যে উত্থান হয়েছে, তা মূলত আস্থাভিত্তিক। কসমেটিক এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারের মৌলিক পরিবর্তন হবে না। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পুঁজিবাজারের আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবে। বিএসইসিকে আরও কার্যকর করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ তহবিল আকর্ষণ করে বাজারের তারল্য বাড়ানো ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশে অনেক বড় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে। এসব ভালো কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে না আনলে বাজার প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হবে না। বিএসইসি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কয়েকটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিকে বাজারে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। তিনি বলেন, প্রথমে বড় কোম্পানিগুলোকে স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ দেয়া হবে। তারা না এলে জনস্বার্থে আইন প্রয়োগের সুযোগও রয়েছে। বড় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে সরাসরি তালিকাভুক্তি ও হাইব্রিড লিস্টিং চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এখানেই বাংলাদেশের বাজারের অন্যতম মৌলিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ, ভোগ্যপণ্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারের বাইরে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এলেও বাজারে দেশের অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পান না। মাসুদ খানের মতে, তালিকাভুক্তি কেবল কোম্পানির জন্য অর্থ সংগ্রহের পথ নয়; এতে কোম্পানির বাজারমূল্য তৈরি হয়, অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণ সহজ হয় এবং পুরোনো মালিকদের জন্য শেয়ার বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। পারিবারিক ব্যবসায় প্রজন্ম পরিবর্তনের সময় মালিকানার দ্বন্দ্ব ও বিভাজন ঠেকাতেও তালিকাভুক্তি কার্যকর হতে পারে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে গতিতে প্রবৃদ্ধি এসেছে, পুঁজিবাজার তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে অর্থনীতির বড় অংশ এখনো শেয়ারবাজারের বাইরে রয়েছে। তিনি বলেন, অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত। ব্যাংকঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের তুলনামূলক সহজ সুযোগ থাকায় তারা তালিকাভুক্তির সঙ্গে যুক্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার মধ্যে আসতে আগ্রহী নয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্পন্ন কোম্পানির বিকল্প কমে যায়। সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নয়; ভালো কোম্পানির ঘাটতি, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব, সীমিত তারল্য এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব একসঙ্গে দায়ী। তার প্রস্তাব, ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বড় দেশি শিল্পগোষ্ঠী ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। একই সঙ্গে পেনশন, বীমা ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। শেয়ারের পাশাপাশি বন্ড, সুকুক ও ডেরিভেটিভের বাজারও সম্প্রসারণ করতে হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূজহাত আনোয়ার বলেন, তারল্য ও অবকাঠামোতে পরিবর্তন দরকার। তিনি জানান, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে ডিএসই যেসব সংস্কার প্রস্তাব দেয়, তার মধ্যে ছিল লেনদেন নিষ্পত্তির সময় টি+২ থেকে টি+১-এ নামিয়ে আনা, রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার সময় বাড়ানো এবং অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের টাকা আনা-নেয়ার হিসাব সহজ করা। এসব পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও বাজারের তারল্য উন্নত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ডিএসই জানিয়েছে। ডিএসই বাজারে নতুন বিনিয়োগ পণ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন কাঠামোও বাড়াতে চাইছে। এ প্রসঙ্গে নূজহাত আনোয়ার বলেন, খোলা প্রান্তের মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য আলাদা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে খুচরা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সহজে ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচা করতে পারবেন। ডিএসই একই সঙ্গে বন্ড, সুকুক ও বিকল্প আর্থিক পণ্যের বাজার বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এর লক্ষ্য শুধু লেনদেন বাড়ানো নয়; বরং শেয়ারবাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থায় পরিণত করা।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি ভারতের মতো গভীর বাজার, ভিয়েতনামের মতো দ্রুত সম্প্রসারিত তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং তুরস্কের মতো সক্রিয় বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে বিদেশি পুঁজির জন্য প্রতিযোগিতায় অবস্থান বদলানো সম্ভব। এ জন্য পুঁজিবাজারকে এক-দুই বছরের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে নিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন আরও বেশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন। এলডিসি উত্তরণের পর শিল্পে প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, জ্বালানি ও অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সেই অর্থের বড় অংশ শুধু ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুঁজিবাজার কতটা বড়, গভীর, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগযোগ্য করা গেল। অর্থনীতি বড় হয়ে গেছে। এবার শেয়ারবাজারকেও বড় করতে হবে। আর বিদেশি পুঁজির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও ভালো কোম্পানিতে শক্তিশালী পুঁজিবাজার।

সিএসইআরের বিশ্লেষণ: সিএসইআর’এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম পুঁজিবাজার নিয়ে সম্প্রতি সংস্থাটির বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। ঐ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে যে গতিতে বিস্তৃত হয়েছে, দেশের পুঁজিবাজার তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ছিল প্রায় ৪,০৫৬ পয়েন্ট। এক দশক পর তা দাঁড়ায় ৫,২৮০-এর ঘরে, অর্থাৎ বৃদ্ধির হার মেরেকেটে ৩০ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনামের শেয়ারবাজার সূচক বেড়েছে প্রায় ১৩৪ শতাংশ, ভারতের প্রায় ৩০০ শতাংশ এবং তুরস্কের প্রায় ১,৩০০ শতাংশ।

