এলডিসি উত্তরণের আগে পোশাক-চামড়া খাতে সংস্কারের তাগিদ

এলডিসি উত্তরণের আগে পোশাক-চামড়া খাতে সংস্কারের তাগিদ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুল্কসুবিধা কতদিন থাকবে, তা নয়; বরং এই সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই শিল্প দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য কতটা প্রস্তুত হতে পারবে। কিন্তু সেই সুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান দুই খাতকে। পোশাকে ইতিমধ্যে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে; আর বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চামড়া খাত আটকে আছে এক বিলিয়ন ডলারের আশপাশে। এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে এখনই উৎপাদন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে না পারলে শুল্কসুবিধা শেষ হওয়ার পর বড় ধাক্কা সামলাতে হবে বাংলাদেশকে।

শুল্কসুবিধা থাকা অবস্থাতেই রপ্তানি কমছে, অন্যদিকে ভিয়েতনামসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে শুল্কের বাড়তি চাপ সামলাতে হলে এখনই উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অর্থায়ন ও পরিবেশগত মানের দুর্বলতা কাটাতে হবে।

অন্যদিকে, চামড়া শিল্পও এক দশকের বেশি সময় ধরে বড় লাফ দিতে পারেনি। এলডিসি উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়লে ইউরোপের বাজারে সুবিধা ধরে রাখার সময় কিছুটা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু তাতে মূল সমস্যা মিটবে না। কম শ্রম ব্যয়ের পুরোনো সুবিধা দিয়ে আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। তাই বাড়তি সময়কে স্বস্তি নয়, পোশাক ও চামড়া শিল্পের আমূল সংস্কারের শেষ সুযোগ হিসাবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা জরুরি। তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও খাতভিত্তিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল কোনো বিলম্বের জন্য নয়; বরং টেকসই ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য কাজে লাগাতে হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়া যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করে রপ্তানি করা গেলে এ খাত থেকে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা সম্ভব। তবে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও স্থানান্তর প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল না।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এখনই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। তার মতে, গ্যাস সংকটের সমাধান, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, কম খরচে অর্থায়ন এবং উন্নত সরবরাহ ও পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সম্ভাবনাকে আবারও দীর্ঘ স্বস্তির সময় হিসেবে দেখা। বাস্তবতা হলো, শুল্কসুবিধা এখনো থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় দ্রুত কমছে। চামড়া খাতেও এক দশকের বেশি সময় ধরে বড় ধরনের কোন অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে সম্ভাবনাও কম নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমিক, দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক ক্রেতা সম্পর্ক এবং চামড়া শিল্পের স্থানীয় কাঁচামাল—সবই বড় সম্পদ। এখন এসব সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত মান ও উচ্চমূল্যের পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাই তাই মূল প্রশ্ন হলো হলো, সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ এমন একটি শিল্পভিত্তি তৈরি করতে পারবে কি না, যেখানে কম শুল্কের পাশাপাশি পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, দ্রুত সরবরাহ, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত মান হবে প্রধান প্রতিযোগিতার শক্তি। সাকিফ শামীম আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া বাড়তি সময় কাজে লাগানো গেলে শুল্কসুবিধা কমলেও রপ্তানি বাড়তে পারে। আর সময়টি কেবল পার হয়ে গেলে ২০৩২-এর পর শুল্কের ধাক্কা, উৎপাদন ব্যয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা একসঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সামনে পথ দুটি, সুবিধার ওপর নির্ভরতা, অথবা সক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো। বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আমরা কোন পথটি বেছে নিই।

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ ছাড়া বড় বৈশ্বিক ক্রেতাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন। সাভারের বর্জ্য শোধনাগার ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের চামড়া উন্নত বাজারে কার্যত অদৃশ্যই থেকে যাবে। তিনি আরও মনে করেন, যথাযথ নীতিসহায়তা, অবকাঠামো ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে নেয়া সম্ভব। তার মতে, চামড়া খাতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো মূল্য সংযোজন। শুধু প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি না করে জুতা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, ভ্রমণসামগ্রী, গাড়ির আসনের চামড়া ও অন্যান্য তৈরি পণ্যে যেতে পারলে আয় বহুগুণ বাড়তে পারে।

চামড়া শিল্পে দ্রুত প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। বিশেষ করে সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত না হলে বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা করা কঠিন হবে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ইউরোপীয় শুল্কসুবিধা কাঠামোতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর তিন বছরের একটি সুরক্ষা সময় রাখা হয়েছে। এরপর শর্ত পূরণ করতে পারলে উন্নততর শুল্কসুবিধার সুযোগ রয়েছে। ফলে উত্তরণ পিছিয়ে গেলে প্রস্তুতির সময় বাড়বে। কিন্তু এই সময়টিতে কেবল সুবিধা ধরে রাখলেই চলবে না, বরং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে তাই কয়েকটি কাজ এখনই করতে হবে।

