যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘জ্বালানি সংকটে শিল্পোৎপাদনে বিপর্যয়: দিনে ক্ষতি ২৩৮৭ কোটি টাকা’। খবরে বলা হয়, জ্বালানি সংকট দেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। এটি শুধু এখন আর বড় শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই; ওষুধ, টেক্সটাইল, সিরামিক, চিনি পরিশোধন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ সারা দেশের শিল্পকারখানায় প্রতিদিন ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য এক হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ আটকে আছে।
রোববার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ : ব্যবসার পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও এমসিসিআই যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের সহযোগিতায় এ বৈঠকের আয়োজন করে। এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ফজলুল হক। বৈঠক সঞ্চালনা করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হাসিব হাসান।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৪ বছরে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি তার প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩ হাজার টেক্সটাইল ও ডাইং মিল রয়েছে, যেগুলো দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয়। কিছু কারখানা বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছে। গাজীপুরে গ্যাসের চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। সেখানে দৈনিক চাহিদা ৫৯০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হয় ২৫০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। ১৮ থেকে ২২ শতাংশ কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ কারখানার মধ্যে ৯০০টি বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৯ শতাংশ কারখানা উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। ময়মনসিংহে ২৯৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। সেখানে গড়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানা পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। চট্টগ্রামেও শিল্প সক্ষমতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। জাতীয় পর্যায়ে নিটওয়্যার ও ডাইং শিল্পের উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এতে আরও বলা হয়, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে রয়েছে, এতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ আটকে আছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন শুধু বড় শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। ওষুধ, টেক্সটাইল, সিরামিক, চিনি পরিশোধন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, অনির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কম গ্যাসের চাপ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয় রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী শিল্প ও বড় শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি বরাদ্দে অগ্রাধিকার এবং কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনার সুযোগ দিতে আগাম ও বিশ্বাসযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের দাবি জানানো হয়। আলোচনায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি সংগ্রহের দুর্বলতার প্রতিফলন। শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতের সুরক্ষায় একটি শিল্প জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
লাফার্জহোলসিমের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১০ থেকে ২০ বছরের একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি কৌশল প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, সিরামিক শিল্পে গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। দীর্ঘদিন সরবরাহের অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে।
ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকট এখন শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি ও পরিকল্পনারও বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি বরাদ্দ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবসম্মত জ্বালানি মিশ্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বৈঠকে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন শিল্প বিনিয়োগে আস্থা তৈরির লক্ষ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা, পূর্বানুমানযোগ্য মূল্য নির্ধারণ, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ত্বরান্বিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রথম আলো
‘ছিনতাই হচ্ছে, হিসাব নেই, বিচারও নেই’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, চোখের চিকিৎসা করাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে ২৯ আগস্ট ভোরে ছিনতাইকারীর ব্যাগের টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান শিক্ষক রনজিলা পারভিন। পাঁচ মাস আগে উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলামও একই কৌশলে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
গত ছয় মাসে ঢাকায় চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় এই তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনটি ঘটনাতেই তাঁরা ছিলেন চলন্ত যানে আর ছিনতাইকারীরা পাশ বা পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টেনে ফেলে দেয়।
রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের হাতে এই তিনটি মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সড়কে, মোড়ে এবং ব্যস্ত এলাকায় একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। মৃত্যু কিংবা অঙ্গহানির মতো ঘটনার বিষয়গুলো সামনে এলেও অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়ালে থাকছে। পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোতে দস্যুতা ও ডাকাতির মামলা নেয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি। আর ডাকাতির মামলা মাত্র ১৮। তবে প্রকৃত ছিনতাই কতটি হচ্ছে—তার উত্তর পুলিশের মামলার হিসাব থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই মামলা করতে যায় না। আবার থানায় গেলেও মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নেওয়া হচ্ছে।
গত ১ মার্চ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২২টি গুরুতর বা আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো। এই ঘটনাগুলোতে মানুষকে কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, গুলি করে, চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে এবং অস্ত্রের মুখে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ছিনতাইয়ের ২২ ঘটনার ২৬ জন সরাসরি ভুক্তভোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী। নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা কম হলেও তাঁদের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ২৬ ভুক্তভোগীর ৬ জন নারী হলেও চারটি প্রাণহানির ঘটনার তিনটিই নারী।
অন্তত সাতটি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন রিকশা, অটোরিকশা বা অন্য যানবাহনে। দুই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন চলন্ত ট্রেনে। দুই নারী বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নামার পরপরই আক্রান্ত হন। অর্থাৎ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে।
