কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় লাশ পচে যাওয়ার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরে দড়িতে ঝোলানো অসংখ্য ছবি। নেপালে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির এক মর্মস্পর্শী চিত্র এটা। তার ওপর নির্মাণাধীন একটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভিতর প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কোনো হদিস নেই। মরিয়া হয়ে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে ৯দিন টানেলের ভিতরে অক্সিজেন ও খাদ্য, পানির সংকটে তাদের বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন সবাই। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কত হাজার তার সঠিক হিসাব নেই। কোনো কোনো মাধ্যমে বলা হচ্ছে, এ সংখ্যা ৪/৫ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
২৬শে আগস্টের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের এক সপ্তাহ পরও চিকিৎসকদের জন্য লাশগুলোর আঙুলের ছাপ বা পরিচয় শনাক্ত করার অন্যান্য চিহ্ন পরীক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের বাইরে স্বজনরা অপেক্ষা করছেন এই আশায় যে অন্তত তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহটি যেন পাওয়া যায়। কিন্তু লাশগুলো এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, তা শনাক্ত করা অসম্ভব ব্যাপার। এ পর্যন্ত জানা তথ্য হলো, ৪ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। আর রাজধানীর এই প্রধান হাসপাতালে ২রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ১৬১টি মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কাঠমান্ডুর উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে মৃতদেহ দাফন করা হচ্ছে। অথচ প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত নেপালে সাধারণত মৃতদেহ সৎকারের প্রচলিত রীতি হলো দাহ করা। তবে এসব দাফন সাময়িকভাবে করা হচ্ছে, যাতে মৃতদেহ শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সংক্রমণ বা রোগ ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
মৃতদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোন মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, তা চিহ্নিত করতে সেখানে সাইনবোর্ড ও আলাদা নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনে পরে মৃতদেহ উত্তোলন করা যায়। উদাহরণ হিসেবে চিতওয়ানে মৃতদেহ দাফনের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৫ মিটার গভীর গর্ত খোঁড়া হচ্ছে, যাতে পরে সহজেই মৃতদেহ উত্তোলন করা যায়। পাশাপাশি প্রতিটি মৃতদেহের মধ্যে ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রাখা হচ্ছে। ফলে ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া নির্দিষ্ট মৃতদেহটিই পরে উত্তোলন করা সম্ভব হবে।
কিছু পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের জন্য প্রতীকী শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মতো যন্ত্রণাদায়ক সিদ্ধান্তও নিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটে পরিবারগুলো প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করছে। ত্রিশূলি নদীর তীরে পুরোহিতরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রতীক হিসেবে খড় দিয়ে তৈরি অবয়ব স্থাপন করছেন এবং হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে দাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করছেন। এর মাধ্যমে মৃতদেহ উদ্ধার করতে না পারলেও পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পাচ্ছে।
মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে নেপাল ইতিমধ্যেই ‘জলবায়ু ন্যায়বিচারের’ কথা বলছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখা কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান অত্যন্ত সামান্য। অথচ হিমবাহ গলে যাওয়া এবং এর ফলে বন্যা সৃষ্টির পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুলনায় চীনের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ, ভারতের ৮ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। তার দাবি, দুর্যোগ পরবর্তী সহায়তাকে ‘নৈতিক দায়বদ্ধতার’ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বার্তা সংস্থা পিটিআই’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে খানাল বলেন, আমরা এমন একটি বৈশ্বিক সংকটের চরম মূল্য দিচ্ছি, যা আমরা সৃষ্টি করিনি। হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং এসব ভয়াবহ পার্বত্য সুনামি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি পরিণতি। খানাল বলেন, নেপাল তার কূটনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করছে। তিনি বলেন, এটি শুধু ত্রাণ বা পুনর্বাসন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের বৃহৎ ও ধনী দেশগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, অথচ আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত সামান্য। তারপরও আমরা এর চরম মূল্য দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা এটিকে ন্যায়বিচারের বিষয় হিসেবে তুলে ধরব।
তিনি বলেন, নেপাল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করবে। তার ভাষায়, এটি সহায়তা চাওয়ার বিষয় নয়; এটি বৃহৎ দেশগুলোর দায়বদ্ধতার বিষয়। মন্ত্রী জানান, নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবি করে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের হিমালয়ের হিমবাহগুলো যদি বিলীন হয়ে যায়, তাহলে গঙ্গা ও ত্রিশূলির মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটির বেশি মানুষের পানির নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে হুমকির মুখে পড়বে। আমরা শুধু নেপালের জন্য নয়, দক্ষিণ এশীয় সভ্যতার টিকে থাকার জন্যও এই দাবি জানাচ্ছি।
