গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে শনিবার ইরানের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই তথ্য জানিয়েছে। খার্গ দ্বীপ থেকে তাসনিমের এক প্রতিবেদক জানান, দ্বীপটির নোঙর এলাকায় ট্যাংকারটিতে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম জানিয়েছে, হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ট্যাংকারটির ক্রুদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
এর আগে গত ৩১শে আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত পোস্ট দেন। পোস্টটির সঙ্গে এআই-নির্মিত একটি ভিডিও যুক্ত করে তিনি দাবি করেন, খার্গ দ্বীপকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে’।
অন্যদিকে খার্গ দ্বীপে হামলা হলে কঠোর পাল্টা জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে ইরান।
অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজের (ওপেক) তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক ইরান। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি হতো। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানিতে অবরোধ আরোপের পর থেকে এই তেল প্রবাহে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে।
খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলা হলে ইরানের তেলশিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যেই মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে রয়েছে।
‘খুব শিগগির’ ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনে হামলার হুমকি ট্রাম্পের
বরাবরের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনে ‘খুব শিগগির’ হামলার চালানোর হুমকি দিয়েছেন। জবাবে ইরান বলেছে, তারা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। এর আগে জুলাইয়ের মাঝামাঝিতেও ট্রাম্প একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তার জবাবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা এলহামি বলেছেন, ইরান এখন বা ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের সংঘাত মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। কারণ, ‘হুমকি এখনও শেষ হয়নি।’ এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ গাজা থেকে মানুষ সরিয়ে দেয়াকে সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে উল্লেখ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আল- জাজিরাকে জানিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের কোনো পরিকল্পনাকে ওয়াশিংটন সমর্থন করে না।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে ১ লাখ মার্কিন নাগরিক নিহত হলেও ইরানের সঙ্গে সংঘাতে এ পর্যন্ত মাত্র ১৮ জন আমেরিকান নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘বিক্ষিপ্তভাবে’ চলছে। একই সঙ্গে তিনি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনে হামলার হুমকি দেন। তবে ইরান যুদ্ধকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে নিহত ১৮ মার্কিন সেনা এবং আহত শত শত সেনাসদস্যের জন্য এই যুদ্ধকে ‘ছোটখাটো’ বলার কোনো সুযোগ নেই। এক্সে দেয়া এক পোস্টে শুমার লিখেছেন, আমরা যে ১৮ সেনাকে হারিয়েছি, তাদের পরিবারকে এই কথা বলুন। আহত শত শত সেনাসদস্যকে বলুন। আর রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির কারণে যারা প্রতিদিন কষ্ট পাচ্ছেন, সেই আমেরিকানদের বলুন। তিনি আরও বলেন, এটা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়।
ধারণা করা হয়, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনের সুড়ঙ্গগুলোতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে দেয়া তার আগের হুমকিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তখন তিনি হিউ হিউইট শো’তে বলেছিলেন, আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইন ধ্বংস করতে যাচ্ছি। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন। আমরা সম্ভবত খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাবো।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইন সম্পর্কে কী জানা যায়?
স্থানীয়ভাবে কুহ-ই কোলাং গাজ লা নামে পরিচিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইন ইরানের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার কাছে অবস্থিত। সেখানে পাহাড়ের গভীরে দু’টি বিশাল সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স আছে। ২০২০ সালের দিকে ওই এলাকায় খননকাজ শুরু হয়। পাহাড়টির শত শত মিটার পুরু কঠিন গ্রানাইট পাথরের গভীরে এই কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান সেখানে একটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করছিল। এটি দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি ‘কৌশলগত বিকল্প’ হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ইরান এর আগে দাবি করেছে, স্থাপনাটি শুধু সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো এমন গভীরতায় নির্মাণ করা হয়েছে যে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মজুত থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার ধ্বংসকারী বোমার আঘাত থেকেও সুরক্ষিত থাকতে পারে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় ৫০ জয়েন্ট স্টাফ সদস্যের পলিগ্রাফ পরীক্ষা: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের তদন্তকারীরা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট স্টাফের প্রায় ৫০ সদস্যের পলিগ্রাফ পরীক্ষা নিয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত মাসে সামরিক কর্মকর্তা ও জয়েন্ট স্টাফের বেসামরিক কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তারা ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য সাংবাদিকদের দিয়েছেন কি না। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, অভ্যন্তরীণ কর্মী বা তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তর মন্তব্য করে না। তবে শ্রেণিবদ্ধ জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের প্রতিটি ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং এ ধরনের ঘটনা তদন্ত করা হয়।