ছিনতাইয়ের খবর জানে না থানা
সোহেলি ইসলাম ছিলেন একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। ঈদের ছুটি শেষে মেয়েকে নিয়ে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। ৬ জুন ভোরে বাস থেকে নেমে রিকশায় বাসায় যাওয়ার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দেয়। রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পাঁচ দিন পর হাসপাতালে মারা যান।
সোহেলির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার সময় পর্যন্ত তাঁর পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানার ওসিও তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তাঁরা এমন কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা জানতেন না। পরে ১৩ জুন মামলা হয় এবং একজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। অর্থাৎ প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনাও মামলা হওয়ার আগে কয়েক দিন পুলিশের অপরাধের খাতায় ছিল না।
এমন আরও সরাসরি অভিযোগ পাওয়া যায় মোহাম্মদপুরে। ১১ মে বিকেলে চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রকে ঘিরে ধরে কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তাঁর মুঠোফোন, টাকা, মানিব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস নেওয়া হয়। পুরো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়ে। ভুক্তভোগীর বাবা পরে গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন, তাঁরা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে মুঠোফোন হারানোর জিডি করতে বলে।
এর বাইরে গত ছয় মাসে ছিনতাইয়ের শিকার সাত ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের কেউই থানায় মামলা করেননি। এর মধ্যে চারজন মামলা করতে যাননি। তিনজন ছিনতাইয়ের ঘটনার পর থানায় গেলে জিডি নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নোমান ছিদ্দিক নামে এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ১৬ আগস্ট রাতে মৌচাক এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। তাঁর মুঠোফোনটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। পরে রমনা থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলে মুঠোফোন হারানোর ঘটনায় জিডি নেওয়া হয়। তাতে লেখা হয়, ‘ফোনটি হারিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও সেটি পাওয়া যায়নি।’ অথচ ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখানেই ছিনতাইয়ের সরকারি হিসাবের বড় দুর্বলতা। একটি মুঠোফোন যদি অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেওয়া হয়, অথচ নথিতে সেটি ‘হারানো মুঠোফোন’ হয়ে যায়, তাহলে ঘটনাটি আর ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যানে থাকে না। এ কারণে অপরাধের প্রকৃত চিত্রও বোঝা যায় না।
ছিনতাই শুধু রাতের অপরাধ নয়
অতীতে রাজধানীর ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো ভোর, নির্জন সড়ক, রাত কিংবা একা পথচারীদের সঙ্গে বেশি হতো। তবে গত ছয় মাসের ঘটনাগুলো সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। সকাল-রাতে ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন দিনের প্রায় সব অংশেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
রনজিলা পারভিন আক্রান্ত হয়েছেন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। মুক্তা আক্তারের ঘটনা সকাল নয়টার পর। মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ে কলেজছাত্রকে রিকশা থামিয়ে ছিনতাই করা হয় বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিটে। মতিঝিলে ব্যাংক ও অর্থ লেনদেনের এলাকায় দিনের বেলায় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ এসেছে।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণ করা ২২টি ঘটনার মধ্যে ভোররাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘটেছে ৭টি বা প্রায় ৩২ শতাংশ। আর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ঘটেছে ৮টি বা প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু এই দুই সময়েই ঘটেছে ১৫টি ঘটনা—মোট ঘটনার প্রায় ৬৮ শতাংশ। বাকি ৭টি বা ৩২ শতাংশ ঘটেছে সকাল ৯টার পর থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।
সকালের ঘটনাগুলোতে রিকশা-অটোরিকশার যাত্রী এবং ব্যবসার কাজে নগদ টাকা নিয়ে বের হওয়া ব্যক্তিদের লক্ষ্য করার প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে সন্ধ্যা ও রাতের ঘটনাগুলোতে পথরোধ, ছুরি-চাপাতি দেখানো বা আঘাত করে টাকা-মুঠোফোন নেওয়ার ঘটনা বেশি।
তবে ভোরের একটি বিশেষ ঝুঁকি স্পষ্ট। ঢাকার বাইরে থেকে বাসে এসে গাবতলী, শ্যামলী, যাত্রাবাড়ী বা অন্যান্য এলাকায় নামা যাত্রীরা রিকশা বা অটোরিকশায় যাওয়ার সময় লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। যেমন সোহেলি ইসলাম ঢাকায় ফিরেছিলেন দিনাজপুর থেকে। রনজিলা এসেছিলেন বগুড়া থেকে। মোহাম্মদপুরে বাসার সামনে চাপাতির মুখে পড়া দুই নারীও ঢাকার বাইরে থেকে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফিরেছিলেন। অর্থাৎ বাস থেকে নামার পর টার্মিনাল থেকে বাসা পর্যন্ত যাত্রা ছিনতাইয়ের একটি স্পষ্ট ঝুঁকির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
কালের কণ্ঠ
দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম ‘পাঁচ ছিনতাইকারী ১ বর্গকিলোমিটারে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর সড়কগুলোতে নামে মানুষের ঢল। কেউ ঢাকা ছাড়ে, কেউ ফেরে।
বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নানা কর্মস্থল অভিমুখে দ্রুত পৌঁছানোর তাড়া শুরু হয়ে যায়। প্রতিদিন লাখো মানুষ ছুটে চলে রাজধানীর এক এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। রাত গভীর হলেও থামে না নগরীর চলাচল। আর মানুষের এই নিরন্তর যাতায়াতের সুযোগকেই কাজে লাগায় ছিনতাইকারী ও কথিত ‘টানা পার্টি’।
শুধু সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া নয়, এই অপরাধে ভুক্তভোগীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ গত শনিবার ভোরে রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে রনজিলা পারভিন (৫৬) নামের এক স্কুল শিক্ষকের মৃত্যু হয়। একই দিন ভোরে কদমতলীর ভাঙা ব্রিজের পাশে ছিনতাইয়ের সময় পথচারীদের সঙ্গে জাপটাজাপটির সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আরেক ছিনতাইকারী নিহত হয়। তার আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে ভাটারা থানা এলাকায় হেঁটে যাওয়ার সময় এক নারীর ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই ওই ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়। গত ৭ জুন মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জনতা ব্যাংকের সামনে দিনদুপুরে মো. লোকমান নামের এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ও টাকাভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। গত ১৯ মার্চ রাজধানীর তুরাগ থানা এলাকায় মেট্রো রেল স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ছিনতাইকারীর ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় চলন্ত অটোরিকশা থেকে পড়ে মুক্তা আক্তার নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ধরনের ঘটনা অনেক।
জানা যায়, রাজধানীর মূল ৩০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকায় ছিনতাইয়ে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত এক হাজার ৩৮৭ জন।
