লিবিয়াকে নিয়ে গোপন পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা দেশটিতে সচল দুই সরকারকে এক করে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে। লিবিয়ার সংকট সমাধানে এই প্রচেষ্টা উল্টো ফল দিতে পারে বলে এক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন লিবিয়ার শিক্ষাবিদ, পুরষ্কার বিজয়ী সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মুস্তাফা ফেতুরি। অনলাইন আরটি’তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তিনি লিখেছেন, প্রায় এক বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বৌলস ত্রিপোলি, বেনগাজি, প্যারিস, রোম ও আবুধাবিকে যুক্ত করে একটি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরালোভাবে চালিয়ে আসছেন। তার প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি লেনদেনভিত্তিক রাজনৈতিক সমঝোতা এগিয়ে নেয়া, যার মাধ্যমে লিবিয়ার প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ পশ্চিম-পূর্ব বিভাজনের অবসান ঘটাতে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক জোট প্রতিষ্ঠা করা যায়।
গত সেপ্টেম্বর থেকে প্রথমে রোমে এবং পরে বিভিন্ন রাজধানীতে গোপনে যে পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, তার মূল বিষয় হলো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট কাঠামোর পুনর্গঠন। এর আওতায় পূর্ব লিবিয়ার স্থলবাহিনীর কমান্ডার খলিফা হাফতারের উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সাদ্দাম হাফতারকে পুনর্গঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের নেতৃত্বে বসানোর কথা রয়েছে। একই সঙ্গে আবদুল হামিদ দাবাইবাহকে প্রধানমন্ত্রী পদে রাখা হবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ তৈরি করার পরিবর্তে এই কাঠামো রাষ্ট্রের বিভক্তিকে একটি স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে।
এর মাধ্যমে পশ্চিমে দাবাইবাহ প্রশাসন এবং পূর্বে হাফতার পরিবারের নেটওয়ার্ককে কার্যত একটি বংশানুক্রমিক দ্বৈত ক্ষমতাকাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।
এ ধরনের উদ্যোগের পথ তৈরি করতে ওয়াশিংটন প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপকে কাজে লাগিয়েছে। এপ্রিলে বৌলসের মধ্যস্থতায় ১৯০ বিলিয়ন দিনারের একটি রেকর্ড পরিমাণ ঐক্যবদ্ধ বাজেট চুক্তি হয়- ২০১৪ সালের পর লিবিয়ায় এটাই ছিল এ ধরনের প্রথম চুক্তি। একই সময়ে আফ্রিকমের ফ্লিন্টলক মহড়ার আওতায় সির্তেতে যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্ব ও পশ্চিম লিবিয়ার বাহিনীর পাশাপাশি ইতালি এবং এক ডজনেরও বেশি আফ্রিকান দেশ অংশ নেয়। তবে এই লিখিত না থাকা লেনদেনভিত্তিক নকশাকে জাতীয় সমঝোতা হিসেবে বিবেচনা করা সংকটটির প্রকৃত চরিত্রকে ভুলভাবে বোঝা।
সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো কাঠামো তৈরি করা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা মিলিশিয়া নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে এই ব্যবস্থা একটি অভিজাত দ্বৈত ক্ষমতাকাঠামোকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। সাময়িক আর্থিক বণ্টন এবং তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত ঐক্যবদ্ধ সামরিক মহড়াকে কাজে লাগিয়ে ওপর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। এতে প্রকৃত রাষ্ট্র গঠন না করে ক্ষমতাসীন দুই পরিবারের মধ্যে একটি ভঙ্গুর সমঝোতাকেই রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে লিবিয়ার তেল ও গ্যাসসম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ জনগণের বদলে একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর হাতেই যেতে থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বৌলসের উদ্যোগটি কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই পরিচালিত একটি অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক তৎপরতা। বহিরাগত মধ্যস্থতার আইনি ভিত্তি প্রদানকারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মৌলিক প্রস্তাবগুলো উপেক্ষা করায় ওয়াশিংটনের এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগ স্থানীয় পক্ষগুলোকে সমঝোতায় আবদ্ধ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন থেকে বঞ্চিত।
এ ছাড়া পরিকল্পনাটিতে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থাও নেই। এটি বর্তমান মার্কিন রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। প্রস্তাবিত দুই থেকে তিন বছরের অন্তর্বর্তী সময় শেষে নবনিযুক্ত নির্বাহী নেতারা ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে কী করা হবে, সে বিষয়েও কোনো প্রটোকল নেই। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো মধ্যস্থতাকারী না থাকলে, যিনি পক্ষগুলোকে সমঝোতা মানতে বাধ্য করতে পারেন, এই উদ্যোগ একটি বিপজ্জনক ক্ষমতার ফাঁদে পরিণত হতে পারে। ফলে বাইরের শক্তিগুলোর অগ্রাধিকার বদলে গেলেই লিবিয়া আবারও সংঘাতের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগটি জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন চলমান মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘের লিবিয়া সহায়তা মিশন বা ইউএনএসএমআইএলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতিসংঘের ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়াটি নিঃসন্দেহে ধীরগতির এবং এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
তবে এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে এবং স্বীকৃত, যদিও ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিনিধি পরিষদ এবং স্টেটের উচ্চ পরিষদ।
ওয়াশিংটন এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে অভিজাতদের মধ্যে দ্রুত একটি সমঝোতার পথ বেছে নেয়ার চেষ্টা করছে। এতে ইউএনএসএমআইএল বছরের পর বছর ধরে যে নাজুক প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, তা পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
