অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে ডিএজি এএজি নিয়োগ ঘিরে বির্তক যেন থামছে না। গেল মাসে একযোগে ২৬৫ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগে অনেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলছেন। সেইসঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সমর্থক বলেও অভিযোগ করছেন নিয়োগবঞ্চিত আইনজীবীরা। এদিকে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর থেকেই সুপ্রিম কোর্টে হট্টগোল শুরু হয়। যা দেড় মাস ধরেই চলমান রয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপি’র দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেও নিয়োগ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সুপ্রিম কোর্টের শতাধিক আইনজীবী। প্রতিবাদ জানিয়ে তারা নিয়মিত মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও অনশন করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এদিকে মঙ্গলবার পাল্টা কর্মসূচি দেয় নিয়োগ পাওয়া ডিএজি, এএজিরা। এতে দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষই মারমুখী অবস্থানে চলে যায়।
সরজমিন দেখা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট অ্যানেক্স ভবন ও সোনালী ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের একাংশের নেতাকর্মীরা। প্রতিবাদে পাল্টা বিক্ষোভ করার চেষ্টা করেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তাদের একটি অংশ। পরে দুই গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, স্লোগান ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় আন্দোলনকারী আইনজীবীরা বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের পদত্যাগ দাবি করেন। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে সন্ধ্যার দিকে ফের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী আইনজীবী এবিএম ইব্রাহিম খলিল, নূরে আলম সিদ্দিকী, রায়হানসহ কয়েকজন আইনজীবী আহত হন।
এর আগে বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সামনে সমবেত হন কার্যালয়ে কর্মরত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা (এএজি)। সেখানে তারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বক্তারা সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আইন কর্মকর্তারা বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় নিয়ে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়া হবে না। যারা কার্যালয়কে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন কর্মকর্তারা ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নেবেন। কর্মসূচিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে কর্মরত কয়েকশ’ ডিএজি ও এএজি অংশ নেন। অন্যদিকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলন চালিয়ে আসা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের একাংশও সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থান নেয়। দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি স্লোগান। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী আইনজীবী এবিএম ইব্রাহিম খলিল অভিযোগ করেন, অ্যাটর্নি জেনারেল দায়িত্ব নেয়ার পর আওয়ামী লীগের দোসর ও জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। এর প্রতিবাদে তারা ২৬ দিন ধরে আন্দোলন করছেন। তিনি বলেন, আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের নির্দেশে আইন কর্মকর্তারা অতর্কিত হামলা চালিয়েছেন এবং বালু নিক্ষেপ করেছেন।
ইব্রাহিম খলিল আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল দলকে ধ্বংস করছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচারের তথ্যও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। আইনজীবী জুলফিকার আলম শিমুল বলেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের উস্কানিতে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করছি। পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতারা। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম সজল মানবজমিনকে বলেন, আইনজীবীদের মধ্যে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। দু’টি মিছিল মুখোমুখি হলে কিছুটা ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। বিষয়টি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমরা বিকাল ৪টায় বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবো।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা নিজেরা বসেই সমাধান করে ফেলবো। পরে সন্ধ্যার দিকে দুই পক্ষ আবার মুখোমুখি হলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে কয়েকজন আইনজীবী আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ: এর আগে গত ৩০শে জুলাই আগের সব নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়। এর পরদিন ২রা আগস্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়।
আন্দোলনকারী আইনজীবীদের অভিযোগ, বিএনপি’র আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এবং অতীতে মামলা, হামলা ও কারাবরণের শিকার অনেক যোগ্য আইনজীবীকে নতুন নিয়োগে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন ও বিশেষ সুবিধার ভিত্তিতে ডিএজি ও এএজি নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, রাজনৈতিক ত্যাগ, পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এসব বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নিয়োগ নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