এই হিসাব প্রায় তিন মাস আগের। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় পাঁচজন। তবে ডিএমপির আট বিভাগের মধ্যে একেক বিভাগে ছিনতাইয়ের ঘটনা ও ছিনতাইকারীর সংখ্যার রকমফের রয়েছে। তার পরও তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা নগর নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তালিকাভুক্ত সক্রিয় ছিনতাইকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন রয়েছেন ওয়ারী বিভাগে। তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে। এ ছাড়া মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনায় ১৫২, গুলশানে ৬৭ এবং মিরপুরে ৫৩ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে। এদের ৮০ শতাংশের বেশি একাধিক মামলার আসামি এবং গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধ কর্মে সক্রিয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরে আরো অনেক ছিনতাইকারী সক্রিয়, যাদের অনেকেই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই ছুরি, চাপাতি অথবা সামুরাই নিয়ে ছিনতাইয়ে নামে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো এলাকায় তালিকাভুক্তদের সংখ্যা বেশি হলেই সেখানে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি—এমনটি সঠিক নয়। কারণ জনসংখ্যার ঘনত্ব, যানবাহনের চাপ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, রাতের জনচলাচল, পরিবহনকেন্দ্র ও অপরাধপ্রবণ এলাকার ঘনত্ব—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হয়।
সূত্র বলছে, সর্বশেষ সংসদ ভবন এলাকায় শিক্ষিকার মৃত্যুর পর থেকে বিশেষ নজরদারি এবং অভিযানে গুরুত্ব দিয়েছে ডিএমপি। এরই অংশ হিসেবে ৫০টি থানা এলাকায়ই টহল টিম বাড়ানোসহ বিশেষ পদক্ষেপ নিতে গত শনিবার নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি সদর দপ্তর।
ভুক্তভোগী অনেকে আইনের দ্বারস্থ হন না: ডিএমপির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর ৫০ থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭৮টি মামলা হয়েছে। তবে পুলিশের নথিতে থাকা ১৭৮টি মামলা রাজধানীর ছিনতাইয়ের পূর্ণ চিত্র নয় বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর অনেকেই মামলা করতে চান না। কেউ সাধারণ ডায়েরি করেন, আবার কেউ ঝামেলা বা হয়রানির আশঙ্কায় থানায় অভিযোগই করেন না। ফলে নথিভুক্ত মামলার বাইরে আরো অনেক ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দুই শতাধিক হটস্পটে বিশেষ ঝুঁকি: রাজধানীতে দুই শতাধিক ছিনতাইপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পুলিশি টহল, চেকপোস্ট, সাদা পোশাকে নজরদারি এবং সন্দেহভাজনদের ওপর পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশি উপস্থিতিতে ফাঁক পেলেই কৌশল বদলে ফেলছে অপরাধীরা। যানজটে আটকে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে মোবাইল টেনে নেওয়া, চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা পথচারীর হাতে থাকা ফোন কেড়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
কখনো মোটরসাইকেলে দু-তিনজনের দল ঘুরে বেড়ায়। একজন থাকে চালকের আসনে, আরেকজন সুযোগ বুঝে টার্গেটে থেকে হাতে থাকা মোবাইল বা ব্যাগ টেনে নেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়ে। ট্রেনে যাত্রীরাও এ ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়।
মোবাইল ফোন এখনো প্রধান টার্গেট: রাজধানীর ছিনতাইয়ের বড় একটি অংশের এখনো টার্গেট মোবাইল ফোন সেট। গাড়ি, রিকশা কিংবা ফুটপাতে চলার সময় হাতে থাকা মোবাইল সহজেই অপরাধীদের নজরে পড়ে। বিশেষ করে গাড়ির জানালা খোলা রেখে মোবাইল ব্যবহার, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা কিংবা রিকশায় বসে অসতর্কভাবে ফোন ব্যবহার করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। ‘দ্রুত আঘাত, দ্রুত পলায়ন’ কৌশল ব্যবহার করায় এসব চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা পুলিশের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাত ও ভোরে বাড়ে ঝুঁকি: মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর অনেক সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। গণপরিবহন কমে যায়, পথচারীও কম থাকে। এই সময়কেই সুযোগ হিসেবে নেয় ছিনতাইকারীচক্র। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরমুখী সড়ক, মহাসড়কের প্রবেশপথ, বাজার ও হাসপাতালের আশপাশে ভোরের যাত্রীরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে। হাতে ব্যাগ, সঙ্গে টাকা বা মূল্যবানসামগ্রী এবং অপরিচিত পরিবেশ—এই তিন কারণে তারা সহজ টার্গেটে পরিণত হয়। নির্জন সড়কে রিকশা থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখানো কিংবা মোটরসাইকেলে এসে পথ আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বাধা দিলেই অস্ত্র ব্যবহার: ছিনতাইয়ের সঙ্গে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ছুরি, চাকু, চাপাতিসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আসছে। গত ২৭ জুন ধানমণ্ডিতে রিকশার গতিরোধ করে দুই ব্যক্তির কাছ থেকে দুটি দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। বাধা দেওয়ায় একজনকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে ওই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ধানমণ্ডি মডেল থানা পুলিশ। এ ধরনের ঘটনা জানান দিচ্ছে, ছিনতাই এখন শুধু অর্থ বা মূল্যবানসামগ্রী কেড়ে নেওয়ার অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। সামান্য প্রতিরোধও কখনো কখনো ভুক্তভোগীর জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি।
সমকাল
‘যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ যেত না, সেখানেও লোডশেডিং’-এটি দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, রাজধানীর বেইলি রোডে ৯ বছর ধরে বসবাস করছেন ইকরামুল কবির। এবারের মতো লোডশেডিং তিনি এই এলাকায় আগে কখনও দেখেননি। তাঁর মতে, আগের বছরগুলোতে মাঝে মাঝে লোডশেডিং হতো। পাশে মিন্টো রোডে মন্ত্রী-সচিবদের মতো দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বসবাস থাকায় দেশের অন্য এলাকা বা ঢাকার অন্যান্য অংশের মতো বিদ্যুতের বড় সংকট ছিল না। হয়তো প্রচণ্ড গরম পড়লে কয়েক দিন পর দু-একবার বিদ্যুৎ যেত। কিন্তু এবার চিত্র পুরো ভিন্ন। তিন-চার দিন ধরে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ গেছে। এর মধ্যে ৫-১০ মিনিট করে দুবার বিদ্যুৎ চলে যায়, আর দুবার এক ঘণ্টার কমবেশি লোডশেডিং হয়। রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ যাওয়ার কথা জানান তিনি। রোববার ঢাকার পাঁচটি অঞ্চল, যেগুলোকে সাধারণত অভিজাত এলাকা বলা হয়– এমন এলাকার সাতজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে ইকরামুল কবিরের অভিজ্ঞতার মতোই তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মতে, এবারের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা লোডশেডিংয়ের চিত্র থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
