দিল্লি ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের মতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী লবি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়ন প্রচেষ্টা ভেস্তে দিতে ভূমিকা রাখছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের নয় এমন (নন-আইএফএস) একজন কর্মকর্তা ও রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের জন্য ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্ভবত অসন্তুষ্ট। চলতি বছরের শুরুতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক বৈঠকে মোদি প্রতিবেশী দেশগুলোতে আরও নন-আইএফএস ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কমাতে ত্রিবেদীর প্রচেষ্টা, এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের সম্ভাব্য তারিখে সম্মত করানোর প্রচেষ্টাও সবার কাছে প্রশংসিত হয়নি।
সফরের তারিখ প্রকাশ্যে চলে আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যত বিষয়টি ভেস্তে দেয়ার ভূমিকা নেয়। প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে তারা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি দেয়। সেখানে তিনি বাংলাদেশের সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, এক বছর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লি প্রেস ক্লাবে হাসিনার একটি প্রস্তাবিত সংবাদ সম্মেলন আটকে দিয়েছিল। এর আগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে কারাবন্দি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষে কথা বলতে চাওয়া এক বৃটিশ দূতকেও সেখানে বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।
তবে হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের দুই সপ্তাহ পর বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কিছুটা বদলে যায়। ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব যখন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সেমিনারের আয়োজনের চেষ্টা করে, যেখানে কথিতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বক্তারা উপস্থিত থাকার কথা ছিল, তখন সরকার অনুষ্ঠানটি বাতিলের নির্দেশ দেয়। প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য ক্লাব প্রাঙ্গণে গিয়ে অবস্থান নেন।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অসমঝোতামূলক অবস্থানের প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে সাবেক কিছু ভারতীয় কূটনীতিকের লেখাতেও। তারা লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণেই নাকি তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দোলাচলের সৃষ্টি হয়। দুই পক্ষের তিক্ততা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারেক রহমান দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা কম।
সিজেপি শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপের পর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাপের মুখে পড়েছে। তবে ব্যাপক সমালোচিত জুলাইয়ের পুলিশি দমন-পীড়নের মাত্র এক মাস পর, চলতি মাসে অবসরে যাওয়ার কথা থাকা ক্যাবিনেট সচিব ড. টি ভি সোমানাথন এবং স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহনকে আরও এক বছরের জন্য দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সময় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যে পরিণত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টির প্রতিফলন হিসেবেই তাদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র সচিব পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর পেলেট ছোড়ার সিদ্ধান্ত বন্ধ করে দেন। কঠোর এই পদক্ষেপটি শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারতো। ক্যাবিনেট সচিবও তাকে সমর্থন করেছিলেন।
দিল্লি পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছিল পুলিশ কমিশনার সতীশ গোলচাকে আকস্মিকভাবে বদলি করার তিনদিনের মধ্যেই। তার স্থলাভিষিক্ত হন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর বিশেষ পরিচালক অনুরাগ কুমার। ধারণা করা হয়েছিল, গোয়েন্দা সংস্থায় তার অভিজ্ঞতা অশান্ত শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে সহায়তা করবে। বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সংঘাত বেড়ে যায়। যন্তর মন্তরের ঘটনার একটি পরিণতি হলো, সরকারি কর্মকর্তারা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে মন্ত্রীদের কাছ থেকে লিখিত নির্দেশ চেয়ে নিচ্ছেন।
দিল্লির তথাকথিত ‘লুটিয়েন্স সংস্কৃতি’র সমালোচনা করা বিজেপি’র এমপিদের অনেকেই জিমখানা ক্লাবকে উচ্ছেদের সরকারি নোটিশে খুব একটা সহানুভূতি দেখাচ্ছেন না। তাদের ধারণা, ক্লাবকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে এর বাইরে থাকা মানুষদের নিজেদের তুলনামূলকভাবে নিচু শ্রেণির বলে মনে হতে পারে। একজন মন্ত্রী স্মরণ করেন, বহু বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার কাজে তিনি দিল্লিতে এসেছিলেন। তখন তার আইনজীবী তাকে চা খাওয়ার জন্য ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে বহিরাগত হিসেবে অনুভব করানো হয়েছিল। তার সন্দেহ হয়েছিল, এর কারণ সম্ভবত তিনি ইংরেজিতে কথা বলতেন না।
ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার বা আইআইসি সম্পর্কে তার এই পূর্বধারণা অবশ্য ভুলও হতে পারে এবং দুই প্রতিষ্ঠানের তুলনাটিও পুরোপুরি ন্যায্য নয়। আইআইসির সদস্যপদের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সম্ভাব্য সদস্যের পেশাগত অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির প্রতি তার আগ্রহের ভিত্তিতে। অন্যদিকে জিমখানা ক্লাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, সেখানে বংশানুক্রমিক সদস্যপদ এবং অভিজাততন্ত্র গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত।
টাটা সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা দ্বন্দ্বে একটি আকর্ষণীয় উপ-ঘটনাও ছিল। কয়েক মাস আগে তৎকালীন ট্রাস্টি মেহলি মিস্ত্রি বেই হিরাবাই টাটা চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশনের ১৯২৩ সালের দলিলের বিষয়টি সামনে আনেন। ওই দলিলে বলা হয়েছে, ফাউন্ডেশনের সব ট্রাস্টিকেই পারসি হতে হবে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, মেহলি মিস্ত্রি মূলত দুই নন-পারসি ট্রাস্টি ভেনু শ্রীনিবাসন ও বিজয় সিংকে লক্ষ্য করেই বিষয়টি তুলেছেন। তবে কয়েকজন পারসি সন্দেহ করেছিলেন, তিনি হয়তো নোয়েল টাটার দিকেও ইঙ্গিত করছেন। নেভাল টাটার ছেলে হিসেবে নোয়েলের পারসি পরিচয় নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু কয়েকজন প্রবীণ সদস্য যুক্তি দিয়েছিলেন, নোয়েলের প্রয়াত মা সিমোন দুনোয়ে ছিলেন একজন খ্রিস্টান। তারা নোয়েল ছোটবেলায় পারসি ধর্মে দীক্ষা নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ‘নভজোতে’ অনুষ্ঠান করেছিলেন কিনা, সেটিও মনে করতে পারছিলেন না। বাস্তবে পারসি হিসেবে নোয়েল টাটার অবস্থান নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
শাপুরজি পালোনজি মিস্ত্রির মেয়ে আলুর সঙ্গে নোয়েলের বিয়ের আগে রক্ষণশীল ও গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ শাপুরজি তার হবু জামাতাকে বিয়ের আগে ‘নভজোতে’ ধর্মীয় দীক্ষা অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে যাওয়ার জন্য জোর দিয়েছিলেন।
