দিরাইয়ের আলীনগর গ্রামে তাণ্ডব, গ্রামছাড়া অর্ধশতাধিক পরিবার

দিরাইয়ের আলীনগর গ্রামে তাণ্ডব, গ্রামছাড়া অর্ধশতাধিক পরিবার

ফন্ট সাইজ:

খাসজমি আর আধিপত্যের বিরোধে রক্ত ঝরার পর এবার শুরু হয়েছে পাল্টা প্রতিশোধ। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের আলীনগর গ্রাম এখন কার্যত পুরুষশূন্য। সংঘর্ষে এক যুবক নিহত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের অন্তত অর্ধশত বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। হামলার ভয়ে অর্ধশতাধিক মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ও অন্য জেলায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের খাসজমি, জলমহালের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল দু’পক্ষের মধ্যে। ঘটেছে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা। মামলা রয়েছে ডজনখানেক। এই বিরোধে একপক্ষের নেতৃত্বে ভাটিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব আলী। অপরপক্ষের নেতৃত্বে রফিকুল ইসলাম।

গত ১২ই মে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হন। গুরুতর আহত হয়ে শাহাদ্বীব আলীর পক্ষের রতন মিয়া (২৭) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন ১৩ই মে সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষের সময় রফিকুল ইসলামের লোকজন শাহাদ্বীব আলীর পক্ষের অন্তত ২০টি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. সোনা মিয়া বাদী হয়ে ১৬৯ জনের বিরুদ্ধে দিরাই থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পর রফিকুল ইসলামের পক্ষের লোকজন গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়ি ছাড়লে গ্রামের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় শাহাদ্বীব আলীর হাতে। তখন থেকেই পুরুষশূন্য বাড়িগুলোতে শুরু হয় ধারাবাহিক হামলা। সরজমিন আলীনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অর্ধশতাধিক বসতঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র, দরজা-জানালা উপড়ে ফেলা, দেয়াল ভাঙা। সাবেক মহিলা ইউপি সদস্য রেনুকা বেগমের পাকা ঘরের ছাদে পাঁচটি বড় ছিদ্র। ঘরের বিভিন্ন দেয়াল ভেঙে দরজা-জানালা খুলে নেয়া হয়েছে। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিল লেপ-তোষকসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের ধ্বংসাবশেষ।

তার দেবর জামাল মিয়ার আধাপাকা ঘরটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রামের সুবেনা, রাজনা, হ্যাপী, রামনা, আমিনা, রুশনা, দুলিয়া, সিদ্দিকা ও রেহেনা বেগমসহ একাধিক নারী অভিযোগ করেন, ঘরের গরু-ছাগল, ধান, নৌকা, মাড়াই মেশিন, ফ্রিজ, আসবাবপত্র- সব নিয়ে গেছে। পরে ঘর ভেঙেছে। টাকা না দিলে ঘরও রাখে নাই। ভুক্তভোগীদের দাবি, শাহাদ্বীব মেম্বার ঘর রক্ষার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। যারা টাকা দেননি, তাদের বাড়িই ভাঙচুর হয়েছে। এমনকি টিউবওয়েল ও টয়লেটও ভাঙা হয়েছে। রফিকুল ইসলামের পক্ষের ছালেক মিয়া, হাসিদ নুর, আবুল হানিফসহ কয়েকজন জানান, হত্যা মামলায় ৩ জন জেলহাজতে, ৫ জন পলাতক। বাকিরা জামিন পেলেও নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি ফিরতে পারছেন না। বৃদ্ধ মশকুর আলী বলেন, কয়েকদিন আগে বাড়ি ফিরে বাজারে গেলে শাহাদ্বীবের লোকজন আমাকে মারধর করেছে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব আলী বলেন, একটা মার্ডার হয়েছে। উত্তেজনার বশে কিছু ঘরবাড়ি ভাঙচুর হতে পারে। তবে লুটপাটের বিষয়টি সঠিক নয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই প্রতিপক্ষ নিজেদের মালপত্র সরিয়ে নিয়েছে। দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, দিরাই থানায় যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আসামিরা তখন পলাতক ছিল। তাদের ঘর-দরজা ভাঙা ও বাড়িঘর তছনছ দেখেছি। জামিনে এসে ক্ষয়ক্ষতি ও সংঘর্ষের সময়ে তাদের লোকজন আহত হওয়ার বিষয়ে আদালতে একটি মামলা করেছেন। মামলা থানায় এলে যথাযথ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়া হবে। এদিকে, আলীনগর গ্রামে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।