২ বিলের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

ফন্ট সাইজ:

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তির মধ্যেই মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে দণ্ডণীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিতে তিনটি বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। রোববার জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলগুলো পাস হয়। এসব বিল পাসের প্রতিবাদ জানিয়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড: ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপসযোগ্য নয়- এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।
বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একইসঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে- কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারি কর্তৃপক্ষ বা শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কাউকে গ্রেপ্তার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনোভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তা অস্বীকার করলে অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন করলে এবং এর মাধ্যমে তাকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

নতুন কাঠামোতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন। নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার বিধান রয়েছে। কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেয়া হয়েছে।

সম্পত্তিতে আজীবন ভোগস্বত্ব: সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধন করে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
এর ফলে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।
এজন্য আইনে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে এই বিধান সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
সরকার বলেছে, নতুন ব্যবস্থা প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্য স্বীকৃত পদ্ধতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে না।

বিরোধীদের আপত্তি: বিল তিনটি পাসের আগে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে পরবর্তী আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নেননি।
তিনি অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগী, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিল করা হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রস্তাবিত বিলটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও সংকীর্ণ হয়েছে। এতে প্যারিস নীতিমালা, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনের মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক দলিল যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করে বলেন, এই আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী। সরকার ও বিএনপি’র পক্ষ থেকে কোরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনো আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করা হচ্ছে।

দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামও বলেছেন, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে দানের এই বিধান ইসলামী আইনের পরিপন্থি। এতে আল্লাহর দেয়া মিরাসি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর যুক্তি নেই। বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালের আইন রয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে এর পক্ষে ভোটদানকারীদের দায়ভার নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল এই বিল পাসের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।

ভিন্নমত রুমিন ফারহানার: ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এর বিষয়ে আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনের কথা বলেন তিনি।