তবে বিষয়টি সে রকম নয় বলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) একজন নির্বাহী পরিচালক সমকালকে জানান। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এমনিতেই গ্রামে বেশি লোডশেডিং করার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। তবে এবার যেটা ব্যতিক্রম তা হলো, আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যেখানে মন্ত্রী, সচিব বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থাকতেন, সেখানে সাধারণত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া হতো। কিন্তু এবার সেই চিত্র পাল্টে গেছে। হাসপাতাল, কেপিআইভুক্ত এলাকা এবং শিল্প খাত ছাড়া সব এলাকায় প্রায় সমান হারে লোডশেডিং করা হচ্ছে। কেউ যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, সরকার থেকে তেমনই নির্দেশনা রয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে দেশ। দুই দিন ধরে দিনের একটা বড় অংশে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন হ্রাস এবং জ্বালানি তেলের সংকটে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। এর প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৪টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় ঘাটতি ছিল তিন হাজার ২৯৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায় ১৬ হাজার ২৮১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৭৪২ মেগাওয়াট; তখন ঘাটতি ছিল দুই হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট। এর আগে দুপুর ১২টায় ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টায় তিন হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট।
ঢাকাতেও লোডশেডিং
আগে ঢাকার অনেক এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম হতো। বিশেষ করে রাজধানীর কিছু আবাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেকটা নিরবচ্ছিন্ন রাখার অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবার বিদ্যুতের ঘাটতি এতটাই বেড়েছে যে এসব এলাকাতেও দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু দিনের বেলাই নয়, সন্ধ্যা ও রাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এতে পানির পাম্প, ফ্রিজ, ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অনলাইনে কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
রাজধানীর অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ইস্কাটন, বারিধারা, বসুন্ধরা ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন অংশেও কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এসব এলাকায় আগে সাধারণত লোডশেডিংয়ের চাপ কম থাকলেও এবার দিনে তিন-চারবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে মিরপুর, মগবাজার, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, আজিমপুর, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
ধানমন্ডির ৭/১ নম্বর রোডের বাসিন্দা মাহীন সরকার বলেন, ‘আগে এখানে লোডশেডিং খুব একটা হতো না। এখন দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখনও আধা ঘণ্টা, তারও বেশি সময় থাকছে না। গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে।’
গুলশান ১-এর বাসিন্দা ফাওজিয়া কবির একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে এখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে পড়ছে না। এখন দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। জেনারেটর ও আইপিএস দুটি চালিয়েও পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।’
বনানীতে বসবাসকারী তানিম চৌধুরী বলেন, আগে লোডশেডিংয়ের কথা তেমন ভাবতেই হতো না। এখন দিনের মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাসায় কাজ করা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানো–সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে।
বারিধারায় বসবাসকারী ঐশী হক এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাওন চৌধুরীও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের বাসিন্দা শাকিল হাসান বলেন, দিনে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গরমে বাসায় থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে গত মাস থেকে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করা হচ্ছিল। কয়েক দিন ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে বৈদ্যুতিক চুলাও ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।
মিরপুর শেওড়াপাড়া নিবাসী আয়েশা খাতুন বলেন, রোববার সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঁচবার বিদ্যুৎ গেছে। কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন যাবে তার কোনো ঠিক নেই। গরমে রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না, বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শামসুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। রান্না, পড়াশোনা, ঘরের কাজ– সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে। রাতের লোডশেডিংয়ে গরমে শিশুরা ঘুমাতে পারছে না।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ খাত
বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস। তবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। পেট্রোবাংলার গতকাল সন্ধ্যা ৬টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬১ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়লা সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে। পায়রা, আদানি ও মাতারবাড়ীর মতো বড় কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গরমে চাহিদা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। সংকট সামাল দিতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর ‘মান নিয়ে প্রশ্ন, তবু বেড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষকসংকট, পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব, স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, সনদ বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অনিয়মের কারণে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। তারপরও একে একে বেড়ে ১১৭টিতে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। এর মধ্যে হাতেগোনা ১৫টির মতো ভালো করছে। বাকিগুলো চলছে খুঁড়িয়ে, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের কাঁধে ভর দিয়ে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা সার্বক্ষণিক শিক্ষকদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। এসব বিশ্ববিদ্যালয় যেসব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে তাদের বেশির ভাগের মধ্যে শিখন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এবং কর্মবাজারে সাফল্যের দেখা পাচ্ছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে এ শিখন ঘাটতি অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, যেগুলোর অবস্থা বেশি নাজুক। সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট ‘ইকো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ইইউএসটি) ঠাকুরগাঁও নামক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আরো ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে প্রশাসনিক নেতৃত্বের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই। অবশ্য ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে ১ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ চলে আসছে একযুগের বেশি সময় ধরে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি বড় অনিয়ম হিসেবে আলোচিত। বর্তমানে ৮৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোভিসি এবং ৪০টিতে ট্রেজারার পদ শূন্য। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানেই ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম। এছাড়া আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাস যেতে পারেনি ৫৪ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তারা ভাড়া করা ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মাত্র ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী সনদ পেয়েছে। অর্থাৎ ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো স্থায়ী সনদ ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমে সাময়িক অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে স্থায়ী সনদ নেওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান সেই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
