মক্কা জোটে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে চিন্তিত নয় ইরান: রাষ্ট্রদূত

ফন্ট সাইজ:

মক্কা চুক্তিকে ইরানবিরোধী কোনো জোট হিসেবে দেখছে না তেহরান। বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবেই এই জোটকে দেখছে দেশটি। এ ছাড়া ঢাকা এই জোটে যুক্ত হলে ইরানের কোনো উদ্বেগ নেই বলেও জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি। গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
রাহিমি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো বিরোধ নেই। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের খুব ভালো বন্ধু এবং সৌদি আরবের সঙ্গেও তেহরানের সুসম্পর্ক রয়েছে। ফলে মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের কোনো উদ্বেগ নেই। রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরান কেবল আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। কোনো আরব দেশের ভূখণ্ডে ইরান হামলা করেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। তাই বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ইরান চিন্তিত নয়। তার মতে, মক্কা চুক্তি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি নয়। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি লক্ষণ। মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থে গঠিত হচ্ছে— বিশেষজ্ঞদের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত তা নাকচ করেন।

তিনি বলেন, এমন একটি সময়ে মক্কা চুক্তি হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে ওয়াশিংটন নিজেই উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, এতদিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বলেছে, তাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য জমি দিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে। বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাষ্ট্রদূতের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানেও রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন, ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে নেয়া, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং বিশ্বে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মতো লক্ষ্য ছিল। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। তিনি বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। রাষ্ট্রদূতের ভাষায়, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়ের একটি ‘সম্পূরক অংশ’। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে যে, বিপুল মার্কিন অস্ত্র তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই এই চুক্তি নিয়ে ইরান উদ্বিগ্ন নয়।

চুক্তিতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব পেলে গ্রহণ করবে ইরান: মক্কা চুক্তিতে ইরান যোগ দেয়ার কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে জালিল রাহিমি বলেন, ইরান নিজ থেকে এমন কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তবে চুক্তির সদস্য দেশগুলো ইরানকে যোগ দেয়ার আহ্বান জানালে তেহরান তা গ্রহণ করবে। তিনি আরও বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে ইরান মক্কা চুক্তির মতো একটি উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল ‘পরমাণু অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য’ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে। কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাব সমর্থন করেনি। ইরানের দ্বিতীয় প্রস্তাব ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটি ‘যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ করা। তবে সে সময় আরব দেশগুলো এই প্রস্তাব সমর্থন করেনি। কারণ তারা মনে করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাই তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট।

হরমুজ দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে অসুবিধা হবে না: হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে কোনো রকমের অসুবিধা হবে না বলে জানান ইরানের রাষ্ট্রদূত। ইরানে মার্কিন হামলার ফলেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। রাহিমি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন হরমুজ প্রণালি খুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।

ইরানে মার্কিন হামলায় বাংলাদেশের সমর্থন নেই: ইরানে মার্কিন হামলা সমর্থন করে না বাংলাদেশ। গতকাল সাংবাদিকদের এমনটাই জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইরানে কোনো ধরনের হামলা সমর্থন করে না। হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হামলা, আগ্রাসন বা সামরিক পদক্ষেপে বাংলাদেশের কোনো সমর্থন, সম্পৃক্ততা কিংবা আহ্বান নেই। বাংলাদেশ শুধু হুতিদের সৃষ্ট নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৌদি আরবের সঙ্গে সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়েছে।

ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে খুবই ভালো এবং সৌজন্যমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং দ্বন্দ্ব নিয়ে বেশ কিছু বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। আমরা আবারো উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছি। এটি শুরু থেকেই আমাদের একটি ধারাবাহিক ও স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান—যাতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত প্রশমিত হয়। তিনি আরও বলেন, এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হামলা, আগ্রাসন বা সামরিক পদক্ষেপে বাংলাদেশের কোনো সমর্থন, সম্পৃক্ততা কিংবা আহ্বান নেই। হুতিদের সৃষ্ট নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই মূলত সৌদি আরবকে আমরা সহায়তামূলক উদ্যোগ দিয়ে যাচ্ছি এবং তারা যেন সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারে, আমরা শুধু সেই চেষ্টাই করছি।

হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বহু প্রবাসী ভাই-বোন অবস্থান করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আনুমানিক প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন। তাদের সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা আমাদের জন্য অত্যন্ত অগ্রাধিকারমূলক একটি বিষয়। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সব পক্ষকেই জোর আহ্বান জানিয়েছি—তারা যেন আলোচনায় বসে এবং অত্যন্ত শান্ত ও কূটনৈতিক উপায়ে এই সংঘাত সমাধান করে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।