বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনবল নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস। গত ১৩ই আগস্ট দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পরামর্শ বৈঠকে (এফওসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাব দেয় ভিয়েনতিয়েন। এর
মাধ্যমে শ্রম সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর গত মাসে প্রথমবারের মতো এফওসি বৈঠক করে ঢাকা ও ভিয়েনতিয়েন। ইতিমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আলোচনা ও পর্যালোচনার পর খসড়াটি চূড়ান্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লাওসের কাছে পাঠানো হবে। লাওস সরকার এতে মত দিলে পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের শ্রম সহযোগিতা তরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে পারবে সরকার।
সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে লাওসে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করছেন। তবে তারা কোনো নির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় সেখানে যাননি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশি কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সেখানে কর্মরত প্রতিটি বাংলাদেশি কর্মী যেন যথাযথ সুযোগ-সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করেই সমঝোতা স্মারকের খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। খসড়া প্রস্তুত হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা লাওসের কাছে পাঠানো হবে।
তবে পুরো প্রক্রিয়া কতদিনের মধ্যে শেষ হবে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি দুই মন্ত্রণালয়ের কোনোটি। জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সমঝোতা স্মারকের খসড়া প্রস্তুত হলে তা লাওসের কাছে পাঠানো হবে। লাওস সরকার এতে সম্মত হলে পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। এরপর সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
লাওসের অর্থনীতিতে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। জ্বালানি, অবকাঠামো, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতকে লক্ষ্য করে বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করছে দেশগুলো। এরমধ্যে বেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে অবকাঠামো খাত। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অবকাঠামো খাতে লাওসে কর্মীর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়ায় এগোতে চাইছে ভিয়েনতিয়েন।
বাংলাদেশ-লাওস সম্পর্কে নতুন সহযোগিতার উদ্যোগ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আগস্টে ভিয়েনতিয়েনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও লাওসের মধ্যে পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের পরামর্শ বৈঠক (এফওসি) অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৮ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছর পর দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের প্রথম বৈঠক এটি। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং লাওসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আনৌপার্ব ভংনোরকেও যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, জলবায়ু পরিবর্তন, কনস্যুলার সহযোগিতা ও উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে সম্মত হয় দুই দেশ। একই সঙ্গে শ্রম সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক প্রণয়ন করে বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একমত হয় ঢাকা ও ভিয়েনতিয়েন। এ ছাড়া তরুণ কূটনীতিকদের মধ্যে বিনিময়, পর্যটন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের কৌশল নিয়ে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা বিনিময়ের বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়।
কনস্যুলার বিষয়ে বাংলাদেশ লাওসকে বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা কমানোর অনুরোধ জানায়। লাওসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়া হয়।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। দুই পক্ষই স্বীকার করে যে, দুই দেশের মধ্যে বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় কম। এ কারণে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও উভয় পক্ষ সম্মত হয়। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ বাণিজ্য ও শিল্প চেম্বারের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনিময় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের ওষুধ ও কৃষিপণ্যের বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করে লাওস।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে লাওসের সহযোগিতার প্রশংসা করে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে দেশটির অব্যাহত সমর্থন কামনা করে। লাওস বাংলাদেশকে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ও লাওস। জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল নিয়ে অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম চর্চা বিনিময়ের বিষয়েও উভয়পক্ষ সম্মত হয়।