নানামুখী সংকটের সুযোগে বাড়ছে অনিয়ম: এদিকে নানামুখী সংকটের সুযোগে একশ্রেণির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সনদ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, ভর্তি, শ্রেণিকক্ষে পাঠ ও পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। টাকা দিলেই মিলছে স্নাতক, সম্মান ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সনদ। কখনো শিক্ষার্থীরা কাগজে-কলমে ভর্তি হয়ে টাকা দিলে রাতারাতিই উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি পাচ্ছেন। বলতে গেলে ‘এক হাতে টাকা তো অন্য হাতে সনদ’ ধরিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এভাবে একশ্রেণির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। আর না জেনে প্রতারিত হচ্ছেন অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড বন্ধের সুপারিশ হয়, পরিকল্পনাও হয়, কিন্তু শেষমেশ কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাসহ দেশ জুড়ে রয়েছে অসংখ্য দালাল। এরা নানাভাবে সনদ ক্রেতা নিয়ে আসেন। বিনিময়ে বিশেষ কমিশন পান। এছাড়া একশ্রেণির শিক্ষকও সনদ বিক্রির দালালি করেন বলে অভিযোগ আছে। ২০১৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ‘টাকা দিলে মেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা পাশের সনদ। শুধু তা-ই নয়, এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজেই পদে পদে অর্থের অবৈধ লেনদেন হয়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন অনুমোদনের জন্যই এক কোটি থেকে তিন কোটি টাকা লেনদেন হয়।’
লাল-তারকা সতর্কতায় আট বিশ্ববিদ্যালয়: দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক জটিলতা ও মানদণ্ড ঘাটতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে লাল তারকা চিহ্নিত তালিকা ও পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। বিশেষ করে ভর্তি মৌসুমে এসব তালিকা হালনাগাদ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। ইউজিসির পর্যবেক্ষণ তালিকায় এক তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া ভবন বা ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার) নেই। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রো-ভিসি) পদও শূন্য রয়েছে। দুই তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং কুইন্স ইউনিভার্সিটি। ইউজিসি জানায়, কুইন্স ইউনিভার্সিটি ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন পেলেও নির্ধারিত এক বছরের মধ্যে সব শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তিতে সতর্কতা জারি করে ইউজিসি। সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে আচার্য কর্তৃক নিয়োগ করা উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ না থাকা, নিয়োগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনোনীত অডিট ফার্ম দ্বারা অডিট না হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠনে জটিলতা ও মামলাও চলমান থাকায় এই সতর্কতা দেয় কমিশন। তবে গত ২ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মো. আমানউল্ল্যাহ ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মেজর জেনারেল সাহেদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউজিসির সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যবেক্ষণে থাকা তিন তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা এবং আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক, আইনি ও একাডেমিক বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
নতুন ভর্তি বন্ধ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে: ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি এবং গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সব প্রোগ্রামে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রয়েছে। কমিশনের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ইউজিসি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় দুটির বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত অভিযোগ, ওয়েবসাইট ডোমেইন পরিবর্তন, অবকাঠামো এবং সার্বিক প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ভর্তি বন্ধ থাকবে। তবে আগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে।
অনুমোদন পেয়েও শুরু হয়নি শিক্ষা কার্যক্রম: সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, অনুমোদনের সাত বছরের মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হয়। তবে সেই সময়সীমা অতিক্রম করেও ২০১৬ সালে অনুমোদন পাওয়া রূপায়ণ এ. কে. এম. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০১৮ সালে অনুমোদন পাওয়া শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি এখনো একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এছাড়া ২০২০ সালের ১৬ জুন অনুমোদন পাওয়া মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর ক্ষেত্রেও কার্যক্রম শুরুর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পথে। ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে একাধিকবার তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে অনুমোদন পাওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল কাগজে-কলমেই রয়েছে; শিক্ষার্থী ভর্তি বা একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
বণিক বার্তা
‘যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা ও সেবা বাড়ালেও বড় বাধা এক রানওয়ে, অপ্রতুল পার্কিং’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে।
একই সঙ্গে বাড়বে ফ্লাইটের চাপ। কিন্তু একটি মাত্র রানওয়ে ও সীমিত পার্কিং সক্ষমতার কারণে নতুন টার্মিনালের বাড়তি সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বর্তমানে রানওয়ে ব্যস্ত থাকায় উড্ডয়নের আগে ৩০-৪০ মিনিট এবং অবতরণের আগে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত উড়োজাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টার্মিনাল চালুর পর ফ্লাইট সংখ্যা বাড়লে এ সংকট আরো তীব্র হতে পারে। সেক্ষেত্রে শাহজালাল বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন টার্মিনাল হলেও উড়োজাহাজ পার্কিং সুবিধায় এ অঞ্চলের অন্য বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে থাকছে ঢাকা।
ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (দিল্লি) কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, সেখানে ২১০টি ফিজিক্যাল বে রয়েছে। পাশাপাশি ‘মাল্টিপল অ্যাপ্রন রÅvম্প সিস্টেম’-এর দুটি কোড-সি স্ট্যান্ডসহ মোট স্ট্যান্ডের সংখ্যা ২৪০। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১১১টি কন্টাক্ট ও ৭৮টি রিমোট স্ট্যান্ড রয়েছে। সম্প্রসারণকাজ শেষ হলে এ সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে ১২০টি পার্কিং বে থাকার পরও থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের ওপর চাপ রয়েছে। বড় উড়োজাহাজের নির্ধারিত স্ট্যান্ড ও অ্যাপ্রন সংস্কারসহ বিভিন্ন কারণে সেখানে পার্কিং ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এর বিপরীতে শাহজালাল বিমানবন্দরে বর্তমানে উড়োজাহাজ পার্কিং বে রয়েছে ২১টি। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে আরো ৩৭টি পার্কিং বে যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে পার্কিং বের সংখ্যা হবে ৫৮।
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং বাকিগুলো ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে আসার কথা। এয়ারবাসও বিমানকে ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাব দিয়েছে, যা সংস্থাটি বর্তমানে মূল্যায়ন করছে।
পরিকল্পনাধীন এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকায় সেগুলো পার্কিংয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজগুলোর হ্যাঙ্গার ও পার্কিংয়ের জন্য আমাদের এখানে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরো হ্যাঙ্গার তৈরি ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।’
বেসরকারি খাতের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২০২৭ সালের মধ্যে বোয়িং থেকে ২১টি উড়োজাহাজ ভাড়ায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে এয়ারলাইনসটির বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। ঢাকাকে প্রধান হাব হিসেবে ব্যবহার করছে ইউএস-বাংলা। এছাড়া নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইটগুলোও শাহজালাল বিমানবন্দরকেন্দ্রিক। অন্যদিকে ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০টি বিদেশী এয়ারলাইনস নিয়মিত যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে শাহজালালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, শাহজালালে দৈনিক উড়োজাহাজ চলাচল ২০২৫ সালে ৩৮১টি, ২০৩০ সালে ৪৫১টি এবং ২০৩৫ সালে ৫৪৮টিতে দাঁড়াতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং সক্ষমতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, থার্ড টার্মিনাল অ্যাপ্রনে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও এটিকে পুরো বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তবে কতটি উড়োজাহাজ পরিচালনা করা যাবে, তা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রন, পার্কিং ও উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ের ওপর নির্ভর করবে।
এ বিমানবন্দরের রানওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পার্কিং সংকট মোকাবেলায় ব্যবস্থাপনার ওপরও জোর দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন এয়ারএশিয়া ও কুয়েত এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের (টাস গ্রুপ) চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমিয়ে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও স্লট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে শক্তিশালী ট্রানজিট সেন্টারে রূপান্তর করা সম্ভব। পাশাপাশি রাতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো চট্টগ্রাম বা সিলেটে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করলে ঢাকার পার্কিং সংকট অনেকটাই দূর হবে।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার খবর ‘পথ চলতে ছিনতাইয়ের ভয়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার পথচলতি মানুষের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে ছিনতাই। নগরের ছিনতাইপ্রবণ বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও ছিনতাই হচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন সড়কে গত শনিবার প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন নিহত হওয়ার ঘটনা ছিনতাইকারীদের বেপরোয়াভাবকেই সামনে এনেছে। তবে মামলার সংখ্যায় নগরের ছিনতাই পরিস্থিতি বোঝার উপায় নেই।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে জুলাই) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে মাত্র ১৮৯টি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত বা আহত না হলে কিংবা বড় অঙ্কের টাকা ছিনতাই না হলে ভুক্তভোগীরা হয়রানি, ঝামেলার ভয়ে অভিযোগ নিয়ে থানায় যান না। কেউ কেউ ছিনতাই মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এদিকে একের পর এক ছিনতাই এবং শনিবারের ঘটনার পর পুলিশের টহল ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, সারা দেশে তালিকা অনুযায়ী ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে টহল জোরদার করতে বলা হয়েছে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারির কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে সারা দেশে ১ হাজার ৬৭টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ও ডিএমপি এলাকায় মামলা হয়েছে ৪৪৩টি। অর্থাৎ সারা দেশে মোট ছিনতাই মামলার প্রায় ৪১.৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগে। ঢাকা বিভাগের মোট মামলার ১৮৯টিই ডিএমপি এলাকায়।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে শনিবার ভোরে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা স্বামীর সঙ্গে রিকশায় থাকা বগুড়ার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের হাতব্যাগ ধরে টান দেয়। হ্যাঁচকা টানে তিনি রিকশা থেকে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নিলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ওই প্রধান শিক্ষক চোখের চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন এবং বাস থেকে নেমে রিকশায় করে ফার্মগেটে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। নিহত শিক্ষিকার স্বামী আব্দুল মতিন শনিবার মর্গের সামনে বলেন, সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা সংসদ ভবনের সামনে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা তাঁর ধারণাতেই ছিল না।
র্যাব গতকাল রোববার ওই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। এর আগে ১০ আগস্ট উত্তরায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে ডিএল পেট্রলপাম্পের কর্মীদের বহন করা গাড়ি থামিয়ে ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় ডিবি ও র্যাব অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
বিভিন্ন এলাকায় পথচলতি মানুষের টাকা, মোবাইল ও মালামাল ছিনতাই হচ্ছে হরহামেশা। নারীরাও ছিনতাইকারীদের টার্গেট। বাংলাদেশ পুলিশের মাসভিত্তিক অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সারা দেশে দস্যুতার মামলা ছিল ১৬৩টি। ফেব্রুয়ারিতে ১৩৪টি, মার্চে ১৪২, এপ্রিলে ১৫২, মে মাসে ১৬৭, জুনে ১৪৯ এবং জুলাইয়ে ১৬০টি মামলা হয়েছে।
পুলিশের হিসাব বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০৯টি ছিনতাই মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। রাজশাহীতে ১২০, খুলনায় ১০২, সিলেটে ৬৬, রংপুরে ৪৩, ময়মনসিংহে ৩৩ এবং বরিশালে ৩০টি ছিনতাই মামলা হয়েছে। রেলওয়ে এলাকায় হয়েছে ২১টি।
ডিএমপির সদর দপ্তর জানায়, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডিএমপির ৫০ থানায় ১৮৯টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ ডিএমপি এলাকা ছাড়া ঢাকা বিভাগে ২২৫টি ছিনতাই মামলা হয়েছে।
