পাকিস্তানের পার্লামেন্ট আগস্টের শেষ দিকে এমন একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক পদটির ক্ষমতা আইনে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে শুরু হওয়া দেশটির সামরিক কমান্ড কাঠামোর পুনর্গঠন আরও এক ধাপ এগোল।
গত ২০ আগস্ট পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ‘ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৬’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০’-এর একটি সংশোধনী অনুমোদন করে। এই দুটি আইনের মাধ্যমে গত বছরের সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) পদটির আইনগত কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
আইন দুটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির মূল আলোচ্যসূচিতে ছিল না। ওই দিন সকালে মন্ত্রিসভা এগুলো অনুমোদন করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পার্লামেন্টে পাস হয়। গত বছরের নভেম্বরে ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনীও একইভাবে দ্রুততার সঙ্গে পার্লামেন্টে পাস হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের চার দিনের সংঘাতের এক বছরের কিছু বেশি সময় পর এই পরিবর্তন আনা হলো। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৬ সালের পর পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের সামরিক কমান্ড কাঠামোয় এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠন।
১৯৭৬ সালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সীমিত সমন্বয়ের জন্য চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি (সিজেসিএসসি) পদটি চালু হয়। এখন সেই পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে গঠন করা হয়েছে ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স (ডিএফএইচকিউ)। এর নেতৃত্বে থাকবেন সিডিএফ। বর্তমানে এই পদে রয়েছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, যিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও।
পরিবর্তনগুলোর কারণ এবং নতুন সদর দপ্তরে নৌ ও বিমানবাহিনী কীভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে- এসব বিষয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর)-এর কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেশটির সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছে। সামরিক বাহিনী চারবার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে এবং তিন দশকেরও বেশি সময় সরাসরি দেশ শাসন করেছে।
এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। নতুন আইন সেনাপ্রধানের এমন কিছু ক্ষমতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে, যা তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করে আসছিলেন।
সিডিএফের ক্ষমতা সিজেসিএসসির চেয়ে কতটা আলাদা?
আগের কাঠামোয় সিজেসিএসসির ভূমিকা ছিল মূলত সমন্বয়কের। তার নৌ বা বিমানবাহিনীর ওপর সরাসরি কোনো কমান্ডিং ক্ষমতা ছিল না। তিন বাহিনীই মূলত নিজেদের কার্যক্রম স্বাধীনভাবে পরিচালনা করত। নতুন আইনে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। সিডিএফকে ‘সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের’ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ফলে শুধু সেনাবাহিনী নয়, তিন বাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য তিনি ফেডারেল সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
পাকিস্তানের সামরিক কমান্ড কি আরও বেশি সেনাবাহিনীকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে?
নতুন ক্ষমতার কাঠামো তিন বাহিনীর মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট করছে কি না- এটাই এখন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অঙ্গনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক। নতুন আইনে কমান্ডার অব দ্য ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড (সিএনএসসি) পদটি সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে।
জেনারেল সৈয়দ আমের রাজাকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রথম সিএনএসসি নিয়োগ করা হয়। নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা এই পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বাদ পড়েছেন।
লাহোরভিত্তিক কৌশলগত বিশ্লেষক মাজিদ নিজামী বলেন, যেহেতু সিজেসিএসসি পদটি পালাক্রমে তিন বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে দেয়া যেত, সেটি বিলুপ্ত হওয়ায় ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কমান্ডার পদটি এখন স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ফলে নৌ বা বিমানবাহিনীর কোনো ফোর-স্টার কর্মকর্তা ওই পদে যাওয়ার সুযোগ আনুষ্ঠানিকভাবেই বন্ধ হয়ে গেছে।
রাওয়ালপিন্ডিভিত্তিক অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেল বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্র যে সেনাবাহিনীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট।
বেসামরিক সরকারের সামরিক বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে?
নতুন আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় মতবিরোধ হলো এটি সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণকে কতটা প্রভাবিত করবে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বর্তমানে আইনজীবী কর্নেল ইনাম রহিম বলেন, নতুন আইন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা সরিয়ে দিচ্ছে।
তার মতে, আগে কোনো সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা অবসরে পাঠাতে হলে প্রধানমন্ত্রীর ও মন্ত্রিসভার কাছে সারসংক্ষেপ পাঠাতে হতো। এখন সেই ক্ষমতা শুধু সিডিএফের হাতে থাকবে।
ইসলামাবাদভিত্তিক ওই প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বলেন, পাকিস্তানে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা থাকলে নৌ বা বিমানবাহিনীর কোনো প্রধান আদালতে গিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতেন- কীভাবে সমমর্যাদার একটি বাহিনীর প্রধান হঠাৎ অন্য একটি বাহিনীর কাঠামোর অধীনস্থ হয়ে গেলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন প্রশ্ন বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট স্বাধীন কোনো আদালত নেই।
