শহিদুল ইসলাম। বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল গ্রামে। পাশের দুর্গাবর্দী গ্রামের আবুল হাসান ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখান শহিদুলকে। ২০ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চুক্তিও করেন। গেল বছরের শেষের দিকে শহিদুলকে প্রথমে দুবাই। দুবাই থেকে মিশর। পরে মিশর থেকে লিবিয়া নেয়া হয়। লিবিয়ায় গেম ঘরে আটকে রেখে চুক্তির ২০ লাখ টাকা নেয়া হয়। পরে হাওয়ার বোটে ইতালি নেয়ার চেষ্টা করলে লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের কাছে ধরা পড়েন শহিদুল। বেধড়ক মারধর ও দুই মাস ত্রিপোলির আল-খুমজ ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে বাংলাদেশি মাফিয়ার কাছে বিক্রি করা হয় শহিদুলকে। সীমাহীন মারধর করে পরিবারের কাছে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। মুক্তিপণ দিয়ে শহিদুলকে উদ্ধার করে আইএমও’র মাধ্যমে দেশে আনা হয়। দেশে ফিরে পাচারকারী আবুল হাসান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করেন শহিদুল।
মামলায় হাসান গ্রেপ্তারও হয়। তবে জেলে বসেই নিজের খালাকে দিয়ে শহিদুলের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা ঠুকে দেন। মামলায় শহিদুল, তার বোন ও বৃদ্ধ মা’কে জেলে যেতে হয়। মানব পাচারকারী আবুল হাসান জামিনে বের হলেও জামিন পায়নি পাল্টা মামলায় জেলে যাওয়া ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। শরীয়তপুর সদর উপজেলার উত্তর ভাষাবচর গ্রামের মানিক চোকদার। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে একই গ্রামের দালাল আমিনুল বেপারী ও এনামুল বেপারীর প্রলোভনে পড়ে ইতালিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মানিক। চুক্তি অনুযায়ী গেল বছরের ১৫ই এপ্রিল ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করে মানিকের পরিবার। এর এক মাস পর ১৬ই মে মানিককে আকাশপথে প্রথমে ভারতের চেন্নাই এয়ারপোর্ট ট্রানজিট দিয়ে শ্রীলঙ্কা নিয়ে যান দালাল চক্রের সদস্যরা। পরে সেখান থেকে ১৭ই মে দুবাই ট্রানজিট দিয়ে মিশরে পাঠায়। মিশরে তিন মাস রেখে ২৬শে আগস্ট লিবিয়ায় নেয়া হয়।
সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি দালাল চক্র তাকে একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়। এরপর দুই দফায় ২০ লাখ টাকা নিলেও মানিক নিখোঁজ রয়েছে। ছেলের খোঁজ না পেয়ে দালালের বিরুদ্ধে মামলা করেন মানিকের পরিবার। মামলায় ৪ জন গ্রেপ্তার হলেও অল্প দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে যান। কিন্তু এখনো ছেলের খোঁজ পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। বরং উল্টো মামলার শিকার হয়েছেন বাবা দেলোয়ার হোসেন। মূলত পাচারকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় পাল্টা মামলা করে ভুক্তভোগীদের আপস করতে বাধ্য করেন। চাপ দেন মামলা তুলে নিতে। এতে আসামিরা জামিন চাইলে বাধা দেন না বাদীরা। এতে সহজেই কারাগার থেকে বেরিয়ে যান আসামিরা। কেউ কেউ আবার উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে যান। এছাড়া মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, যথাযথ প্রমাণের অভাব ও আইনি দুর্বলতার কারণে অনেক সময় আসামিরা জামিন পেয়ে বাইরে চলে যায়। জেল থেকে বেরিয়ে আবারো পাচারে জড়িয়ে যান। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে এমন ঘটনা এখনো নিত্যদিন ঘটছে। দেশে মানবপাচারের যত মামলা আছে, তার এক তৃতীয়াংশই এই চার জেলার আদালতে বিচারাধীন।