এই ব্যবধান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা অর্থনীতির আকার বিবেচনা করি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু একই আকারের দুই অর্থনীতির পুঁজিবাজারের গভীরতা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের ক্ষেত্রে পার্থক্য ছিল বিস্ময়কর। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাজার তৈরি করতে পারেনি? একটি দেশের পুঁজিবাজার কতটা গভীর ও পরিপক্ব, তার গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক হলো বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত। ভিয়েতনামে এই অনুপাত প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি, তুরস্কে প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তা ছিল মাত্র ৬ শতাংশ, যা আগের বছরের প্রায় ৭.৩ শতাংশ থেকেও কম। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর তুলনায় এই অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো অর্থনীতির প্রকৃত আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। এর কারণ, অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো পুঁজিবাজারের বাইরেই থেকে গেছে। টেলিযোগাযোগ, বহুজাতিক ভোগ্যপণ্য, বড় শিল্পগোষ্ঠী, বেসরকারি ব্যাংকিং ও অন্যান্য লাভজনক খাতের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান এখনো তালিকাভুক্ত নয়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে চাইলে শেয়ারবাজারে সেই অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান না।

লেনদেন বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না? ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেন আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেই পুঁজিবাজারের মৌলিক শক্তি বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পুরো অর্থবছরজুড়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সামগ্রিকভাবে নিট বিক্রেতা ছিলেন। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগের তুলনায় তারা বেশি শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন। মাসভিত্তিক লেনদেনেও অস্থিরতার চিত্র স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর বিদেশিদের লেনদেন এক লাফে প্রায় ৬৬৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসেই তা নেমে আসে ওই মাত্রার এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে। এই ওঠানামা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: বাংলাদেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তর করার মতো আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে দূরে থাকছেন, তার উত্তর কোনো একটি কারণে সীমাবদ্ধ নয়। কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রথমত, মানসম্পন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঘাটতি। দেশের অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না। ব্যাংকঋণের মাধ্যমে তুলনামূলক সহজে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির সঙ্গে যুক্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে চলে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের সামনে ভালো কোম্পানির বিকল্প সীমিত থাকে এবং সূচকও মুষ্টিমেয় কোম্পানির পারফরম্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, সুশাসনের ঘাটতি। ইনসাইডার ট্রেডিং, আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নে নেতিবাচক সংকেত দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দুর্নীতির ধারণা, সীমিত তারল্য এবং কোম্পানির নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপ্রতুলতাকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি অংশগ্রহণ সীমিত থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, তারল্যের সংকট। উচ্চ সুদহার ও কঠোর মুদ্রানীতি বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের তারল্যেও চাপ সৃষ্টি করেছে। একাধিক ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক এখনো নেগেটিভ ইক্যুইটির বোঝা বহন করছে, যা মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে। মুদ্রাবাজার ও পুঁজিবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

চতুর্থত, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও নীতিগত অগ্রাধিকারে পরিবর্তন এসেছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বল্পমেয়াদি বাজার ওঠানামার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ঘন ঘন নেতৃত্ব ও নীতির পরিবর্তন তাদের কাছে অতিরিক্ত ঝুঁকির সংকেত তৈরি করে। সমস্যার তালিকা দীর্ঘ হলেও সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ আশার কারণ তৈরি করেছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পুঁজিবাজার সংস্কারের একটি বিস্তৃত রূপরেখা সামনে এনেছে।

বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যখন অর্থনীতির পরবর্তী ধাপের জন্য আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রয়োজন। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, শিল্পে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হবে। এই মূলধনের একটি অংশ দেশীয় সঞ্চয় থেকে এলেও আন্তর্জাতিক পুঁজির অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

সেই অর্থে পুঁজিবাজার শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্ব পুঁজির সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। তাই সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক গল্প তুলে ধরতে হবে। বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ উদ্যোগে সিঙ্গাপুর, লন্ডন ও দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে নিয়মিত রোডশো, বিনিয়োগকারী সম্মেলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে বিশ্ব বিনিয়োগকারীর কাছে বাংলাদেশের গল্প শুধু প্রচার করে লাভ হবে না। বাজারের গভীরতা, কোম্পানির মান, তথ্যের স্বচ্ছতা, নীতির স্থায়িত্ব, তারল্য এবং অর্থ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দিয়ে সেই গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে আকারে বড় হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি গভীর, স্বচ্ছ, তারল্যসমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাজার। বিদেশি পুঁজি আজ আর কোনো দেশের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র। সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত বাজারকে কয়েকটি কোম্পানির নির্ভরশীলতা থেকে বের করে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে পারি তার ওপর। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা মানে কেবল সূচক বাড়ানো নয়; এর অর্থ হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের একটি নির্ভরযোগ্য দরজা খুলে দেয়া।