দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামো এখন রাষ্ট্রীয় সাইবার সুরক্ষার আওতায়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (চবক) ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ বা ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। সোমবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ১৫ ধারার আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরকে সিআইআই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এ প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দেশে এর আগে ৩৬টি সংস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন করে চট্টগ্রাম বন্দর এ তালিকায় যুক্ত হওয়ায় বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থা ও তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সূত্র মতে সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি এ সুরক্ষার আওতায় থাকবে ডেটা সেন্টার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডেটাবেজ, অ্যাপ্লিকেশন পর্যায়ের যোগাযোগ এবং এপিআই হাবসহ বন্দরের সামগ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো।
চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার ব্যবস্থাপনা, জাহাজ চলাচল, শুল্ক ও রাজস্ব কার্যক্রম এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একাধিক ডিজিটাল সিস্টেম সরাসরি যুক্ত। এসব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সাইবার হামলা বা প্রযুক্তিগত বিঘ্ন ঘটলে দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সিআইআই হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করায় প্রতিষ্ঠানটি এ স্বীকৃতি অর্জন করে।
সিআইআই ঘোষণার ফলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও এর আওতায় গুরুত্ব পাবে। নতুন এ ব্যবস্থার অধীনে বন্দরের অগ্রাধিকারভুক্ত ডিজিটাল সিস্টেমে উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে। এর মধ্যে নিজস্ব সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার ও সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম পরিচালনা, ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও প্রতিবেদন দাখিল, সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত তথ্য প্রদান এবং সাইবার ঘটনার রিপোর্টিংয়ের মতো কার্যক্রম থাকবে। এ ছাড়া নিয়মিত ঝুঁকি নিরূপণ, দুর্বলতা মূল্যায়ন, অনুপ্রবেশ পরীক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের এনক্রিপটেড ও অফলাইন ব্যাকআপ, ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা চালু ও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও নিরীক্ষায়ও সহযোগিতা করতে হবে।
সিআইআইয়ের নিরাপত্তা বিধান লঙ্ঘন কিংবা অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় প্রবেশ করলে তা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির নির্দেশনা অনুসারে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে পৃথক সাইবার নিরাপত্তা টিম গঠন, তথ্য অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, নিরাপত্তা নীতিমালা হালনাগাদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্বের স্বীকৃতি। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরের নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল কার্যক্রম নিশ্চিত করা জাতীয় দায়িত্ব।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবা সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সাইবার হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে।
