‘বন্দিদের গুলি করে পেট চিড়ে বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলা হতো’

ফন্ট সাইজ:

র‌্যাবের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের গুলি করে হত্যার পর পেট চিড়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেয়া হতো বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক। তার দাবি- এসব কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিলেন র‌্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। বুধবার জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দশম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন আব্বাস মল্লিক। ২০১০ ও ২০১১ সালে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় র‌্যাবের অভিযানের সময় আটক ব্যক্তি, হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তিনি।
আব্বাস মল্লিক জানান, র‌্যাবের অভিযানের দিন বিকালে সাদা পোশাকে দুই সদস্য এলাকায় গিয়ে স্থানীয় দোকানদারদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ এবং বাতি নিভিয়ে রাখতে বলতেন। রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‌্যাবের চার থেকে পাঁচটি মাইক্রোবাস একটি বরফ মিলের সামনে এসে থামতো। পরে ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় আটক ব্যক্তিদের সেখানে এনে ট্রলারে তোলা হতো।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দিদের নিয়ে যাওয়ার সময় র‌্যাব সদস্যরা রশি ও সিমেন্টের বস্তা সঙ্গে নিতেন। ট্রলারটি বলেশ্বর নদীর গভীর পানির দিকে যাওয়ার পর গতি কমিয়ে দেয়া হতো। এরপর চোখ ও হাত বাঁধা ব্যক্তিদের ট্রলারের ভেতর থেকে বের করে আনা হতো। সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক বলেন, ট্রলারের দুই পাশে থাকা সাপোর্টের অংশে দুই র‌্যাব সদস্য বন্দিদের চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান নিজে এসে বন্দিদের মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন বলে তিনি দেখেছেন।

তিনি আরও বলেন, গুলি করে হত্যার পর মৃতদেহের গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হতো। লাশ যাতে পানিতে ভেসে না ওঠে, সেজন্য নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে দেয়া হতো বলেও দাবি করেন তিনি। আব্বাস মল্লিকের দাবি, এরপর অন্য বন্দিদের নিয়ে সুন্দরবনের দিকে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের নামিয়ে ‘বন্দুক যুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যার পর সাংবাদিকদের ডেকে থানায় লাশ হস্তান্তর করা হতো। হত্যাকাণ্ড শেষে বরফ মিলে ফিরে এলে মাঝিদের খামে করে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেয়া হতো বলেও সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তিনি।

সাক্ষ্যে নিজের ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন আব্বাস মল্লিক। তিনি জানান, আলকাছের দু’টি ট্রলার ছিল এবং তিনি র‌্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। তবে র‌্যাবের কথিত কর্মকাণ্ডের বিষয়টি আলকাছ স্থানীয় বাজারে আলোচনা করায় অন্য বোটের মালিকরা তাকে সতর্ক করেছিলেন। তাদের ভাষ্য ছিল- র‌্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ। আব্বাস মল্লিক বলেন, ২০১১ সালের মাঝামাঝি একদিন দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হন আলকাছ। এর আগে র‌্যাব থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, ‘জিয়া স্যার’ তাকে বটতলা-মানিকখালীতে ডেকেছেন। ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকেই আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে ট্রাইব্যুনালে জানান আব্বাস। ভাইকে খুঁজতে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র‌্যাব কার্যালয়ে ঘুরেছেন বলেও জানান তিনি। তার দাবি- পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও পুলিশ সেখানে জিয়াউল আহসান ও র‌্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়নি। সাক্ষ্যের শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে সরাসরি শনাক্ত করেন আব্বাস মল্লিক। একইসঙ্গে নিখোঁজ ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের ঘটনায় বিচার দাবি করেন তিনি।

নিরাপত্তার স্বার্থে জিয়াউল আহসানকে হ্যান্ডকাফ: এদিকে, ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানকে হ্যান্ডকাফ পরানোর বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তার কাছে তথ্য এসেছে যে আসামি যেকোনো ধরনের ‘সাবোটাজের’ ঘটনা ঘটাতে পারেন। এ কারণে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি রেজিস্ট্রার জেনারেলকে অবহিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে, প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম সাংবাদিকদের বলেন, লকআপে থাকা অবস্থায় জিয়াউল আহসান নিয়ম-শৃঙ্খলা মানছেন না- এমন অভিযোগও তাদের কাছে এসেছে। তিনি সেখানে কেক কাটেন এবং টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার এনে অন্যদের সঙ্গে বসে খান- এমন তথ্যও তারা পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে আসামিদের গারদে কেক কেটে জন্মদিন পালনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে কেক কাটার অনুমতি দেয়া হয়নি। তবে অন্য খাবারের মতো কেক খাবার হিসেবে ভেতরে দেয়ার অনুমতি রয়েছে। বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন। আইনবহির্ভূত কোনো ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। প্রসিকিউটর তামিম আরও বলেন, কয়েকজন আসামি আদালতে আনা-নেয়ার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন সময় হুমকি দিচ্ছেন- এমন তথ্যও তারা পেয়েছেন। এ কারণে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জিয়াউল আহসানের মামলায় আরও তিন থেকে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর পর্বটি শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম। তিনি বলেন, জিয়াউল আহসানের মামলাটি গুমের ঘটনায় দায়ের হওয়া প্রথম মামলা; যা বিচারের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রসিকিউটর বলেন, বর্তমানে যারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট ঘটনার ভুক্তভোগী, ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়েছেন।
গুমের আরও কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে: ইলিয়াস আলীর গুমের মামলার বিষয়ে প্রসিকিউটর জানান, তদন্ত এখনো চলছে। ঘটনাটি অনেক পুরনো হওয়ায় তদন্ত শেষ করতে কিছুটা সময় লাগছে। তিনি জানান, টিএফআই ও জেআইসি বন্দিশালায় গুমের ঘটনা এবং কল্যাণপুর ও গাজীপুরের বাজার থেকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের বিচার চলছে। এর পাশাপাশি জিয়াউল আহসানের মামলাটিও বিচারাধীন। গুমের ঘটনায় আরও কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রসিকিউটর বলেন, সিটিটিসি’র মাধ্যমে আলামিন নামে একজনকে হত্যার অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন তারা পেয়েছেন। র‌্যাব কর্মকর্তা মহিউদ্দিন ফারুকীর বিরুদ্ধে থাকা কয়েকটি গুমের অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদনও তাদের হাতে এসেছে। এ ছাড়া, আলেপ উদ্দীনের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই ওই তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।