পুঁজিবাজারে ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানির সংকটের পাশাপাশি দুর্বল সারভিলেন্স ব্যবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ছোট পর্যায়েই অনিয়ম শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া, ভালো কোম্পানি ও নতুন আইপিও বাজারে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এসব পদক্ষেপ নেয়া না হলে পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সংস্কার কার্যক্রমও ধীরে ও স্থিরভাবে এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন।
সোমবার বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় এ কথা বলেন তারা।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন ও রিচার্ড ডি রোজারিও, ডিবিএ'র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান, ডিবিএ'র সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সিইও মেসবাহ উদ্দিন।
আলোচনায় ডিবিএর সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী বলেন, পুঁজিবাজারে ৬ হাজার সূচক এখন একটি মনস্তাত্ত্বিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূচকটি ৬ হাজারের কাছাকাছি গেলেই বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট ‘ট্রিমার’ ও ‘আর্থকোয়েক’ আসে। ফলে ৫ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ৮৫০-এর ঘরে গেলেই বাজার ধপ করে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ৬ হাজারের যে সাইকোলজিক্যাল ব্যারিয়ার, মার্কেট এটা ক্রসই করতে পারে না। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট ট্রিমার, ছোট ছোট আর্থকোয়েক আসে।
বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অযথা হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়ে লালী বলেন, কোনো বিনিয়োগকারী ১ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কিনলে সমস্যা কোথায়, সেটি আগে দেখতে হবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, একজন বিনিয়োগকারী ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনলেই কেন ব্রোকারেজ হাউসে ফোন করে জানতে হবে, তিনি কেন এত শেয়ার কিনছেন? তার মতে, বাজারকে বড় হতে দিতে হলে বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। তবে অবৈধ বা কারসাজিমূলক লেনদেন হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুঁজিবাজারের নজরদারি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ডিএসইতে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে দীর্ঘ তদন্তের পরিবর্তে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাখ্যা নেয়া যেতে পারে। পুঁজিবাজারে নতুন ও ভালো কোম্পানি না আসার বিষয়টিও আলোচনায় তুলে ধরেন লালী। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন বাজারে নতুন আইপিও আসছে না? কী করছি আমরা নতুন আইপিও, ব্লু চিপ কোম্পানি আনার জন্য? সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) শেয়ার তালিকাভুক্ত করারও প্রস্তাব দেন তিনি। ডিএসই ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) হাতে থাকা সিডিবিএলের শেয়ার বাজারে আনা গেলে এটি একটি ভালো কোম্পানি হিসেবে বাজারকে শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক তেল সংকটসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও পড়ছে। শুধু একে অপরকে দোষারোপ না করে সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিনহাজ মান্নান ইমন। তিনি বলেন, ২০০ থেকে ৩০০ আইপিওর মধ্যে প্রায় ১৫০টি এখন ‘রেড ফ্ল্যাগ’। এসব কোম্পানির ব্যালান্স শিট ও অভ্যন্তরীণ তথ্য সঠিক ছিল না এবং সেখানে ‘ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার ভিউ’ পাওয়া যায়নি। বিএসইসি চেয়ারম্যানের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার বক্তব্য বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে একটি বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, পুঁজিবাজারের সারভিলেন্স ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী না করলে অতীতের সমস্যাগুলো আবারও ফিরে আসবে। ছোট পর্যায়ে কোনো অনিয়ম শনাক্ত করে ব্যবস্থা না নিয়ে সেটি বড় হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজারের ক্ষতি হয়।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট রয়েছে স্বীকার করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে এ আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
তিনি বলেন, বাজারের সূচক বা লেনদেন বাড়ানো বিএসইসির কাজ নয়। একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল বাজার নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেয়াই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল দায়িত্ব।
মাসুদ খান বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছিল। এর অন্যতম কারণ, বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারবান্ধব এবং বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য একসঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিএসইসি ও ডিএসইর সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এআইভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রথম ধাপে ডিএসই তাদের ব্যবস্থা আপগ্রেড করবে এবং পরবর্তী সময়ে বিএসইসিও এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্সে যাবে।
আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, একটি কোম্পানির আইপিও আবেদনে একাধিক পর্যায়ে একই ধরনের প্রশ্ন ও নথি যাচাইয়ের কারণে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। এ সমস্যা কমাতে নতুন আইপিও বিধিতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ অডিটের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদ, জমি, যন্ত্রপাতি, পাওনা ও দায়সহ আর্থিক বিবরণীর বাস্তবতা যাচাই করা হবে।
ডাইরেক্ট লিস্টিং রেগুলেশন নিয়ে কাজ প্রায় শেষ হয়েছে জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, কমিশনের বৈঠকে অনুমোদনের পর এটি জনমত গ্রহণের জন্য পাঠানো হবে। তিনি বলেন, একটা কোম্পানি আইপিও প্রসেসে আর যাওয়া লাগবে না। সে একটা সার্টেন শেয়ার পোর্শন অফলোড করে দিলে উনি লিস্টেড হতে পারেন। ভেরি কুইক। দুই মাস তিন মাসের মধ্যে এই কাজটা হয়ে যাবে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা কাজ করছি এবং আমি এই কনফিডেন্সটা ফিরিয়ে আনব, কথা বলে নয়, আমার কাজ দিয়ে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা আস্থা রাখেন। আমরা যে কাজ করছি, এই কাজগুলো আপনারা মূল্যায়ন করেন। মূল্যায়ন করে আপনারা আপনাদের ডিসিশনটা নেবেন। এই পুঁজিটা আপনার, এই পুঁজিটা আপনাকেই সংরক্ষণ করতে হবে।
