দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ শীর্ষক বিল উত্থাপন করা হয়েছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে বিলটি উত্থাপনের সময় নতুন এই বাহিনীর রূপরেখা, প্রয়োজনীয়তা ও সময়সীমা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে বেশ প্রাণবন্ত বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি যুক্তির হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তি: ‘প্রতিষ্ঠানের দোষ নেই, নিশ্চিত হবে জবাবদিহি’
বিলটি উত্থাপন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার ও জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী র্যাব নামের সংগঠনটি আমরা বিলুপ্ত করছি। তবে সাইবার ক্রাইম, জুয়া ও মাদকের মতো অপরাধ দমনে পুলিশের অধীনে একটি অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত এলিট ফোর্স প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
অতীতের পুলিশের সমালোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। তাই বলে আমরা পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করে দেবো? মাথা ব্যথা হলে মাথা কর্তন করা যায় না। প্রতিষ্ঠান যারা চালায়, সেই রাজনৈতিক অথবা মাফিয়া শক্তির দোষ হতে পারে, প্রতিষ্ঠানের কোনো দোষ নেই।
নতুন বাহিনীর স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, এই বিলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন বাহিনীর কোনো সদস্য শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়ালে তার বিচারের জন্য যে কমিটি করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি সদস্য, মানবাধিকার কর্মী এবং জুডিশিয়াল কর্মকর্তা থাকবেন। ফলে অতীতের র্যাবের মতো বিতর্কিত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নতুন এই বাহিনীর থাকবে না।
বিরোধীদলীয় নেতার শঙ্কা: ‘সাদা দই দেখলেও ভয় লাগে’
র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবকে সর্বান্তকরণে স্বাগত জানান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তবে নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে গভীর পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে তিনি অতীত ট্রমার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একবার চুন খেয়ে গাল ঘা হয়েছে, এখন সাদা দই দেখলেও ভয় লাগে। জাতি আজ ট্রমাটাইজড। র্যাবের দ্বারা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এই জুলুমের কথা স্মরণ হলে এখনও অনেকে ঘুমাতে পারে না।
নতুন বাহিনী যেন কেবল নামসর্বস্ব না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, নতুন করে একই ধরনের পারসেপশন যেন জনগণের কাছে না যায়, যে এটা জাস্ট এপ্রনটা চেঞ্জ করা হয়েছে। জাতির সামনে যেন প্রমাণ হয় যে টোটাল কনসেপ্টটাই চেঞ্জ হয়েছে।
আইনটি গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য স্পিকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিলটি উত্থাপন আজ স্থগিত রেখে আগামী সপ্তাহে আনার অনুরোধ জানান তিনি।
সমঝোতা ও সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত
বিরোধীদলীয় নেতার দাবির প্রেক্ষিতে সংসদে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশাল হৃদয়ের প্রশংসা করে বিলটি নিয়ে আরও পড়াশোনার সময় চান। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার আবেগ ও যুক্তির প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, বিলটি আজ উত্থাপিত হয়ে সংসদের প্রপার্টি হিসেবে থাকুক। এরপর এটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে। কমিটিতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ কার্যদিবস সময় দেয়া হবে। সেখানে বিরোধী দলসহ সবার মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনে বিলটির সংশোধনী আনা হবে।
