সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ, এই নৈরাজ্য রুখতে হবে

সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ, এই নৈরাজ্য রুখতে হবে

ফন্ট সাইজ:

নাটক, গান, সিনেমা, চিত্রকলা, খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- কোনো একটি গোষ্ঠীর পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে এগুলো বন্ধ করে দেয়ার অধিকার কারও নেই। অথচ সামপ্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে এমন এক বিপজ্জনক 
প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে, যেখানে কিছু সংঘবদ্ধ মানুষ ব্যানার, স্লোগান ও হুমকির ভাষা নিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার দাবি তুলছে। কখনো শিল্পী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আপত্তি, কখনো ভয়ভীতি, এমনকি কোথাও কোথাও হামলার হুমকিও দেয়া হচ্ছে।

এটি নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনা নয়; এর মধ্যে সংস্কৃতির স্বাধীনতার ওপর জবরদস্তি প্রতিষ্ঠার একটি গভীরতর প্রবণতা রয়েছে। মতের বিরোধিতা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ভিন্নমতকে দমন করতে ভয় দেখানো, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়া গণতান্ত্রিক আচরণ নয়। এটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিবাদ নয়-এটি নৈরাজ্যের রাজনীতি।

গণতান্ত্রিক সমাজে আপনি গান শুনবেন না, নাটক দেখবেন না, কোনো সিনেমা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পছন্দ করবেন না-এগুলো আপনার অধিকার। আপনি সমালোচনা করতে পারেন, বর্জন করতে পারেন, যুক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন। কিন্তু অন্য কেউ সেটি করবে-এই অধিকার আপনি কেড়ে নিতে পারেন না।

এখানেই গণতন্ত্র ও জবরদস্তির মৌলিক পার্থক্য।
গণতন্ত্র শুধু নিজের স্বাধীনতা ভোগের অধিকার দেয় না; অন্যের স্বাধীনতাকে স্বীকার করার নৈতিক বাধ্যবাধকতাও সৃষ্টি করে। আমার যে অধিকার আছে, আপনারও সেই অধিকার আছে। আমার পছন্দ যেমন বৈধ, আপনার ভিন্ন পছন্দও তেমনি বৈধ। এই পারস্পরিক স্বীকৃতিই সভ্য সমাজের ভিত্তি।

যারা নিজেদের রুচি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, নৈতিক ধারণা কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে সমাজের ওপর একমাত্র সত্য হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায়, তারা মূলত বহুত্ববাদী সমাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ব্যক্তিগত কূপমণ্ডূকতা কোনো সামাজিক আইন হতে পারে না। চিন্তার দারিদ্র্য কোনো রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। একজনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে কোটি মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোনো নৈতিক বা গণতান্ত্রিক অধিকার নেই।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো-রাষ্ট্র যদি এই প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেয় কিংবা নীরবে সহ্য করে, তাহলে নৈরাজ্য ধীরে ধীরে সামাজিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়।

আজ তারা বলবে-এই গান বন্ধ করো। কাল বলবে-ওই নাটক চলবে না। পরশু বলবে-এই সিনেমা প্রদর্শন করা যাবে না। এরপর তারা সিদ্ধান্ত দিতে চাইবে-কী লেখা যাবে, কী বলা যাবে, কী গাওয়া যাবে, কী আঁকা যাবে, কী পড়া যাবে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে মানুষকে চিন্তা করতে হবে।
এখানেই বিপদের চূড়ান্ত রূপ।
সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কখনো শুধু সংস্কৃতির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে মানুষের কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করা; কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে চিন্তার পরিসর সংকুচিত করা; আর চিন্তার পরিসর সংকুচিত করা মানে নাগরিক স্বাধীনতার ভিত্তিকে দুর্বল করা।
যে সমাজে শিল্পী গান গাওয়ার আগে ভয় পায়, নাট্যকার নাটক লেখার আগে আতঙ্কিত হয়, চলচ্চিত্র নির্মাতা সম্ভাব্য হামলার হিসাব করে এবং দর্শক কোনো অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে-সেই সমাজকে মুক্ত সমাজ বলা যায় না।

সংস্কৃতির ওপর ভয়ের ছায়া বিস্তার করা মানে সমাজের ওপর অন্ধকার বিস্তার করা।
কিন্তু এই সংকটকে শুধু সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বিচ্ছিন্ন প্রশ্ন হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মদান এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
এই ভূখণ্ডের মানুষ রক্ত দিয়েছে শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্য নয়; মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য। সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামে মানুষ জীবন দিয়েছে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রের স্বপ্নে। সামপ্রতিক গণ-অভ্যুত্থানেও মানুষ রক্ত দিয়েছে অন্যায়, কর্তৃত্ববাদ, ভয় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায়।

সেই আত্মদান কোনো গোষ্ঠী, মতাদর্শ কিংবা বিশেষ ব্যাখ্যার একক সম্পত্তি নয়। জনগণের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার উত্তরাধিকার কোনো গোষ্ঠী নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না।
গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষের স্বাধীনতা প্রসারিত করা-সংকুচিত করা নয়; নাগরিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা-নাগরিককে ভীত করা নয়; জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা-গোষ্ঠীগত জবরদস্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা নয়; বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণ করা-একটি নির্দিষ্ট রুচি, ব্যাখ্যা বা মতকে সমগ্র সমাজের ওপর আরোপ করা নয়।
অতএব, জনগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে যারা সংকীর্ণতা, অসহিষ্ণুতা ও জবরদস্তির দিকে ঠেলে দিতে চায়, তারা শুধু সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়-জনগণের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।
ইতিহাসের চাকা সামনে এগোয় মানুষের স্বাধীনতার বিস্তারের মধ্যদিয়ে; পেছনে ঘোরে যখন মানুষকে আবার ভয়, নিষেধাজ্ঞা ও কর্তৃত্বের অধীন করার চেষ্টা করা হয়। ইতিহাসের অগ্রযাত্রাকে পেছনের দিকে ঘোরানোর এই তুঘলকি মানসিকতা কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যায় না।