পুলিশের সূত্র বলছে, জনসংখ্যার ঘনত্ব, বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, নগদ অর্থের লেনদেন, যানজট, রাত ও ভোরের নির্জন সড়ক এবং অপরাধীদের দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ—এসব কারণে রাজধানীতে ছিনতাই বেশি হচ্ছে। পাশাপাশি ভোর ও রাতে কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত আলো, নজরদারি ও টহলের ঘাটতিও এই অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে কিছুদিন পর তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার পুরোনো অপরাধে জড়াচ্ছে।
দেশ রূপান্তর
‘নীতিমালা ছাড়াই উপাচার্য ডুবছে বিশ্ববিদ্যালয়’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বাস্তবে। বরং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের ঘটনা ঘটছে আগের মতোই। অভিজ্ঞতার পরিবর্তে প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুগত্য। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত শিক্ষকদেরও উপাচার্য পদে আসীন হতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সার্চ কমিটি গঠন করা হলেও তা ছিল কাগজে। বাস্তবে যা হয়েছে তা হলো কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। একই অবস্থা বর্তমান সরকারের আমলেও। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সার্চ কমিটি পুনর্গঠন হওয়া ছাড়া বিশেষ কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে কারা ভিসি হচ্ছেন, তাদের যোগ্যতা কী তা নিয়ে চলছে নানামুখী বিতর্ক।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের টানা ২৮ দিনের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানি ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে অব্যাহতি পাওয়া অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানি ও অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদকে পরে পুরস্কার দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অধ্যাপক ড. মামুন অব্যাহতি পেয়েছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই তাকে উপাচার্য বানানো হয়েছে।
একইভাবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্য হিসেবে চলতি বছরের ২৪ মার্চ নিয়োগ পান অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ। তাকেও এর আগের বছরের ২৪ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও অনশনের মুখে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে আবার উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকেও উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বিভাগীয় প্রধান থাকা অবস্থায় অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে অনাস্থা জানিয়েছিলেন ২১ জন শিক্ষক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭২-এর অধ্যাদেশের আওতায় থাকা চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, এমনকি যোগ্যতার কোনো মাপকাঠিও নেই। কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে স্বনামধন্য শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। অথচ সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট নন, এমন শিক্ষকরা নিয়োগ পেয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তন করে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল অথবা ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সদস্য।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে সম্পূর্ণ অযোগ্য ও অথর্ব লোকদের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মান ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগপ্রাপ্তদের থেকেও খারাপ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় বড় প্রজেক্ট থেকে লুটপাট করতে অযোগ্য ও অথর্ব লোকদের ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি চক্র কাজ করছে। অথচ আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ করবে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি তার দলের লোকদের ভিসি বানাবে এ নিয়ে আপত্তি নেই। বিএনপিতে অনেক যোগ্য ও দক্ষ লোক আছেন, তাদের নিয়োগ দিলে আমরা বাহবা দিতাম। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্যদের মনোনয়ন ব্যথিত করে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভালো হলেই যে ভালো প্রশাসক হবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে একজন অধ্যাপককে উপাচার্য করার পর রাতারাতি তার দায়িত্বের পরিধি বদলে যায়। এতদিন যেখানে তার প্রধান কাজ ছিল পাঠদান, গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম, উপাচার্য হওয়ার পর তাকেই সামলাতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, অর্থ, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ, কেনাকাটা, টেন্ডার, আইনগত বিষয়, অ্যাকাডেমিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো। সাধারণত দেখা যায়, উপাচার্যের মতো বিশাল দায়িত্ব নেওয়ার আগে একজন শিক্ষককে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি আর্থিক বিধি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোনো প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। এতে করে তৈরি হয় নানামুখী সংকট।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালন করলেও প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে বসার জন্য আলাদা দক্ষতা প্রয়োজন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকেন। থাকে শত শত কোটি টাকার বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা। একজন নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে আগে থেকে কাজ করা কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, হিসাব শাখা, রেজিস্ট্রার দপ্তর কিংবা দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করেন। এই নির্ভরশীলতা স্বাভাবিক হলেও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বর্তমানে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক অধ্যাপক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর আগে আমার বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার কেনাকাটার জন্য পিপিআর সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, আর্থিক বড় কোনো কেনাকাটার অভিজ্ঞতা নেই। শিক্ষক হিসেবে আমার ছোট ছোট প্রজেক্ট সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু এখন তো বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝখানে পড়েছি। আমার মনে হয়, উপাচার্যদের একটি পোল করে তিন মাস বা ছয় মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো উচিত। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় সামলাতে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।’
