রাজধানীর প্রধান সড়ক ও মহাসড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের আল্টিমেটাম এবং নাগরিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পাল্টাপাল্টি অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে নাগরিক সমাজ ও অটোরিকশা চালকরা। গতকাল সকাল থেকে প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে চালকেরা। এতে স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা।
সম্প্রতি গুলশান, বনানী, বারিধারা এবং নিকেতন এলাকার বাসিন্দারা একজোট হয়ে অবস্থান কর্মসূচি ও গণজাগরণ সমাবেশ গড়ে তুলেন। সমাবেশ থেকে তারা মূলত ৫টি প্রধান দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- শুধুমাত্র বৈধ লাইসেন্সধারী অটোরিকশাকে চলাচলের অনুমতি দেয়া, প্রধান ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিয়মিত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া, সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নিরাপদ বিকল্প গণপরিবহন নিশ্চিত করা এবং অটোরিকশা চালকদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা।
নাগরিকদের ধারাবাহিক অভিযোগ ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সরকারি নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সরকারি নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার মূল সড়কগুলোতে অটোরিকশা বন্ধ করে ভেতরের অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোতে চলাচলের জন্য পুরো ঢাকাকে ৮টি জোনে ভাগ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, বুয়েট বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান দ্বারা সার্টিফাইড ডিজাইনের এবং সর্বোচ্চ ৪ জন যাত্রী বহনকারী ই-রিকশাকেই কেবল নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। ৬ জন যাত্রী ধারণক্ষমতার কোনো ই-রিকশা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নিবন্ধন পাবে না। এই নীতিমালার আলোকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ অটোরিকশা উচ্ছেদ ও অবৈধ চার্জিং সেন্টার বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে প্রশাসন। এদিকে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে পাল্টা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয় অটোরিকশা ও ভ্যানচালক শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে হঠাৎ রিকশা বন্ধ করা হলে লাখ লাখ শ্রমিক পরিবার না খেয়ে মরবে। চালক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জোরপূর্বক রিকশা বন্ধ করা হলে তারা কঠোর কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামবেন এবং ঢাকাকে অচল করে দেবেন।
শাহবাগে পাল্টাপাল্টি অবস্থান: গতকাল সকালে শাহবাগে অবস্থান নেয় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানচালকেরা। তাদের বিপরীতে অটোরিকশামুক্ত ঢাকা গড়ার দাবি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেন নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী সোহানি সিফা ও তার সমর্থকেরা। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে শাহবাগ মোড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কাঁটাবন, এলিফ্যান্ট রোড এবং নীলক্ষেত সংলগ্ন সড়কগুলোতে সকাল থেকে যানবাহন চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে। শাহবাগের উত্তর সিগন্যাল ইন্টারসেকশনে তৈরি হওয়া এই জটলার কারণে ফার্মগেট ও কাওরান বাজার থেকে আসা সাধারণ যাত্রী এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘক্ষণ জ্যামে আটকে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শাহবাগ মোড় ও সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
মুখোমুখি দুই পক্ষ: অটোরিকশা উচ্ছেদ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন আলোচিত নাগরিক আন্দোলনকর্মী সোহানি সিফা। তবে একইসময়ে ‘জাতীয় রিকশা ও ভ্যানচালক শক্তি’র ব্যানারে শত শত অটোরিকশা ও ভ্যানচালক সেখানে পাল্টা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সোহানি সিফা তার সমর্থকদের নিয়ে শাহবাগে পৌঁছালে কয়েকশ’ অটোরিকশা চালক ও মালিক তাকে প্রতিহত করতে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। উত্তেজনার মধ্যে সোহানি সিফার সমর্থনে তার পাশে এসে দাঁড়ানোয় এক উবার চালককে রিকশাচালকেরা মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে উপস্থিত লোকজনের একাংশের দাবি, রিকশাচালকদের আন্দোলনের মধ্যে মোবাইল ছিনতাইয়ের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ধরে সেখানে গণপিটুনি দেয়া হয়।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে দেশের প্রায় ৬০ লাখ রিকশাচালকের রুটি-রুজি বন্ধের এই সরকারি নীতিমালা একটি ‘ষড়যন্ত্র’। চালকদের দাবি মেনে না নিলে এবং জোরপূর্বক অটোরিকশা উচ্ছেদ করা হলে তারা গণ-আত্মহত্যার মতো চরম কর্মসূচি নেয়ার পাশাপাশি পুরো ঢাকাকে অচল করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এর অংশ হিসেবে তারা রিকশায় লাঠির মাথায় পতাকা বেঁধে চলাচলের মাধ্যমে তাদের প্রতীকী প্রতিবাদ শুরু করেছেন।
বাড্ডায় অটোরিকশা চালকদের বিক্ষোভ: সকালে রাজধানীর বাড্ডায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন অটোরিকশা চালকরা। প্রগতি সরণির মূল সড়ক আটকে এ কর্মসূচি পালন করেন। এতে বাড্ডা, রামপুরা, কুড়িল বিশ্বরোড এবং নতুন বাজার সংলগ্ন এলাকাগুলোয় সকাল থেকেই সব ধরনের যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হন অফিসগামী সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। পরে বেলা ১১টার দিকে চালকরা সরে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আন্দোলনরত চালকদের দাবি, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবং অটোরিকশা উচ্ছেদ বন্ধ না করা হলে তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
