কথার লড়াইয়ে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা নানা ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন। সংসদে, রাজপথে বক্তব্য-বিবৃতিতে একে-অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা হচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে প্রায় একই কাতারে থাকা দলগুলোই এখন সরকারি ও বিরোধী দলে। নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও ছিল অনেকটা কাছাকাছি। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও জনমুখী কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া দলগুলো এখন বিভিন্ন ইস্যুতে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে।
সরকার দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্য মাঠের বড় কর্মসূচি পালন করেছে। ৬ দফা দাবি সামনে রেখে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করেছে। দাবি না মানলে সামনে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে নেতারা এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। বিরোধী দলের আড়ালে পতিত শক্তি সক্রিয় হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নও করা হচ্ছে। সরকারি ও বিরোধী দলের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনীতিতে কি বার্তা দিচ্ছে, তাদের লক্ষ্যই বা কী এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ, গণভোটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলো আলোচনা করেই অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নির্বাচনের পরে কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, নিজেদের মধ্যে কেন আলোচনার অবস্থা নেই তা নিয়েও নানা আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে। এমন অবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে মাঠের রাজনীনিতে ফের হানাহানি ও অতীতের দৃশ্য ফিরে আসারও শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে।
দুই রাজনৈতিক শিবিরের পাল্টাপাল্টির বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মানবজমিনকে বলেন, বিরোধী জোট বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে কথা বলছে। আবার অযৌক্তিক কারণেও অনেক কিছু করছে। তবে দেশের মানুষ এখনো তাদেরকে সাচ্চা কোনো বিরোধী দল হিসেবে মনে করে না। ফলে মানুষের কাছে নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে তুলে ধরতে এবং একটি বিরোধী ইমেজ গড়ে তুলতে তারা চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আমরা বিরোধী দল বলতে যেটা বুঝি, তার সঙ্গে তাদের অবস্থানের বেশ বড় পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকবে, কথার লড়াইও থাকবে। তবে পার্লামেন্টে তাদের যেভাবে বিড়ালের মতো দেখা যায়, আবার পার্লামেন্টের বাইরে তারা বাঘ হওয়ার চেষ্টা করছেন- এগুলো কিছুটা স্ববিরোধী।
পরিস্থিতি সংঘাত-সংঘর্ষের পর্যায়ে যাবে এমন কোনো লক্ষণ নেই উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, রাজনীতিতে বক্তব্য রাখতে হয়, কথা বলতে হয়, কাউন্টার আর্গুমেন্ট দিতে হয়, এগুলো তারই অংশ। ফলে এটা নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধী দল যতটা না জনদাবি নিয়ে কথা বলছে তার চেয়ে তাদের লক্ষ্য বেশি রাজনৈতিক ইস্যুতে। জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়টি কিন্তু অনেকটা রাজনৈতিক ইস্যু। অন্যদিকে এসব ইস্যুকে একেবারে অবহেলা করলে সরকারকেও বেকায়দায় পড়তে হতে পারে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাসের সমাধানসহ ছয় দফা দাবি আদায়ে রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
গত শনিবার চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে লংমার্চের প্রথম পর্বের সমাপনী সমাবেশ থেকে সরকারকে সতর্ক করেছেন বিরোধী জোটের নেতারা। তারা বলেছেন, জনগণের দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে। সেইসঙ্গে দাবি আদায়ে কোনো বাধা আসলে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে। তারা সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মূলত এক দফার কথা উল্লেখ করে। একইদিনে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যের জবাবও দিয়েছেন জামায়াতের আমীর ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শুরু হয়েছে কথার লড়াই।
শনিবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা ‘গুপ্ত’ অবস্থায় লুকিয়ে ছিল, তাদের মধ্য থেকে কেউ এখন অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের সময় দলটি ‘গুপ্ত বেশ’ ধারণ করেছিল এবং পরে তাদের নিজেদের লোকজনই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে বক্তব্যে তিনি কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি। রাজনৈতিক মহলে তার এ বক্তব্য জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে ‘গুপ্ত’ প্রসঙ্গটি তোলেন জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান। কিন্তু কারও নাম উল্লেখ করেননি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারি দলের লোকেরা এখন সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়েছে। চুরি-ছিনতাইয়েও যুক্ত হচ্ছে। চার দিন আগে ঢাকার বিমানবন্দরে এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ছিনতাইয়ের সময় নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক বলে পরিচয় দেয়া হলেও গ্রেপ্তারের পর দেখা গেছে তারা বিএনপি’র লোক। এরপরই তিনি বলেন, একেই বলে গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে, সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুপ্ত।
লংমার্চের প্রথম পর্বের সমাপনী সমাবেশে নাম উল্লেখ না করে বিএনপি’র প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের কোনো আন্দোলন নয়। জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন এটি।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো পরিবর্তন আসেনি। সম্প্রতি গাজীপুরের তরুণ সিফাত আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়েও দুই রাজনৈতিক শিবিরের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে। এই তরুণের মুখের ভাষার সমালোচনা করলেও তার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে কথা বলেন জামায়াত আমীরসহ অনেক নেতা। দলটির কর্মী সমর্থকরাও তার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে সরকারি দলের নেতারা বলছেন, সমালোচনারও একটা সীমা থাকা উচিত। ওই তরুণ যে ভাষায় কথা বলেছেন তা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নেই।
ওদিকে বিরোধীদের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করেছেন বিএনপি নেতারা। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিরোধী দল রাজপথে লংমার্চের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে অশ্রাব্য ও আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করছে। জনগণের সামনে যেসব শব্দ উচ্চারণ করা যায় না, তা প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দল শুধু সমালোচনাই করে যাচ্ছে, অথচ সংকট নিরসনে তাদের গঠনমূলক কোনো প্রস্তাবনা নেই। তারা সংসদে এই বিষয়ে কোনো পরামর্শ না দিয়ে বাইরে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে।
একই ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, জাতীয় সংসদ যখন সন্তোষজনকভাবে কার্যকর রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে আন্দোলনের নামে রাজপথে লংমার্চ করার মতো কর্মসূচি সাধারণ মানুষের গণ-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি।
ওদিকে ১১ দলের লংমার্চে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি নেতারাও কড়া বক্তব্য দিয়েছেন। এ ছাড়া দলীয় সভা সমাবেশেও তারা সরকারের প্রতি নানা সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করছেন। জাতীয় সংসদে অংশ নেয়া না নেয়া, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া না দেয়ার বিষয়েও দলটির পক্ষ থেকে এক ধরনের আগাম হুমকি দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের সমাবেশে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের এই অধিবেশনে এখনো আছি। পরের অধিবেশনে যাবো কিনা, আমরা এখনো নিশ্চিত নই। কারণ, জনগণের অধিকার, জনগণের সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, এই সংসদ কোনো কাজেই আসবে না। আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, সংসদ-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে। তার আগেই আপনি হয় জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা ঐক্যবদ্ধভাবে কীভাবে দেশকে নেতৃত্ব দেয়া যায়, সেই রাস্তা খুঁজে বের করুন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সরকারকে জাগাতে এবং সতর্ক সংকেত দিতে লংমার্চ করা হয়েছে। তবে গণভোটের রায় কার্যকর না হলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে। গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হতে।
ওদিকে রাজপথে কথার লড়াইয়ের সঙ্গে জাতীয় সংসদেও সরকারি এবং বিরোধী দলের সদস্যরা প্রায়ই বিতর্কে জড়াচ্ছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউটও করছেন। সংসদে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমকে ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দেখা যায়। একইসঙ্গে তিনি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন। গত ২৭শে আগস্ট অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হট্টগোল ও বাকবিতণ্ডার পর স্পিকার এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে সচল রাখতে এবং জনগণের এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখতে হলে রুলস অব প্রসিডিউর কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