রাষ্ট্র কোনো গোষ্ঠীর মতাদর্শের নৈতিক পাহারাদার হতে পারে না। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা নয়; মানুষের স্বাধীনতার পরিসর নিরাপদ রাখা। রাষ্ট্রের কাজ কোনো গানকে পছন্দ করা নয়, বরং গান গাওয়ার অধিকারকে নিরাপদ রাখা। কোনো নাটকের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়া নয়, বরং নাটক মঞ্চস্থ করার অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার-উভয়কেই আইনের সীমার মধ্যে রক্ষা করা।
কোনো ব্যানারের আড়ালে দাঁড়িয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারও নেই। সংগঠনের নাম পরিবর্তন করলেই নৈরাজ্য বৈধ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের চোখে ব্যক্তি যেমন আইনের অধীন, তেমনি গোষ্ঠীও আইনের অধীন। আইনের শাসনের অর্থই হলো-কেউ সংখ্যায় বেশি, সংগঠিত, উচ্চকণ্ঠ কিংবা কোনো বিশেষ পরিচয়ের অধিকারী বলে আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে পারবে না।

তবে শুধু রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না। সমাজকেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ নৈরাজ্যকারীরা শক্তিশালী হয় শুধু তাদের নিজেদের শক্তিতে নয়-বৃহত্তর সমাজের নীরবতার কারণে।
আজ যে শিল্পীকে ভয় দেখানো হচ্ছে, তার পাশে দাঁড়াতে হবে। যে নাটক বন্ধ করার হুমকি দেয়া হচ্ছে, তার দর্শকের পাশে দাঁড়াতে হবে। যে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হচ্ছে, তার পাশে দাঁড়াতে হবে।
কারণ আজ যে অধিকার অন্যের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে, কাল সেই অধিকার আপনার কাছ থেকেও কেড়ে নেয়া হতে পারে। আজ যদি বলি, “ওর গান বন্ধ হোক, আমার তো ক্ষতি নেই”, কাল অন্য কেউ বলতে পারে, “ওর নাটক বন্ধ হোক, আমার তো ক্ষতি নেই।” এভাবে একদিন যখন আপনার নিজের কথা বলার পালা আসবে, তখন হয়তো বলার মতো কোনো মুক্ত পরিসরই অবশিষ্ট থাকবে না।
স্বাধীনতা কখনো খণ্ডিতভাবে রক্ষা করা যায় না। অন্যের স্বাধীনতা রক্ষা করার মধ্যদিয়েই নিজের স্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি ঐকমত্যে নয়, ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতায়। সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা নিজের পছন্দের মতকে রক্ষা করা নয়; বরং যে মত আপনার অপছন্দ, তারও শান্তিপূর্ণ অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করা।
শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র ও খেলাধুলা মানুষের সৃজনশীল সত্তাকে মুক্ত রাখে। আর মুক্ত সৃজনশীলতা ছাড়া মুক্ত নাগরিক তৈরি হয় না। নাগরিকের চিন্তা, বিবেক, মত প্রকাশ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।
সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের আত্মদান থেকে গণ-অভ্যুত্থানের আত্মদান-এই দীর্ঘ পথের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তিকে যদি আবার ভয়, নিষেধাজ্ঞা, অসহিষ্ণুতা ও গোষ্ঠীগত জবরদস্তির বেড়াজালে আবদ্ধ করা হয়, তাহলে তা হবে আত্মদানের ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

তাই সমাজকে গতিশীল রাখতে হবে, রাষ্ট্রকে আইনের শাসনের অধীনে রাখতে হবে, নাগরিকের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে এবং ভিন্নমতের জন্য নিরাপদ পরিসর তৈরি করতে হবে। কোনো গোষ্ঠী যখন জনগণের নামে জনগণের স্বাধীনতাই সংকুচিত করতে চায়, তখন তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট সামাজিক ও রাষ্ট্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
ভিন্নমত থাকবে-নিষেধাজ্ঞা নয়। সমালোচনা থাকবে-হামলা নয়। প্রতিবাদ থাকবে-জবরদস্তি নয়। বিতর্ক থাকবে-ভয়ভীতি নয়।
রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগ করতে হবে, জনগণকে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং সাংস্কৃতিক সমাজকে ভীত না হয়ে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।
কারণ একটি জাতির স্বাধীনতা শুধু তার ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; তার মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা, সৃষ্টির স্বাধীনতা এবং ভিন্নভাবে বাঁচার স্বাধীনতাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সংস্কৃতির আলো নিভে গেলে অন্ধকার শুধু মঞ্চে নামে না-অন্ধকার নেমে আসে মানুষের চিন্তায়, বিবেকে এবং সমগ্র সমাজের ভবিষ্যতের ওপর।

তাই এই লড়াই কোনো একটি অনুষ্ঠান রক্ষার লড়াই নয়। এটি মানুষের স্বাধীন সত্তা রক্ষার লড়াই। এটি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা রক্ষার লড়াই। এটি জনগণের আত্মদানের মর্যাদা রক্ষার লড়াই। এটি একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণের লড়াই।
আমাদের সামনে পথ একটাই-অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো, জবরদস্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আইনের শাসন এবং সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে একটি মুক্ত, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের অগ্রযাত্রা।

লেখক: গীতিকবি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। [email protected]