১৯৯৮ সালে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার সময় সোনিয়া গান্ধী ছিলেন একজন অপ্রত্যাশিত এবং অনেকটাই রহস্যময় রাজনৈতিক নেতা। ইতালিতে জন্ম নেয়া সোনিয়া সাবেক ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্ত্রী। রাজনীতির আলো থেকে বছরের পর বছর নিজেকে দূরে রাখার পর এই বিধবা এমন একটি দলের দায়িত্ব নেন, যে দল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের বড় একটি সময়জুড়ে দেশটির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। তবে কংগ্রেসের দায়িত্ব নেয়ার প্রথম কয়েক মাসেই সোনিয়াকে নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। ইন্ডিয়া টুডে সাময়িকী তাকে দলের নেতাকর্মীদের কাছে ‘একেবারেই এক রহস্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল- তিনি ছিলেন ‘অনুধাবন করা কঠিন’, নিরাপত্তার বলয়ে বহির্বিশ্ব থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং ‘অপরিচিত উচ্চারণে সংক্ষিপ্ত এক লাইনের মন্তব্যের’ জন্য পরিচিত। তবে তার এই নীরবতার আড়ালে সাময়িকীটি এমন একজন রাজনীতিককে দেখতে পেয়েছিল, যিনি তখনই ক্ষমতা প্রয়োগের কৌশল রপ্ত করতে শুরু করেছেন। তিনি পরস্পরবিরোধী মতামত শুনতেন, তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং এরপর নিজের সিদ্ধান্ত নিতেন।
ইন্ডিয়া টুডে লিখেছিল, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে কাউকে বাদ দেয়া হয় না এবং কোনো কণ্ঠকে স্তব্ধ করা হয় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।’
প্রায় তিন দশক পর, অনিচ্ছুক এক বহিরাগত থেকে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার পর এবার নিজের গল্প নিজেই তুলে ধরছেন সোনিয়া গান্ধী।
৭৯ বছর বয়সী সোনিয়ার জীবনজুড়ে রয়েছে অসাধারণ ব্যক্তিগত শোক। শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীকে তার দেহরক্ষীরা গুলি করার পর তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটেছেন। এর সাত বছর পর আত্মঘাতী বোমা হামলা হয় এবং তাতে স্বামী রাজীব গান্ধী নিহত হলে তার মরদেহও তিনি নিজ হাতে বাড়িতে নিয়ে যান। তার আত্মজীবনী ‘বিলংয়িং: আ জার্নি অব লাভ’ আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আলফ্রেড এ নফ এবং বৃটেনে উইলিয়াম কলিন্স থেকে প্রকাশ হওয়ার কথা। বইটি ভারতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত রাজনৈতিক বইগুলোর একটি হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলফ্রেড এ নফের মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সোনিয়া বলেছেন, তিনি এই স্মৃতিকথাকে ‘আমার হৃদয়ের সেই যাত্রার সাক্ষ্য’ হিসেবে তুলে ধরতে চান, যে যাত্রায় কোমল আনন্দের পাশাপাশি গভীর হতাশা ও বেদনা তার জীবনকে চিহ্নিত করেছে। উইলিয়াম কলিন্স জানিয়েছে, বইটির শুরু ১৯৬৫ সালে কেমব্রিজে। সেখানে ১৯ বছর বয়সী ইতালীয় শিক্ষার্থী সোনিয়া মাইনো প্রেমে পড়েন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাতি রাজীব গান্ধীর। প্রকাশকের ভাষায়, এই ‘উন্মোচনকারী’ বিবরণে সাধারণত অন্তর্মুখী ও নীরব সোনিয়া উষ্ণতা ও অকপটতার সঙ্গে তার জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন।
ছোট শহরের ইতালীয় শৈশব থেকে শুরু করে প্রেম, নির্বাসন, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ভয়াবহ ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্য দিয়ে কীভাবে তিনি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছালেন, সেই গল্পই উঠে আসবে এতে।
ইতিমধ্যেই ভারতে স্মৃতিকথাটি নিয়ে প্রকাশনা সংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া পাণ্ডুলিপির কিছু অংশে পরিবর্তন চেয়েছিল। এরপর কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ করেন, সরকারের সমালোচনামূলক কিছু অংশ পরিবর্তনের জন্য প্রকাশক রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল। তবে পেঙ্গুইন এই দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহী ও প্রস্তুত ছিল এবং এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট আলোচনা চলছিল। তবে পাঠকের আগ্রহ শুধু ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে এক তরুণ বিদেশি নারীর বিয়ে এবং সেই পরিবারে তার প্রবেশের গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আধুনিক ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তরও তারা খুঁজবেন। সোনিয়াকে রাজনীতিতে কী টেনেছিল? ২০০৪ সালে আট বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর কংগ্রেস যখন আবার ক্ষমতায় ফিরল, তখন পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল? সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত- দল ও জোটসঙ্গীদের পূর্ণ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মনমোহন সিংকে বেছে নিয়েছিলেন? মনমোহন সিং ছিলেন ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের অন্যতম প্রধান স্থপতি। সোনিয়া কি আশঙ্কা করেছিলেন যে তার বিদেশি বংশপরিচয় তার সরকারের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে? সাংবাদিক ও লেখক নীরজা চৌধুরী বলেন, আমি মনে করি, এটিই আসলে সবচেয়ে বড় অনুত্তরিত প্রশ্ন। তিনি সহজেই প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন।
তার দল ও জোটসঙ্গীদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির দপ্তরও তাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি প্রস্তুত রেখেছিল।
সাবেক কংগ্রেস নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, সোনিয়ার ছেলে রাহুল গান্ধী তার মায়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, তার মা-ও তার দাদি ইন্দিরা গান্ধী ও বাবা রাজীব গান্ধীর মতো পরিণতির শিকার হতে পারেন। নটবর সিংয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, পরিস্থিতি একপর্যায়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। রাহুল জানিয়েছিলেন, মাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে আটকাতে তিনি সম্ভব যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। সোনিয়ার স্মৃতিকথা কি সেই অসাধারণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য দেবে? নাকি পর্দার আড়ালে আসলে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বর্ণনা তুলে ধরবে?
কারণ যা-ই হোক, সোনিয়ার সেই সিদ্ধান্ত ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। তবে এটি আরও বড় একটি রহস্যের মাত্র একটি অংশ- সোনিয়া গান্ধী আদৌ রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন কেন? বছরের পর বছর তিনি রাজনৈতিক জীবনকে প্রতিহত করেছেন। ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পরও তিনি মূলত জনজীবন থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি কমতে থাকলে তিনি ১৯৯৭ সালে দলে যোগ দেন এবং এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দলের সভাপতি হয়ে যান।
সে সময় প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে ব্যাপকভাবে অবজ্ঞা করেছিলেন। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ইন্ডিয়া টুডে লিখেছিল, শুরুতে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা তাকে শুধু একজন গৃহবধূ কিংবা ইতালীয় বিস্ময় হিসেবে দেখতেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নিজের দলকে বদলে দিতে শুরু করেন। কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা স্বীকার করেছিলেন, আমি কখনো ভাবিনি ওই নারী এমন চমক দেখাতে পারেন।
সাময়িকীটি তখনই সোনিয়ার মধ্যে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশলবিদকে দেখতে পেয়েছিল। তাকে তারা মখমলের দস্তানার ভেতরে লোহার মুষ্টি বলে বর্ণনা করেছিল। একই সঙ্গে বলা হয়েছিল, তিনি কীভাবে হিমালয়সম অহংকারকে পাদদেশের পাহাড়ের উচ্চতায় নামিয়ে আনতে হয়, তা জানতেন। এরপর রয়েছে সেইসব মর্মান্তিক ঘটনা, যা একদিকে তার রাজনৈতিক জীবনের পথ তৈরি করেছিল, অন্যদিকে তার পরিবারের জীবনও চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর সোনিয়া তার পরিবারের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সাত বছর পর আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিনি হারান রাজীব গান্ধীকে। এই দুটি মৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয় এবং সোনিয়ার নিজের জীবনও আমূল পাল্টে যায়। সেই বছরগুলোর কথা সোনিয়া কীভাবে তুলে ধরবেন? রাজীব গান্ধীর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে, যে রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই একসময় জোরালোভাবে প্রতিহত করেছিলেন, সে বিষয়ে কী লিখবেন? নিজের সন্তানদের ঘিরে থাকা নিরাপত্তা-আশঙ্কা সম্পর্কে কী বলবেন? আর সেই মুহূর্তের কথাই বা কীভাবে বর্ণনা করবেন, যখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে এভাবে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়?
এর পাশাপাশি রয়েছে আরও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