সরকারি হিসাব বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ৩৫২টি মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি মামলার ৩৯ আসামি সাজা পেয়েছে। বাকি ৩৩৭ মামলার এক হাজার ২৫৯ আসামি খালাস পেয়ে যান। মামলার গ্রেপ্তার হলেও আসামিরা দ্রুত সময়ে জামিনে বেরিয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৮ বছর ৫ মাসে মানব পাচার অপরাধে ৬ হাজার ৮২৫টি মামলা হয়। এসব মামলায় আসামি ছিল ৩০ হাজার ২৯৫ জন। এর মধ্যে ১১ হাজার ২৮০ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। তবে মামলা চলমান আছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মানব পাচারের ঘটনায় সারা দেশে ৫০০টি মামলা হয়েছে। এতে আসামি সংখ্যা ২ হাজার ৩৩৪ জন। এদের ৪৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি আসামি দেশ-বিদেশে পলাতক রয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালে মানব পাচার সংক্রান্ত ৭৩৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ওই বছর আদালতে ২৪৫টি মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ৯টি মামলায় ২৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়।
বাকি ২৩৬ মামলার আসামি খালাস পেয়ে যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে আদালতে ১০৭টি মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় ১১ জনের সাজা হয়। বাকি ১০১ মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। এদিকে, ৩১শে মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার ৮১৭টি মামলা তদন্তাধীন ছিল। এবং আদালতে বিচারাধীন ছিল ৩ হাজার ২৭৮টি মামলা। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, মানব পাচার মামলায় সারা দেশের কারাগারে বন্দি আছেন ৪০০ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত বছরের (২০২৩) নভেম্বর মাসের মানব পাচার সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে করা ৩৩২ মামলার বিচার বিভিন্ন আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৬ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন, যা মোট মামলার ৯৫ দশমিক ১৮ শতাংশ।
আইনজীবীরা বলছেন, তদন্তে দুর্বলতা, সাক্ষীর অভাব, অপরাধী চক্রের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের আদালতের বাইরে আপস করার কারণে মাদারীপুরে হওয়া সিংহভাগ মানব পাচার মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে আদালতে সময়মতো সাক্ষীরা উপস্থিত না হওয়া বা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো। পাচার প্রক্রিয়াটি সাধারণত শ্রীলংকা, দুবাই, মিশর, লিবিয়া বিস্তৃত থাকায় আন্তর্জাতিক স্তরে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি থেকে যায়। এজন্য মামলা প্রমাণ করতেও কঠিন হয়ে যায়। মানব পাচারের অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়, পরবর্তীতে তারা জামিন নিয়ে পুনরায় সে কাজই অব্যাহত রাখেন।
মানব পাচার মামলা নিয়ে কাজ করা ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ইমরুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, বেশির ভাগ মামলা সমঝোতা হয়ে যায়। বাদী আসামির জামিনেও সম্মতি দেন। মূলত টাকা উদ্ধারে এসব মামলা করা হয়, আসামি জেলে থেকেই কিছু টাকা পরিশোধ করে দেন। তখন বাদী আর মামলা চালানোর প্রয়োজন মনে করেন না। তাই আসামি খালাস পেয়ে যান। খালাসের মামলার অধিকাংশ আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন, মামলার বাদী মামলা চালাবেন না বলে আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেছেন। আসামি ও বাদী বিষয়টি নিয়ে আপস-মীমাংসা করে মামলা চালাবে না বলে আদালতে জানান। এছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার মতো কোনো উপাদান না থাকায় মামলার দায় হতে অব্যাহতি প্রদান করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আল মামুন রাসেল মানবজমিনকে বলেন, মানবপাচার মামলা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় ৬ থেকে ৭ জন আসামি হয়। এদের মধ্যে হয়তো মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকে দু’-একজন। কিন্তু ক্ষেত্রে যারা জানে না এ বিষয়ে শুধু ব্যক্তিগত আক্রোশে আসামি করা হয়। অনেক সময় অন্য কোনো কারণে শত্রুতা থাকলে তাকেও আসামি করে দেয়া হয়। ঘটনার স্থান দেশের বাইরে হওয়ায় অধিকাংশ মামলার সঠিক তদন্ত সঠিকভাবে হয় না। এটি এ আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একতরফা তদন্ত হয়, কারণ আসামিরা দেশের বাইরে থাকায় তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায় না।
