চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত ৩৩০ জন দুষ্কৃতকারীর মধ্যে এক নম্বরে থাকা জাহেদুল ইসলাম (৩৫) ওরফে ‘পিচ্চি জাহেদ’কে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফেরার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন।
রোববার রাতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পুরানগড় গ্রামের ভাঙারগোড়া ফরিদ সওদাগরের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মোটরসাইকেলে থাকা মোহাম্মদ ওয়াহিদ (২৮) নামে আরও এক যুবক আহত হয়েছেন। আহত মোহাম্মদ ওয়াহিদ একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত নুরুল আবছারের ছেলে। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
গত ২৫শে আগস্ট রাতে পুরানগড় ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন কার্যালয়ের সামনে থেকে দুটি আকাশমণি গাছ চুরির ঘটনা ঘটে। পরে গাছ দুটি বাজালিয়া ইউনিয়নের শেরে-বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। বন বিভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে নিলামের মাধ্যমে গাছ দু’টি ২৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এর কয়েকদিন পর রাতের আঁধারে ওই গাছ কাটার সময়ের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে নিহত জাহেদুলকে দেখা না গেলেও উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা ছাত্রদল নেতা জয়নাল আবেদীন মানিক গাছ চুরির সঙ্গে জাহেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন।
এর জেরে রোববার রাত ৮টার দিকে নতুনহাটে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত পুরানগড় ইউনিয়ন বিএনপি’র প্রস্তুতিমূলক সভাস্থলে জাহেদুল গেলে মানিককে দেখতে পান। এ সময় গাছ চুরির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে জাহেদুল মানিককে চড়-থাপ্পড় মারেন। পরে মানিকসহ সেখানে থাকা কয়েকজন জাহেদুলকে ধাওয়া করলে তিনি মোটরসাইকেলে করে বাজালিয়ার দিকে চলে যান। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে জাহেদুল ও তার বন্ধু ওয়াহিদ বাজালিয়া থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে দক্ষিণ পুরানগড়ের ভাঙারগোড়া ফরিদ সওদাগরের দোকানের সামনে পৌঁছান। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা ছাত্রদল নেতা জয়নাল আবেদীন মানিক ও পুরানগড় ইউনিয়ন যুবদলের সংগঠক মোহাম্মদ রিদোয়ান ইসলামসহ তাদের সহযোগীরা সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করেন।
এরপর দেশীয় অস্ত্র দিয়ে জাহেদুলকে কুপিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। একই সময়ে নতুনহাট থেকে দুই-তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে লোকজন ঘটনাস্থলে যায় বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সিএমপি সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুতে জননিরাপত্তার স্বার্থে নগরীতে প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর ৩৩০ জন দুষ্কৃতকারীর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। ওই তালিকার এক নম্বরে ছিলেন জাহেদুল ইসলাম ওরফে ‘পিচ্চি জাহেদ’। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। এর আগে গত ১৯শে জানুয়ারি রাতে সাতকানিয়ার পুরানগড় এলাকায় সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১০৪টি ইয়াবা ও ১৫টি দেশীয় অস্ত্রসহ জাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। এর কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ এ বিষয়ে উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী রাজিব ও সদস্য সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। সে যেই হোক না কেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আমরা সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেবো।’ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের স্বজন ও আহত ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপর বেশ কয়েকজন অভিযুক্তের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
