সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো না থাকায় বিচার বিভাগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নতুন ধরনের আইনি ও বিচারিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এআই ব্যবহার করে ভুয়া জবানবন্দি ও প্রমাণ তৈরি, বিচারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং রায় নিয়ে অপপ্রচার চালানোর মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিচারকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রাঙ্গণে ‘বাংলাদেশ এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিথ্যা জবানবন্দি তৈরি কিংবা ছবি ও অন্যান্য ডিজিটাল উপকরণের মাধ্যমে ভুয়া প্রমাণ বানিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত বিচারপ্রার্থীরা। একইসঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও নতুন ধরনের সামাজিক ও আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, কোনো রায় কারও পছন্দ না হলে এআই ব্যবহার করে বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর আশঙ্কাও রয়েছে। তাই সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিচারকদেরই সর্বপ্রথম এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
আইনগত সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ অতীতেও আইনের ব্যাখ্যায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনেছে। স্ত্রী হত্যা মামলায় আসামির ওপর প্রমাণের দায় আরোপের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত এবং নব্বইয়ের দশকে অস্ত্র আইনের মামলায় জব্দ তালিকার সাক্ষীদের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর নজিরও তিনি তুলে ধরেন।
এআইয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিক আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগকে একইভাবে প্রজ্ঞা, সতর্কতা ও অভিযোজন ক্ষমতার পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইন বিশেষজ্ঞদের এআই নিয়ন্ত্রণে একটি খসড়া আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের একটি খসড়া বিল সংসদে উপস্থাপন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি সহযোগিতা করবেন।
পাঁচ দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল’-এর যৌথ আয়োজন করে সোসাইটি ফর জাস্টিস অ্যান্ড এআই (এসজেএআই) ও লিগ্যালাইজড এডুকেশন বাংলাদেশ লিমিটেড (এলইবিএল)। অংশীদার হিসেবে এতে সার্বিক সহযোগিতা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আয়োজনে সহায়তা করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাসনুভা শেলী। সমাপনী সেশনে প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, আইনজীবী, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সামার স্কুলে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার, অর্থসেবা, স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই গভর্নেন্সের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে এআই গভর্নেন্স সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করা হয়।