প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাজারসুবিধা নিয়ে আলোচনা জোরদার করতে হবে। উন্নততর শুল্কসুবিধা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অন্য কোনো বিশেষ বাণিজ্য ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে আগাম প্রস্তুতি দরকার।

দ্বিতীয়ত, পোশাক শিল্পে পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কম খরচে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার সময় কমাতে হবে। ষষ্ঠত, শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। আর চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সাভারের পরিবেশগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কাঁচা চামড়া থেকে জুতা, ব্যাগ, মানিব্যাগসহ উচ্চমূল্যের তৈরি পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে।

পোশাক ও চামড়া শিল্পের বাস্তবতা নিয়ে সিএসইআরের বিশ্লেষণ: সিএসইআর-এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম সংস্থাটির পক্ষে সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হলো রপ্তানি। আর সেই রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে পোশাক খাত থেকে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যও দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনাময় দ্বিতীয় সারির রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তন, ইউরোপীয় বাজারের প্রতিযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এই দুই শিল্পের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে যাচ্ছে। এই সময় বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ LDC থেকে উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের Everything But Arms (EBA) সুবিধা একটি নির্দিষ্ট transition period-এ বহাল থাকে। বর্তমান EU GSP কাঠামো অনুযায়ী ২০২৬ সালে LDC থেকে উত্তরণকারী দেশগুলো আরও তিন বছর EBA সুবিধা পাবে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরণ ২০২৯ পর্যন্ত পিছিয়ে গেলে ইউরোপের শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার প্রায় ২০৩২ সাল পর্যন্ত ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন। এই বাড়তি সময় কি আমরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে ব্যবহার করব, নাকি এটিকে আরেক দফা স্বস্তির সময় হিসেবে দেখব?

বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সংকটের জন্য ২০৩২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান এখনই চাপে পড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১.৬৪ শতাংশ কম। আরও উদ্বেগজনক হলো ইউরোপীয় বাজারের চিত্র। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৬.৪৩ শতাংশ কমে ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। একই সময়ে EU-এর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৯.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের পতন বাজারের সামগ্রিক পতনের তুলনায় অনেক বেশি, যা আশঙ্কাজনক।

জানুয়ারি-এপ্রিল ২০২৬-এর হিসাব আরও স্পষ্ট। ওই সময়ে EU-তে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯.৩৩ শতাংশ, যেখানে EU-এর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ১০.৪২ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ও তুরস্কের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পারফরম্যান্স দুর্বল ছিল।

এই তথ্যের তাৎপর্য গভীর। কারণ এখনো বাংলাদেশ EBA-এর শুল্কসুবিধা পাচ্ছে। তারপরও যদি প্রতিযোগিতায় বাজারের অংশ কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে শুল্কসুবিধা কমে গেলে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। ইউরোপীয় বাজারে পোশাকের ক্ষেত্রে LDC graduation-এর পর গড় শুল্ক প্রায় ১২ শতাংশে উঠতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় হয় ক্রেতাকে বহন করতে হবে, নয়তো রপ্তানিকারককে মূল্য কমিয়ে বহন করতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হবে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ছিল তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়। কিন্তু বৈশ্বিক পোশাক বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ক্রেতারা এখন দাম ছাড়াও পণ্যের মান, উৎপাদনের গতি, delivery reliability, sustainability, traceability এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো উৎপাদন ব্যয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, কাস্টমস ও বন্দরের জটিলতা এবং দীর্ঘ সরবরাহ-শৃঙ্খল শিল্পের সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে শুল্কসুবিধা থাকলেও প্রতিযোগিতার জায়গায় বাংলাদেশ ক্রমেই চাপ অনুভব করছে। অন্যদিকে ভিয়েতনামসহ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ উৎপাদন দক্ষতা, বাণিজ্য চুক্তি, উচ্চমূল্যের পণ্য এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে EU-তে বাংলাদেশের রপ্তানি কমলেও ভিয়েতনামের রপ্তানি সামান্য বেড়েছে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হবে কে সবচেয়ে কম ব্যয়ে, দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ করতে পারে তার উপর।

চামড়া শিল্পের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এখানে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক বড়, কিন্তু সেই সম্ভাবনার তুলনায় বাস্তব রপ্তানি এখনো অত্যন্ত কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ১.২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭.০৭ শতাংশ বেশি। এটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং খাতটির জন্য আশাব্যঞ্জক সংকেত। তবে এক দশকের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, এই খাত এখনো তার সম্ভাবনার কাছাকাছি যেতে পারেনি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ১.১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দশকে রপ্তানি প্রায় একই জায়গায় ঘুরপাক খেয়েছে।