একজন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের জটিল প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। কোন ফাইল কোথায় আটকে থাকে, কোন প্রকল্পের কী অবস্থা, কোন নিয়োগ প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বিধি কী বলছে এসব বুঝতে তাকে সহায়তা করতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘রাজত্বের হাতবদল জঙ্গল সলিমপুরে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাঠে নেই অপরাধ জগতের পরিচিত সেই সব সম্রাট। তারপরও টিকে আছে তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য। চট্টগ্রামের অপরাধের আখড়া খ্যাত জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ‘সফল’ অভিযানের পরের চিত্র এটি। জঙ্গল সলিমপুরের গডফাদার ইয়াসিন, মশিউর কিংবা রোকনরা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের সাজানো ছকেই চলছে পাহাড়ের অন্ধকার জগতের রাজত্ব। শুধু নেতৃত্বের স্তর পরিবর্তন করে সামনে আনা হয়েছে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারির সন্ত্রাসীদের। গডফাদারদের আড়ালে থাকার সুযোগে নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে অন্তত ১২টি ভয়ংকর গ্যাং। পুরোনো গ্যাংদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন করে গজিয়ে ওঠা গ্যাংগুলোর কাছে জিম্মি এখন জঙ্গল সলিমপুরের ৩০ হাজার পরিবার। তাদের সামনে রেখে অবৈধ বিদ্যুৎ, পানি বাণিজ্য আর খাসজমি বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছে। জঙ্গল সলিমপুরের অলিগলি ঘুরে মিলেছে অপরাধীদের এমন নতুন ছক ও উত্থানের চাঞ্চল্যকর তথ্য। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) নাজমুল হাসান বলেন, ‘মার্চের অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। টানা অভিযানের মুখে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীগুলো গা ঢাকা দিয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীরা যাতে সক্রিয় হতে না পারে সেদিকে নজর রাখছে প্রশাসন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। নতুন কোনো বাহিনী কিংবা সন্ত্রাসী গজিয়ে উঠে যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেদিকেও নজর রয়েছে আমাদের। যদি কেউ এ ধরনের চেষ্টা করে তাহলে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সন্ত্রাসীদের এক কৌশলকে ‘অপরাধ রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতেই নেতৃত্বের পরিবর্তন সন্ত্রাসীদের এক ধরনের কৌশল। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে দুর্ধর্ষ অপরাধী বাহিনীগুলো। জঙ্গল সলিমপুরের ক্ষেত্রেও অভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে।’
জঙ্গল সলিমপুর সরেজমিন পরিদর্শনে কথা হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি আলাপ হওয়া ব্যক্তিদের কেউ। তারা জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর সদস্যরা কিছু দিন গা ঢাকা দেওয়ার পর আবার সক্রিয় হয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আড়ালে থেকে নিজনিজ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ চোখে জঙ্গল সলিমপুরের আইনশঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরের চিত্রটা ঠিক আগের মতোই। চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ সব ধরনের অপরাধ চলছে আগের মতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাসোহারার পরিমাণ বেড়েছে।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ মুখে রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তল্লাশি চৌকি। ভিতরে স্থাপন করা হয়েছে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প। গত মার্চে যৌথ বাহিনীর স্মরণকালের বৃহৎ সাঁড়াশি অভিযান এবং ক্যাম্প স্থাপনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, চট্টগ্রামের কুখ্যাত এই ‘অপরাধ সাম্রাজ্যের’ বুঝি চিরতরে পতন ঘটেছে। কিন্তু পাহাড়ের গহিনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ভিন্ন গল্প।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের পতন হয়নি, কেবল ‘খোলস’ আর ‘রাজত্বের হাতবদল’ হয়েছে। শীর্ষ গডফাদাররা আত্মগোপনে থাকলেও পরিবর্তন এনেছে তাদের কৌশলের। তৃতীয় সারির ক্যাডারদের দিয়ে তারা নাড়ছেন অন্ধকার জগতের কলকাঠি। বাহিনীগুলোর প্রধানরা নেপথ্যে থেকে তৃতীয় স্তরের বাহিনী নিয়ে পরিচালনা করছে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে। কৌশল পরিবর্তন করা সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো এর মধ্যে রয়েছে- জঙ্গল সলিমপুরের অঘোষিত সম্রাট ও ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি’র নিয়ন্ত্রক ইয়াসিন মিয়া, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল (সমন্বয়) সংগ্রাম পরিষদ’ নিয়ন্ত্রক শীর্ষ সন্ত্রাসী কাজী মশিউর রহমান এবং ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি’র নিয়ন্ত্রক রোকন উদ্দিন মেম্বার। এ তিন বাহিনীর প্রধান আত্মগোপনে থেকে তৃতীয় স্তর দিয়ে বাহিনী পরিচালনা করছে। লাল বাদশা বাহিনী, ফারুক বাহিনী, গফুর মেম্বার বাহিনী, গাজী সাদেক বাহিনীর প্রধানরাও রয়েছে আড়ালে। তারা দ্বিতীয় স্তরের সদস্যদের দিয়ে পরিচালনা করছে নিজনিজ বাহিনী। কয়েক বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর জঙ্গল সলিমপুরে সম্প্রতি সক্রিয় হয়েছে আলোচিত দুই বাহিনী গিট্টু জাহাঙ্গীর বাহিনী, সিঙ্গাপুর নাছির বাহিনী। চলতি বছরের মার্চের পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরে পুরোনো রূপে ফিরেছে এ দুই বাহিনী। জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ বাহিনীর আড়ালের সুযোগে নতুন করে গজিয়ে উঠেছে আরও অন্তত ১২টি নতুন গ্যাং। তারা সক্রিয় বাহিনীগুলোর পদানুসরণ করে বিস্তার করছে প্রভাব। এ বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে- লুৎফর বাহিনী, নয়ন বাহিনী, হানিফ বাহিনী, শাকিল বাহিনী, বার্মা সায়েম বাহিনী, ডা. ইমন বাহিনী, রুমেল বাহিনী, বড় রাজু বাহিনী, বোমা রাজু বাহিনী, আর্মি শফিক বাহিনী। এ অপরাধ আখড়ায় পুরোনো বাহিনীগুলোর নেতৃত্বে চলছে সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বিক্রি বাণিজ্য, এলাকার উন্নয়নের নামে ঘরপ্রতি মাসোহারা গ্রহণ, কথিত বিচারের নামে চাঁদাবাজিসহ বড় ধরনের অপরাধ। চলতি বছরের মার্চের পর গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে অবৈধ বিদ্যুৎ এবং পানির ব্যবসা। জঙ্গল সলিমপুরের প্রায় ২৫-৩০ হাজার পরিবারকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২টি মিটারের মাধ্যমে। এর মধ্যে তিনটি মিটারই হচ্ছে ‘পলাতক’ ইয়াসিন মিয়ার নামে। তার আত্মগোপনের পর বিদ্যুৎতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন লুৎফর বাহিনী, আর্মি শফিক বাহিনী, হানিফ বাহিনী, নোয়াখালী আবসার বাহিনী। তাদের সঙ্গে রয়েছে এমদাদ, সাত্তার, শরীফ, সরওয়ার, নয়ন, তাজুসহ কয়েকজন উঠতি সন্ত্রাসী বাহিনী। এ বাহিনীগুলো প্রতি পরিবার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে এককালীন নিচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা। সার্ভিস চার্জ হিসেবে পরিবারপ্রতি নেওয়া হচ্ছে মাসিক ২ হাজার টাকা এবং সাইট মিটারপ্রতি ১ হাজার টাকা। এর বাইরে সাধারণ ঘরপ্রতি ইউনিট বিদ্যুতের টাকা আদায় করা হচ্ছে ১২ টাকা এবং দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইউনিটপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। জঙ্গল সলিমপুরের পানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে করছে নতুন করে গজিয়ে ওঠা গ্যাংগুলো। সলিমপুরের ১১টি সমাজে রয়েছে অন্তত ছোট-বড় ১২০টি পানি বিক্রির সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিচরণ রয়েছে আর্মি শফিক বাহিনী, নাজমা, নাজিম, সুমন, সাত্তার, মুজিব এবং কুদ্দুস। তারা পানির চার্জ বাবদ ছোট পরিবারগুলো থেকে নেয় মাসিক ৬০০ টাকা। বড় পরিবারগুলো থেকে ৮০০ টাকা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে রকম ভেদে নেয় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে যৌথ বাহিনী। এটা আমাদের বড় সাফল্য। এখানে আর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।’
