উৎপাদন কমছে, দুশ্চিন্তা

তৈরি পোশাক

উৎপাদন কমছে, দুশ্চিন্তা

ফন্ট সাইজ:

তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত এক তীব্র বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় কারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া, গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতে উৎপাদন নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশে। এতে গ্যাসের জন্য সরকারকে বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে চড়া দামে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিল্পমালিকরা। ফলে দ্রুত সমাধান না মিললে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ বিপুল রপ্তানি আদেশ হারাবে বলে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তারা জানান, ইতিমধ্যে কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে তাদের ক্রয়াদেশ কমিয়ে অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্রয়াদেশ হারানোর শঙ্কা আরও বাড়বে। ফলে দেশের রপ্তানি আয় কমে গিয়ে অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস সংকট ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে গত ৩ বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নিটওয়্যার খাতের প্রায় ৩০০ কারখানা প্রায় পুরোপুরি বন্ধের পথে, যা দেড় থেকে দুই মিলিয়ন ডলারের রপ্তানিকে সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলেছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানা সচল রাখতে গড়ে অন্তত ৩ থেকে ৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও মিলছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই। অনেক অঞ্চলে তা নেমে এসেছে শূন্যে। বিকল্প হিসেবে অতিরিক্ত খরচে জেনারেটর, ডিজেল ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে ১২ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।

শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন সাভার, আশুলিয়া, ধামরাইয়ে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্যের বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে ১ হাজার ৮৬৩টি। তথ্য অনুযায়ী, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে গ্যাস সংকটের কারণে কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে উৎপাদন কমেছে। বিশ্লেষণ বলে উৎপাদন কমে গেছে। তার কারণ লোডশেডিং। জেনারেটর চালাচ্ছে, এতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে।

দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সাধারণ সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১৬০ কোটি থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ১০০ কোটি থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট আসে।
বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে আগের মাসের তুলনায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন বা ইউডি ইস্যু প্রায় ২.৮ শতাংশ কমেছে। বিদেশি ক্রেতার ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির জন্য এই সনদ প্রয়োজন হয়। ফলে ইউডি কমে যাওয়াকে নতুন ক্রয়াদেশ কমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ আগস্টে রপ্তানি বাড়লেও আগামী কয়েক মাসের জন্য নতুন কাজের প্রবাহে ইতিমধ্যে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
বিজিএমইএ একজন পরিচালক বলেন, ক্রয়াদেশ হারানোর তথ্য আসছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতারা কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন। এ কারণে কিছু অর্ডার তারা আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোয় প্লেস করে দিচ্ছেন।

সংকট নিরসনে সরকার সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং এবং ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভোলার গ্যাস ট্রাকে করে কারখানায় আনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে শিল্পমালিকরা বলছেন, এসব সাময়িক পদক্ষেপের চেয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে গ্যাসের বিকল্প বণ্টন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সচল রাখা এবং পাইপলাইনের শেষ প্রান্তের কারখানাগুলোতে অন্তত ৩-৪ পিএসআই চাপ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত টেকসই সমাধান না মিললে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ বিপুল রপ্তানি আদেশ হারাবে বলে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। গ্যাস সংকট সমাধানে সিএনজি স্টেশন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করা হলে শিল্পকারখানা উপকৃত হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) বলেন, ভোলার গ্যাস কতোখানি কাজে লাগবে তা দেখার বিষয়। তবে গ্যাস সংকট সমাধানে বিজিএমইএ একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি কার্যকর হলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হবে। তিনি বলেন, গ্যাসভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করে তেলভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট চালু করে সেই গ্যাস শিল্পকারখানায় দিলে উপকৃত হবে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ঢাকার কাছে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকায় কারখানা বন্ধ না হলেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

আশুলিয়ার গাজীরচটের ফৌজিয়া ও ফাহিম ফ্যাশন কারখানার কর্মচারী মনির হোসেন জামগড়া এলাকার সাউথ-বেঙ্গল সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সিলিন্ডারে করে তারা গ্যাস নিয়ে যান।
তিনি বলেন, কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য অন্তত ৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। অথচ পাওয়া যাচ্ছে ১ থেকে ২ পিএসআই।
সিএনজি স্টেশনের কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ইউনিটপ্রতি গ্যাসের চাপ ৮ থেকে ১০ পিএসআই থাকে, এখন তা ২ পিএসআইয়ের নিচে নেমে এসেছে।
আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার তৈরি পোশাকের ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা এ আর ওয়েট প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সেলিম রেজা বলেন, কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআই। কিন্তু এখন তা ১ থেকে ২ পিএসআইয়ের মধ্যে ওঠানামা করছে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৫০ হাজার পিস উৎপাদন হতো। এখন ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস করা যাচ্ছে।

তৈরি পোশাকশিল্পে গ্যাস সংকট নিরসন ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- গ্যাসের নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে; নতুন সংযোগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা, যাতে কারখানাগুলো সময়মতো উৎপাদন শুরু করতে পারে; লোড বাড়ানোর প্রয়োজন নেই, শুধু সরঞ্জাম পরিবর্তন, পরিমার্জন বা স্থানান্তরের জন্য আবেদনকারীদের একটি আলাদা তালিকা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়া; কম লোড বাড়ানোর আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ প্রদান, যা ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে যেতে সাহায্য করবে এবং যেখানে গ্যাস পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত কারখানাগুলোয় গ্যাসের চাপ কমে যায়, সেখানে অন্তত তিন-চার পিএসআই চাপ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।