কিছু আসামির গতিবিধি সন্দেহজনক, নাশকতার আশঙ্কা চিফ প্রসিকিউটরের

কিছু আসামির গতিবিধি সন্দেহজনক, নাশকতার আশঙ্কা চিফ প্রসিকিউটরের

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারপ্রক্রিয়াকে ঘিরে নাশকতা বা স্যাবোটাজের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। কিছু আসামির গতিবিধি ও তৎপরতা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি আরও বলেন, গুমের শিকার ২৫১ জনের পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এর অংশ হিসেবে গতকাল ৫৫টি পরিবারের সদস্য ট্রাইব্যুনালে এসে তাদের স্বজনদের গুম হওয়ার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। আজও অবশিষ্ট পরিবারগুলোর সদস্যদের জবানবন্দি নেয়া হবে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এখন পর্যন্ত ২৫১ জন গুমের শিকার হয়েছেন, যাদের কেউই ফিরে আসেননি। এসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা ‘মায়ের ডাক’-এর ব্যানারে একাধিকবার ট্রাইব্যুনালে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, ২৫১টি গুমের ঘটনায় একই ধরনের পদ্ধতি ও আচরণের মিল পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তুলে নেয়া, পরবর্তীতে তা অস্বীকার করা এবং ঘটনাগুলোর সামগ্রিক ধরনে মিল থাকায় এসব ঘটনাকে ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক’ বা ব্যাপক ও পরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত একজন বা দু’জনের জবানবন্দি নেয়া হবে। পাশাপাশি পরিবারের কাছে থাকা ছবি, নথিপত্র, সাধারণ ডায়েরি, মামলা, রিট পিটিশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী জব্দ করা হবে। এ ছাড়া গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্য, সরকারি নথিপত্র, ব্যবহৃত যানবাহন, প্রত্যক্ষদর্শী এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা হবে বলে জানান তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তের জন্য প্রায় ১৮ জন তদন্ত কর্মকর্তা ইতিমধ্যে কাজ করছেন। তদন্তের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে চলতি বছরের মধ্যেই বিচারকাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাচ্ছি, অন্তত চলতি বছরের মধ্যে যদি ইনভেস্টিগেশন শেষ করে বিচারকাজ শুরু করতে পারি- এরকম একটা লক্ষ্য নিয়ে দ্রুতগতিতে কাজ করছি।

গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের সংগঠিতভাবে একসঙ্গে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, অনেক গুমের ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে একই সময়ে একই স্থান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে এসব ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। তিনি জানান, রাজশাহী, বরিশাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় এসেছেন। আজকের ৫৫টি পরিবারের পর পর্যায়ক্রমে আরও পরিবারকে একইভাবে জবানবন্দি দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে।

তিনি বলেন, একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে তুলে নেয়া হওয়ায় প্রত্যেক পরিবারের কাছে থাকা তথ্য-উপাত্ত একত্র করলে তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। কারা তুলে নিয়েছিল, কোন বাহিনী জড়িত ছিল, কখন ও কোথা থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল এবং প্রত্যক্ষদর্শী কারা- এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুমের ঘটনায় ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর ক্ষোভ ও হতাশা এখনো দূর হয়নি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই ক্ষোভ থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন গুমের ঘটনায় একই ধরনের প্যাটার্ন এবং একই ধরনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর ও সিস্টেমেটিক অপরাধের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রত্যেককে তুলে নেয়ার প্যাটার্ন একই, গুম করে নেয়ার প্যাটার্ন একই। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্বীকার করার প্যাটার্নও একই। সেই কারণে আমরা এসব ঘটনাকে ওয়াইডস্প্রেড এবং সিস্টেমেটিক বলে আখ্যায়িত করেছি। গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ বিচারাধীন এবং কেউ অবসর নিয়েছেন- এমন তথ্যও জানান চিফ প্রসিকিউটর। তবে তদন্তের স্বার্থে এ পর্যায়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে না বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, সাবেক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের জবানবন্দি থেকেও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এবং সামনে আরও তথ্য পাওয়ার আশা রয়েছে।

গুমের ঘটনা তদন্ত জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার, সাক্ষী ও ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্ত শুরুর পর কিছু অভিযুক্ত ব্যক্তির তৎপরতা বেড়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য এসেছে। এমনকি নাশকতা বা তদন্তে বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি গুমের শিকার পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের ভিকটিম পরিবার যারা আছে, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে-বাইরে, আসামিদের আনা-নেয়া এবং গুমের ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে আসা পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। তদন্ত যাতে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত বা ‘স্যাবোটাজ’ না হয়, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে দেশে গুমের বিচার ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে নতুন গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের প্রভাব রয়েছে। তাই তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবার, সাক্ষী এবং ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

আজ থেকে শুরু হওয়া জবানবন্দি গ্রহণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় আগামীকালও গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেয়া হবে। সংগৃহীত জবানবন্দি ও নথিপত্র পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হবে।