অথচ শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, দেশের উৎপাদিত চামড়া যথাযথভাবে ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা গেলে এই খাত ১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি শিল্পে পরিণত হতে পারে।

চামড়া কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে footwear, bags, wallets, travel goods, automotive leather এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের finished products তৈরি করতে পারলে রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়তে পারে। কিন্তু এর জন্য আন্তর্জাতিক পরিবেশমানের সার্টিফিকেশন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য শিল্প অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর CETP-এর দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক certification পাওয়ার জটিলতা এই খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়কে পরিকল্পনায় রূপান্তর করা।

প্রথমত, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতি আরও জোরদার করতে হবে। EBA-পরবর্তী সময়ে কী ধরনের preferential market access বাংলাদেশ পেতে পারে, GSP+ এর সুযোগ কতটা বাস্তবসম্মত এবং EU-এর সঙ্গে FTA বা অন্য কোনো preferential arrangement-এর সম্ভাবনা কী—এসব নিয়ে এখনই সুসংগঠিত আলোচনা প্রয়োজন। ২০২৯ বা ২০৩২-এর দরজায় গিয়ে আলোচনা শুরু করলে সময়ের মূল্য অনেকটাই হারিয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, পোশাক শিল্পকে low-value basic products থেকে high-value এবং fashion-oriented products-এর দিকে যেতে হবে। Technical textiles, man-made fibre, sportswear, outerwear, lingerie, functional apparel এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, Industry 4.0 ও automation-কে খরচ কমানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে। Artificial intelligence, robotics, digital production planning, automated cutting, predictive maintenance এবং data-driven supply chain এখন বিলাসিতা নয়। এগুলো উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা ধরে রাখার অংশ।

চতুর্থত, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নকে শিল্পনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, কিন্তু এর অর্থ শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যাওয়া নয়। বরং নতুন প্রযুক্তি পরিচালনা করতে সক্ষম দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়বে। তাই reskilling ও upskilling-এর জন্য সরকার, শিল্পমালিক ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

পঞ্চমত, চামড়া শিল্পে environmental compliance-কে জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক certification ছাড়া বিশ্বমানের ব্র্যান্ডের supply chain-এ বড় পরিসরে প্রবেশ করা কঠিন। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর CETP, solid waste management, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত compliance-এর সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

ষষ্ঠত, রপ্তানি বহুমুখীকরণকে বাস্তব ফলাফলে নিয়ে যেতে হবে। পোশাক ও চামড়ার পাশাপাশি pharmaceuticals, agro-processing, light engineering, ICT services, footwear, plastics, ceramics এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সপ্তমত, জ্বালানি ও অর্থায়নের সমস্যার সমাধান ছাড়া রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, প্রতিযোগিতামূলক সুদে অর্থায়ন, দ্রুত customs clearance এবং দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা এখন রপ্তানি নীতির অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় ভুলটি হবে ইউরোপের শুল্কসুবিধাকে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া। EBA একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা, কিন্তু কোনো বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ধরে রাখার জন্য একটি tariff preference যথেষ্ট নয়। বিশ্বের বড় ক্রেতারা শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী খোঁজে। তারা এমন দেশ থেকে পণ্য নিতে চায় যেখানে উৎপাদন স্থিতিশীল, delivery সময়মতো, quality consistent, environmental standards পূরণ করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পণ্যের নকশা ও উৎপাদন পরিবর্তন করা যায়। বাংলাদেশকে তাই ‘শুল্কসুবিধা পাওয়া দেশ’ থেকে ‘বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম উৎপাদনকেন্দ্র’ হয়ে উঠতে হবে। এখানেই প্রস্তাবিত তিন বছরের extension-এর আসল মূল্য। এটি কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা নয়। এটি একটি transition window। এই সময়ের মধ্যে যদি বাণিজ্য কূটনীতি, শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষতা, জ্বালানি, অর্থায়ন এবং compliance-এর কাঠামোগত সংস্কার করা যায়, তাহলে ২০৩২ সালের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আর যদি এই সময়ও কেটে যায় পুরোনো কাঠামো, কম উৎপাদনশীলতা এবং সুবিধানির্ভর রপ্তানি মডেলের ওপর নির্ভর করে, তাহলে LDC graduation-এর পর শুল্কের ধাক্কা বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক ও চামড়া শিল্পের সামনে তাই প্রশ্নটি আর ‘EBA সুবিধা কতদিন থাকবে’—এখানে সীমাবদ্ধ নেই। আসল প্রশ্ন হলো, EBA সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই আমরা কি এমন একটি শিল্পভিত্তি তৈরি করতে পারব, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য শুল্কসুবিধার চেয়ে আমাদের উৎপাদনশীলতা, মান, প্রযুক্তি ও দক্ষতাই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ২০৩২ সালের পর বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী থাকবে।