কৈলাস পর্বত দেখার বহু বছরের স্বপ্ন ছিল অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলের ৩৭ বছর বয়সী মাইকেল কিটসের। সেই স্বপ্ন পূরণে তিব্বতের কৈলাসে তীর্থযাত্রায় গিয়ে আর ফিরতে পারেননি তিনি। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এই অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। পরিবারের পক্ষ থেকে মাইকেলকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।
মাইকেলের সঙ্গী এমিলি বয়েড জানিয়েছেন, তার মৃত্যু তাদের পরিবারের সবকিছু বদলে দিয়েছে। গতকাল সোমবার একটি তহবিল সংগ্রহের পাতায় দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, মাইকেল ছিলেন তার সঙ্গী এবং পরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন। তার ছোট ছেলের সৎবাবা ছিলেন মাইকেল। তবে ছেলেটি তাকে নিজের জীবনে একমাত্র বাবা হিসেবে চিনত।
এমিলি বয়েড বলেন, প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক সামলানোর পাশাপাশি এখন তাদের এমন একজনকে ছাড়া নতুন করে জীবন শুরু করতে হচ্ছে, যিনি ছিলেন পরিবার ও সংসারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাইকেলের মৃত্যু তার ও তার ছেলের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে।
কৈলাস ছিল মাইকেলের বহু বছরের স্বপ্ন। আধ্যাত্মিক মুক্তি ও ঈশ্বরের সন্ধানে তিনি এই যাত্রায় গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন বয়েড। বন্যা আঘাত হানার সময় তিনি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে পড়েন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাইকেলকে স্মরণ করে এমিলি বয়েড তাকে ‘রহস্যবাদী, শিক্ষক, নেতা, সঙ্গী, বাবা, ভাই, ছেলে, চাচা এবং অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, বহু মানুষের জীবনে মাইকেল নানা ভূমিকায় পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন ‘এক খাঁটি সোনার হৃদয়ের’ মানুষ। তার উপস্থিতিতে তাদের জীবন আরও উজ্জ্বল, আনন্দময়, সুন্দর ও স্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল বলেও জানান বয়েড। ২০১৭ সালে শিক্ষকতায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন মাইকেল। নিজের একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি নিজেকে শিক্ষক, পথপ্রদর্শক, প্রকৃতিপ্রেমী এবং অন্তরে একজন রহস্যবাদী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
মাইকেলের মৃত্যুর খবর এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ বন্যায় আরও বহু অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। সর্বশেষ তথ্যমতে, ৪২ জন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। তাদের অনেকেই কৈলাস পর্বতের তীর্থযাত্রা ও ট্রেকিংয়ের উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলে গিয়েছিলেন।
নিখোঁজ হওয়া দ্বিতীয় অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে সীমান্তের তিব্বত অংশে নিরাপদে খুঁজে পাওয়া গেছে। পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরের কর্মকর্তারা মঙ্গলবার ওই ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করেন, তবে তার পরিচয় সরকার প্রকাশ করেনি। তাদেরকে কনস্যুলার সহায়তা প্রদান করা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এখনও নিখোঁজ থাকা ৪২ জন নাগরিকের জন্য “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছেন।
নিখোঁজ অস্ট্রেলিয়ানদের উদ্ধারে নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির সরকার উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে আরও ৩০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে নেপালের জন্য অস্ট্রেলিয়ার মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ লাখ ডলারে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েট জানিয়েছেন, নিখোঁজ নাগরিকদের খুঁজে বের করতে সরকার দিনরাত কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা ছাড়িনি। নিখোঁজদের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত উদ্ধারে ১২ জন অতিরিক্ত কনস্যুলার কর্মকর্তাকে নেপালে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। নদীর পানি বাড়তে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাইকেলের পরিবার এখন তার মৃত্যুর শোক বহন করছে। একই বিপর্যয়ে নিখোঁজ অন্য অস্ট্রেলিয়ানদের পরিবারগুলোও অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের ফেরার আশায়—কেউ আশাবাদী, কেউ গভীর অনিশ্চয়তায়।
