লিজ ডিড বা ইজারা দলিল সম্পাদনের আগে শুধু বরাদ্দপত্রের ভিত্তিতে পাওয়া প্লট, ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে হস্তান্তর না করার নতুন নির্দেশনায় জটিলতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই নির্দেশনা জারি করেছে। বলা হচ্ছে, মালিকানা বিরোধ ও আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্যই মূলত এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে এ নির্দেশনা নিয়ে আইনজ্ঞরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এ নির্দেশনা আইনগত ভিত্তি ও বিদ্যমান পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ নির্দেশনার ফলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে হস্তান্তর হওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে ঝামেলা হতে পারে।
গত ২৩শে জুলাই, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-২ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, লিজ ডিড বা ইজারা দলিল সম্পাদনের পূর্বে প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি বরাদ্দপত্রের ভিত্তিতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা গ্রহণের ফলে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এই জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে লিজ ডিড বা ইজারা দলিল সম্পাদনের পূর্বে প্লট, ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্রের ভিত্তিতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামার মাধ্যমে যেন প্লট/ফ্ল্যাট/বাড়ি হস্তান্তর না করতে পারে, সে লক্ষ্যে নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, লিজ ডিড/ইজারা দলিল সম্পাদনের পূর্বে শুধুমাত্র বরাদ্দপত্রের ভিত্তিতে আমমোক্তারনামা দলিল গ্রহণ না করা এবং উক্ত আমমোক্তারনামা দলিলের প্রেক্ষিতে প্লট/ফ্ল্যাট/বাড়ি হস্তান্তর কার্যক্রম গ্রহণ না করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হলো। সূত্র জানায়, নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার ফলে এরই মধ্যে যেসব প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ির ওপর বরাদ্দপত্র (অ্যালোটমেন্ট) দেয়া হয়েছে কিন্তু এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লিজ ডিড বা ইজারা দলিল পুরোপুরি সম্পাদিত হয়নি। এতদিন এ ধরনের সম্পত্তির ক্ষেত্রে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে কার্য সম্পাদিত করা যেতো। কিন্তু নতুন এ নির্দেশনার কারণে কাজ করা যাচ্ছে না বলে বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নতুন নির্দেশনার ফলে তারা কাজ করতে পারছেন না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ফারুক হোসেন বলেন, আগে অ্যালোটমেন্ট পাওয়া ব্যক্তি অন্য যেকোনো ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেয়া কিংবা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া অনুসরণের নজির ছিল। কিন্তু নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই আমমোক্তারনামা গ্রহণ এবং তার ভিত্তিতে হস্তান্তরের কার্যক্রমও পরিচালনা করতে বাধা তৈরি করতে পারে। কেউ কেউ গণপূর্তের এ সিদ্ধান্ত জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন।
তাদের মতে, নির্দেশনাটি ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এর আইনগত অবস্থান নিয়ে। দেশে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির বিষয়ে পৃথক আইন কার্যকর থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে আমমোক্তারনামার ব্যবহার এভাবে সীমিত করা যায় কিনা, সেটি আইনি পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু মানবজমিনকে বলেন, এ নির্দেশনার ফলে অ্যালোটমেন্ট পাওয়া সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা করার সুযোগ কমে যাবে। এর ফলে অহেতুক মোকদ্দমাও সৃষ্টি হবে না। তিনি বলেন, আইনানুযায়ী সরকারি কোনো নির্দেশনা জারির পর থেকে প্রয়োগ হবে। পূর্বের কোনো সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রয়োগ করা যাবে না।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইনে কী আছে: বাংলাদেশে আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি পরিচালিত হয় পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায়। এই আইনে নির্দিষ্ট শর্তে একজন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে তার পক্ষে কাজ করার ক্ষমতা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১২ সালের আইনে স্বীকৃত সেই ক্ষমতার পরিধি প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে কতোটা সীমিত করা যায়।
