ছোট বোট ফুরিয়ে যাওয়ায় মানবপাচারকারীরা এখন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের বৃটেনে পৌঁছে দিতে বড় আকারের ‘মেগা-ডিঙ্গি’ ব্যবহার করছে। বিবিসির এক নতুন অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত মাসে ২৩০ জন অভিবাসীকে গাদাগাদি করে বহনকারী একটি বিশাল ফোলানো বোটে রাতের আঁধারে বৃটেনে পৌঁছানোর ছবি দেখে জনমনে ব্যাপক বিস্ময় তৈরি হয়। ১০ই আগস্টের ওই যাত্রায় একটি ছোট বোটে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ পার হওয়ার রেকর্ড তৈরি হয়। মাত্র ১৭ দিন আগে ১৬৫ জনের যে রেকর্ড হয়েছিল, সেটিও ভেঙে যায়। ২৩০ জনের এই বোটে থাকা মানুষের সংখ্যা একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমানের সাধারণ ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি ছিল। অভূতপূর্ব এই ঘটনা রাজনীতিকরা অবৈধ অভিবাসন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন- এমন অভিযোগের জন্ম দেয়। একই সঙ্গে ফরাসি পুলিশও আবারও হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে।
তবে অনুসন্ধানে এখন এই মেগা-ডিঙ্গির হঠাৎ আবির্ভাবের ভিন্ন একটি কারণ সামনে এসেছে। পাচারকারীদের ছোট বোট ফুরিয়ে যাচ্ছে। এর বড় কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরঞ্জাম সরবরাহের চেইন ব্যাহত করার সাফল্য। বোটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আগে আলাদাভাবে পরিচালিত প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী চক্রগুলো এখন পরস্পরের সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কমসংখ্যক বড় বোটে আরও বেশি অভিবাসীকে গাদাগাদি করে তোলা হচ্ছে। চক্রের সদস্যরা জানিয়েছেন, এ ধরনের আরও বড় বোট ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এতে ইংলিশ চ্যানেলের উভয় পাশে জরুরি উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে মানুষের জীবনহানির ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
৪ঠা আগস্টের একটি ঘটনায় এই বিপদের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই দিন চ্যানেলের মাঝখানে একটি ডিঙ্গিতে আগুন ধরে গেলে ১৭০ জনকে উদ্ধার করতে হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষের দাবি, ছোট বোটগুলো উপকূলে পৌঁছানোর আগেই তারা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আটকে দিচ্ছে। ফলে পারাপারের সুযোগ কমে যাচ্ছে। আর বোটে জায়গা পাওয়ার আশায় থাকা অভিবাসীদের এর অর্থ হলো, তাদের আরও বেশি অর্থ দিতে হবে। বর্তমানে মানবপাচারকারীরা অবৈধভাবে বৃটেনে পৌঁছে দেয়ার জন্য মাথাপিছু প্রায় ২ হাজার পাউন্ড নিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। এই যাত্রায় আনুমানিক ১০ হাজার পাউন্ড খরচ হলে, ১০ই আগস্টের ওই মেগা-ডিঙ্গি পারাপার থেকে পাচারকারীদের প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড লাভ হতে পারে।
নতুন এই মেগা-ডিঙ্গিগুলোকে ‘ভাসমান মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট, যা একটি দোতলা বাসের চেয়েও বেশি। সীমান্ত ও অভিবাসনবিষয়ক সাবেক প্রধান পরিদর্শক ডেভিড নিল বলেন, সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেয়া যেকোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ। পুলিশ যদি পাচারকারীদের ডিঙ্গি ও সামুদ্রিক সরঞ্জাম সংগ্রহের যে কোনো একটি পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে চক্রগুলো সঙ্গে সঙ্গে অন্য নির্মাতা, আমদানি পথ ইত্যাদি খুঁজতে শুরু করবে। সংগঠিত অপরাধীদের মোকাবিলা করা সবসময়ই বিড়াল-ইঁদুরের খেলা।
