নেপাল ট্র্যাজেডি

উদ্বিগ্ন স্বজনদের অপেক্ষার শেষ কবে?

ফন্ট সাইজ:

হিমালয়ে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ কাদাধসের পর নেপাল ও চীনে নিখোঁজ হাজারো মানুষকে উদ্ধারে রোববার জোর তৎপরতা শুরু করেছে উদ্ধারকারী দল। প্রতিকূল আবহাওয়া ও নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার সকাল পর্যন্ত দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ ছাড়িয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের উভয় পাশে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বুধবার বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীপথ দিয়ে নেমে এসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। রেডক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। চীন জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এই দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে এই কাদাধসকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে ভয়াবহ আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযান নজিরবিহীন মাত্রার কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ। ৭ হাজার ৫১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে চীনের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ। চীন জানিয়েছে, তিব্বতে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত প্রবেশপথের কাছে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

হিমালয়ের দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে উদ্ধার অভিযান আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, নতুন করে বৃষ্টিপাতের পর ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার থেকে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগের কারণে তৈরি একটি হ্রদ থেকে নতুন বন্যার আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়। হ্রদটির পানি উপচে নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবেশ করতে শুরু করে। সিসিটিভি জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে নিচের দিকে হুমকি তৈরি করা হ্রদটির পানি অনেকটাই কমে যায়। তবে শনিবার রাতে ড্রোনে হ্রদটির প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটির দিকে নতুন একটি ভূমিধস শনাক্ত হয়। এতে আবারো একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়ে নতুন জলাধার সৃষ্টি হয়েছে।

নেপালে এখন উদ্ধার তৎপরতার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর টানেলে আটকে থাকা বলে ধারণা করা শত শত মানুষের সন্ধানে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, টানেল থেকে উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা, মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত ব্যবস্থা এবং পচে যাওয়া মৃতদেহের ফরেনসিক শনাক্তকরণসহ বিশেষায়িত বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। তিনি জানান, ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে টানেল খুলতে এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করছেন।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে দিনের পর দিন ঘুরছেন পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্যেই পচন শুরু হওয়া শত শত পরিচয়হীন মরদেহ গণদাফন শুরু করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। দুর্যোগের সরাসরি আঘাত থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পাওয়া চিতওয়ান জেলায় বন্যাকবলিত রাসুয়া অঞ্চল থেকে ভেসে আসা মরদেহ নদীর স্রোতে নারায়ণী নদীতে গিয়ে পৌঁছেছে। কর্তৃপক্ষ মরদেহগুলোর ছবি তুলছে, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে এবং শনাক্তকরণ সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করছে। এর উদ্দেশ্য হলো দাফনের পরও যেন ভবিষ্যতে স্বজনরা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রিয়জনকে শনাক্ত করতে পারেন। পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা বলেন, উদ্ধার করা মরদেহগুলোর অর্ধেকের বেশি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, অনেক মরদেহের মুখ আর দৃশ্যমান নেই। কোথাও শুধু হাত বা পা পাওয়া গেছে, আবার কোথাও শরীরের কেবল কিছু অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাথার অর্ধেকেরও বেশি অংশ নেই। শনিবার ১০০টির বেশি পরিচয়হীন মরদেহ দাফনের পর রোববার আরও শত শত মরদেহের জন্য নতুন কবর খোঁড়া হচ্ছিল।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতার কারণে এই বন্যা ও কাদাধসের সূত্রপাত হয়েছে। এটিকে তিব্বত মালভূমিতে ক্রায়োস্ফিয়ার বা বরফমণ্ডলীয় দুর্যোগের একটি নতুন ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। চীনা বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপালের দিক থেকে নেমে আসা কাদাধস মাত্র ছয় থেকে সাত মিনিটের মধ্যে গিরং সীমান্ত চৌকিতে পৌঁছে যায়। বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া নজরদারি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা গেছে, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত ভবনগুলোকে গ্রাস করছে এবং মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, দেশটি ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে এবং ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতায় অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি সামনের সারির উদ্ধারকারীদের জন্য বিমান থেকে সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী ফেলা হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারাও জীবন শনাক্তকারী বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করছে।