দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট যখন চরমে, তখন স্বস্তির বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আগস্টে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হওয়ার কথা ছিল। পরে সময় পিছিয়ে ধরা হয় সেপ্টেম্বর। কিন্তু সেই আশাও এখন অনিশ্চয়তার ঘন মেঘে ঢাকা। কারণ, কেন্দ্রটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘সেফটি ভালভ’ টানা দেড় মাস ধরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে না। বারবার পরীক্ষার পরও নির্ধারিত মানে না পৌঁছানোয় মূল কার্যক্রম এগোচ্ছে না। নতুন ভালভ আনতে হলে বিদেশ থেকে বিশেষভাবে তৈরি করে আনতে হতে পারে। আর তাতে সময় লাগতে পারে ৬ থেকে ৮ মাস। শুধু একটি যন্ত্রের জটিলতাই নয়, কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই মেগা প্রকল্প কবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বারবার সময় বাড়ানো, জ্বালানি লোডের পরও উৎপাদন শুরু না হওয়া এবং একের পর এক প্রযুক্তিগত জটিলতার দায় কার?
দেশ যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের চাপ সামলাচ্ছে, শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট চলছে এবং ব্যয়বহুল এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, তখন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর কেন্দ্রটি উৎপাদনে না আসা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যে ভালভে আটকে গেছে রূপপুর: সূত্র জানায়, রূপপুরে বর্তমানে মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে সেফটি ভালভ নিয়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই যন্ত্রটি রিঅ্যাক্টর ও কুলিং সিস্টেমের অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে ভালভটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে অতিরিক্ত চাপ নিরাপদে বের করে দেয়। ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা পাইপ ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। অর্থাৎ পারমাণবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যন্ত্রটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বারবার পরীক্ষা চালিয়েও ভালভটি নির্ধারিত গুণগত মানের পরীক্ষায় সফল হয়নি। বর্তমানে বিকল্প উপায়ে আরও পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি নতুন একটি ভালভ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই উচ্চপ্রযুক্তির সেফটি ভালভ ইউক্রেন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি হয়। শুরুতে রাশিয়া ইউক্রেনকে যন্ত্রটি সরবরাহের কার্যাদেশ দিলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। পরে তুরস্ক থেকে যন্ত্রটি সংগ্রহ করা হয়।
এখন নতুন করে আরেকটি ভালভ আনার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু এমন বিশেষায়িত যন্ত্র তৈরি ও সরবরাহ করতে সাধারণত ৬ থেকে ৮ মাস সময় লাগে। অর্থাৎ বর্তমান ভালভটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর না হলে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও দীর্ঘ সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
ভালভ ঠিক হলেও অপেক্ষা আড়াই মাস: বর্তমান সেফটি ভালভটি পরীক্ষায় সফল হলেও সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যাবে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পরও গ্রিড সংযোগের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগবে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার যে আশা করা হয়েছিল, তা এখন প্রায় ফিকে হয়ে গেছে। পরমাণু শক্তি কমিশনের দুই কর্মকর্তা জানান, বর্তমান কাজের অগ্রগতি বিবেচনায় চলতি বছরের মধ্যে প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার সম্ভাবনা এখন খুবই ক্ষীণ।
সাতবার সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি অপেক্ষা: রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দু’টি ইউনিট রয়েছে। মূল সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে এ পর্যন্ত অন্তত সাতবার প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়েছে। মেগা এই প্রকল্পটির চুক্তিভিত্তিক ব্যয় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। মেয়াদ চার বছর বাড়লেও চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার কনট্রাক্টরকে অতিরিক্ত অর্থ দেয়ার নিয়ম নেই। তবে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশীয় মুদ্রায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। উৎপাদনে বিলম্বের কারণে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতির স্বাভাবিক আয়ুষ্কালের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
