প্রথম আলো
‘প্রায় সব ইউপিতে একাধিক প্রার্থী, দুশ্চিন্তা বিএনপিতে’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা আসার আগেই বিভিন্ন এলাকায় তাঁরা মাঠে নেমে পড়েছেন।
দলীয় ও মাঠপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সব জায়গায় চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একাধিক নেতা প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। কেউ কেউ এলাকায় জনসংযোগও শুরু করেছেন। কোনো কোনো ইউনিয়নে তিন–চারজন পর্যন্ত বিএনপি নেতা প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে দল-সমর্থিত একক প্রার্থী ঠিক করা এবং অন্যদের তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করাই বিএনপির সামনে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত প্রার্থী বাছাই বা নির্বাচনী কৌশল নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা তাঁরা পাননি। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের মতো করেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্য থেকে একজনকে সমর্থন দেওয়ার সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন শুরু করতে চায়। এ জন্য আগামী সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও চলতি অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে খুব দ্রুতই স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের তৎপরতা উত্তাপ ছড়াতে পারে।
এক ইউনিয়নেই নয়জন
ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে দুই দফায় চেয়ারম্যান ছিলেন জেলা বিএনপির নেতা এম এ খালেক। এবার তাঁকে ফেনী জেলা পরিষদের প্রশাসক করা হয়েছে। ফলে ইউনিয়নটিতে এবার চেয়ারম্যান পদে দলের সমর্থন পেতে বিএনপির নেতা বা সমর্থক অন্তত নয়জন আগ্রহী বা তৎপর রয়েছেন।
ওই নয়জন হলেন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মীর মোশাররফ হোসেন (মানিক), সদস্যসচিব শাহ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজামুদ্দিন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফখরুল ইসলাম (মাসুক), উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন ও ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া।
এ ছাড়া বিএনপি ঘরানার দুই প্রবাসী রহমান রাজু ও নুরুল আমিন এবং আবুল কালাম মজুমদারও চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী। রাজু ও নুরুল আমিন ইতিমধ্যে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টারও লাগিয়েছেন।
একক প্রার্থীতে জোর
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থীর ওপর জোর দিয়ে আসছেন। বিভিন্ন জেলা ও মহানগর কমিটির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং দলের ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলোয় তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলে আসছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘একক প্রার্থী’ ঠিক করতে হবে এবং সবাইকে মিলে দল-সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায়ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না করে ঐক্য বজায় রাখার জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক এমরান সালেহ প্রিন্স গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে যাঁদের জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা আছে, বিএনপি তাঁদের সমর্থন দেবে—এটাই আমাদের ঘোষিত অবস্থান।’
তবে দলটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা বলছেন, নির্বাচনের আগে একাধিক প্রার্থীকে সমঝোতায় আনতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এতে দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। তাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় করা, কাউকে বুঝিয়ে প্রার্থিতা থেকে নিবৃত্ত করা এবং শেষ পর্যন্ত একজনকে দলীয় সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিতে হবে বিএনপিকে।
নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসার আগেই একাধিক নেতা মাঠে নেমে পড়ায় শেষ পর্যন্ত সবাইকে একক প্রার্থীর পক্ষে আনা কঠিন হতে পারে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, প্রার্থিতার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মহানগর ও জেলা নেতাদের সঙ্গে যে মতবিনিময় সভা করছেন, সেখানে তিনি দলীয় ঐক্য ও একক প্রার্থীকে সমর্থনের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে দিচ্ছেন।
বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ১২টি জেলা ও মহানগর কমিটির সঙ্গে তারেক রহমান মতবিনিময় করেছেন। গতকাল শনিবার বগুড়া জেলা কমিটির সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেন।
বছরের শেষ দিকে ভোটের প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইসি বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউপির মধ্যে যেগুলো নির্বাচনের উপযোগী, প্রথম ধাপে সেগুলোতে ভোট নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সে ক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
তফসিল ও ভোটের মধ্যে গড়ে দুই মাস সময় রাখার রীতি এবং ইউপির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় রেখে সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, সিংহভাগ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। ফলে নির্বাচন আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে না দিয়ে এ বছরের মধ্যেই শুরু করতে চায় কমিশন। তবে ভোটের সময় নির্ধারণে বন্যা, দুর্গাপূজা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং আগামী বছরের রমজান, ঈদসহ বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
রমজান ও ঈদের পর গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় নির্বাচনের উপযোগী সময় আরও সংকুচিত হবে। এসব হিসাব-নিকাশে নভেম্বরের শেষ দিকে ইউপি ভোট শুরুর সম্ভাবনাই এখন সামনে রয়েছে। পরীক্ষার সময়সূচি কিছুটা এগিয়ে আনা সম্ভব হলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভোট শুরু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানিয়েছে ইসি।
ইউপি নির্বাচনই প্রথম লক্ষ্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এ জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং ইসিও প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচনের প্রথম ধাপ হিসেবে ইউপি ভোটকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে কমিশন।
নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মৌসুমও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে ভোট আয়োজনের পাশাপাশি পার্বত্য এলাকার ইউপিগুলোর নির্বাচনও একই সময়ের মধ্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ৯০ দিনের মধ্যে আয়োজনের পাশাপাশি ইউপি নির্বাচনের বিষয়টিও সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে এগোতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগকে নিয়েও হিসাব
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় নেতাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনে থাকার চেষ্টা করবেন। তাঁদের অনেকে এখন পলাতক থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় ভেতরে-ভেতরে একজন করে প্রার্থী ঠিক করে মাঠে নামতে পারেন।
এ রকম হলে তাঁদের কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়েও বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিএনপিকে বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি দলের ভেতরের একাধিক প্রার্থীর সমস্যাও সামলাতে হবে।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা নির্বাচন করবেন, তাঁরা কিন্তু মাঠে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর দল নিশ্চয়ই প্রার্থী বাছাইসহ সার্বিক বিষয়ে একটা গাইডলাইন দেবে। আমরা সেভাবেই কাজ করব। তবে এ বিষয়ে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা পাইনি।’
বিএনপির নেতারা বলছেন, দল দীর্ঘদিন দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ কারণে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে এবার নির্বাচন নিয়ে বেশ আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তবে এই আগ্রহকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সংশয়ও রয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে না পারলে নির্বাচনের আগেই স্থানীয় পর্যায়ে বিভক্তি তৈরি হতে পারে। ফলে ইসির তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে—একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীকে একজনের পক্ষে দাঁড় করানো।
আরেক খবরে বলা হয়, ‘গুম করে কীভাবে রাখা হয়েছিল, নিজের বয়ানে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’ গুমের ৬১ দিনের ভয়াবহ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে কথাগুলো বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
ভারতে উদ্ধারের পর পরিবারের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের স্মৃতিও তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। মুঠোফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী কীভাবে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন, সেই ঘটনারও স্মৃতিচারণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আজ শনিবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে নিজে গুমের শিকার হওয়ার ঘটনা নিয়ে এভাবে স্মৃতিচারণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।
আলোচনার শিরোনাম ছিল, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাঁদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সালাহউদ্দিন আহমদ রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন। তখন তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের পদে ছিলেন।
বিএনপি তখন অভিযোগ করে, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নিয়ে গেছে। এর ৬২ দিন পর ১১ মে সিলেটের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের মেঘালয়ে শিলংয়ের পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। তখন ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সালাহউদ্দিন শিলংয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় লোকজনের ফোন পেয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
বাংলাদেশে ৬১ দিন গুম
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁকে একটি ছোট কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। কক্ষটি ছিল ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের মতো। সেখানে একটি পানির কল ছিল। শৌচকার্যের জন্য ছিল একটি চিকন ছিদ্র। সেটি নালার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে তাঁর ধারণা। সেখান থেকে দুর্গন্ধ আসত।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মেঝেতে একটি কম্বল বিছানো ছিল। সেটিই ছিল শোবার জায়গা। একটি বালিশও ছিল। স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর কোনো পরিবেশ ছিল না।’
তাঁকে এক বেলা নাশতা ও দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, পানিও দেওয়া হতো; কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁর হার্টের সমস্যা ছিল।
দরজার বাইরে সব সময় একটি বৈদ্যুতিক পাখা চলত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দরজার ওপর সামান্য ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখান দিয়ে বাতাস আসত।’ সেই বাতাস না থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হতো বলে মনে করতেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, একদিন খাবার দিতে এসে তাঁর কোনো সাড়া না পেয়ে আটককারীরা দরজা খোলে। তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
চোখ বেঁধে বাংলাদেশ থেকে ভারতে
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁকে একটি গাড়িতে তোলা হয়। গাড়ির দরজা খোলার শব্দ শুনে তিনি বুঝেছিলেন, সেটি মাইক্রোবাসের মতো। কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে চলার পর একটি জায়গায় থামানো হয়।
সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করানো হয়। পরে রাত গভীর হলে আবার গাড়িতে তোলা হয়। রাস্তার অবস্থা পায়ের স্পর্শ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন তিনি। পরে জিপের মতো একটি গাড়িতে তাঁকে নেওয়া হয়। এরপর আরও একটি জায়গায় নিয়ে গিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে কিছু মানুষের কথাবার্তা শুনতে পান। দীর্ঘ সময় তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। একপর্যায়ে এক কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কামরুজ্জামান সাহেবের ( মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত) তো এক্সিকিউশন হয়ে গেছে।’ ৬১ দিন ধরে আটক থাকায় বাইরের কোনো খবর তাঁর জানা ছিল না। এ কথা শুনে ওই কর্মকর্তা অবাক হন। পরে তাঁকে খাবার দেওয়া হয়। সারা দিন কিছু না খাওয়ায় তিনি খাবার চান। তাঁকে নুডলস দেওয়া হয়। তখনো তাঁর হাত বাঁধা ছিল। হাত বাঁধা অবস্থায় চামচ দিয়ে তাঁকে খেতে হয়। প্রস্রাবের প্রয়োজন হলে অনেক কষ্টে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর তাঁকে আরও কয়েক ঘণ্টা রাখা হয়। পরে তাঁর চোখ খুলে দেওয়া হয়; কিন্তু যাঁরা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন আবার তাঁরা নিজেদের চোখ ঢেকে রাখেন, যাতে তিনি তাঁদের চিনতে না পারেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পরে আমাকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। তখন সূর্য ওঠার সময়। পাশে বড় একটি ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখানেই আমাকে রেখে যাওয়া হয়।’
‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কয়েকজন মানুষকে দেখে তিনি তাঁদের কাছে জায়গাটির পরিচয় জানতে চান। তিনি হিন্দি ও ইংরেজিতে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন; কিন্তু তাঁকে দেখে তাঁরা প্রথমে মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল মনে করেছিলেন। পরে সালাহউদ্দিন পাশের একটি বিলবোর্ড দেখে বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে আছেন। পরে তিনি স্থানীয় লোকজনদের পুলিশে খবর দেওয়ার অনুরোধ করলে কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ এসে তাঁকে নিয়ে যায়।
পুলিশ তাঁকে একটি থানায় নিয়ে যায় উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে একটি বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসককে নিজের পরিচয় ও টেলিফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধও করি।’
কিন্তু পুলিশ তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন ভেবেছিল উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এরপর তাঁকে একটি মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে একজন মনোরোগ–বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা হয়। তাঁকে নিজের টেলিফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। তাঁর ছবিও তোলা হয়। পরে সেই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চিকিৎসককে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি মানসিক রোগী নন; কিন্তু তাঁকে ওই হাসপাতালেই রাখা হয়। সেখানে মানসিক রোগীদের সঙ্গে তাঁকেও রাখা হয়েছিল। তাঁকে মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হয়। চশমা পরতেও দেওয়া হয়নি। তাঁর চুল ও দাড়ি কেটে দেওয়া হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, বিদেশের মাটিতে হয়তো পাগল অবস্থায় মারা যাবেন। তাঁর পরিবার হয়তো তাঁর কবরও দেখতে পারবে না। ওই অবস্থায় তিনি আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন।
একদিন হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, তাঁর জন্য একটি টেলিফোন এসেছে। ফোনটি করেছিলেন তাঁর স্ত্রী। ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বুঝতে পারেন, পরিবার তাঁর অবস্থান জানতে পেরেছে। এই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অনুষ্ঠানে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেন, মুঠোফোনে কথা বলার সেই সময় তাঁর স্ত্রীও হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।
সালাহউদ্দিন বলেন, এরপর তাঁকে সেখান থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা শুরু হয়। পুলিশ ও চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করেন। স্থানীয় একটি সংগঠন তাঁকে একটি জামা ও একটি চাদর দেয়। এরপর তাঁকে সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় দূর থেকে একটি টেলিভিশন ক্যামেরা দেখতে পান তিনি। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’। পরে সেই ভিডিও বাংলাদেশে পাঠানো হয়। দেশের মানুষ ভিডিওটি দেখতে পান।
এরপর সালাহউদ্দিন আহমদকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে তিনি দেশে ফেরেন ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর। অনুষ্ঠানে নিজের গুম ও উদ্ধারের পুরো ঘটনাটি স্মৃতিচারণা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকারীদের তিনি ধন্যবাদ জানান। বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান হওয়ায় ভারত থেকে আমি দেশে ফিরতে পেরেছি। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
সালাহউদ্দিনের পরবাসের ৯ বছর
সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন। এরপর প্রশাসনের চাকরি ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে আসেন। ২০০১ সালে তিনি কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির মহাসচিবসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় সালাহউদ্দিন আত্মগোপনে থেকে দলের মুখপাত্র হিসেবে বিবৃতি দিতেন, গণমাধ্যমে কথা বলতেন। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন।
বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী সালাহউদ্দিন আহমদকে গ্রেপ্তার দেখায় সেখানকার পুলিশ। পরে তাঁর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের মামলা এবং ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়। এই মামলায় ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত সালাহউদ্দিন আহমদকে খালাস দেন। এর বিরুদ্ধে ভারত সরকার আপিল করে। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শিলং জজ আদালত সালাহউদ্দিন আহমদকে খালাস দেন। ভারতে আটক অবস্থায় বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য মনোনীত হন।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে ছয় লাখ মানুষ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে শিল্প উৎপাদন, কৃষি, স্বাস্থ্য খাত, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের আয়-রোজগারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংকট দীর্ঘ হলে অর্থনীতিতে এর চাপ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য কমানোর গতি কমে যায়। ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। শুধু তাই নয়, এ বছর ছয় লাখ মানুষের কাজ হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বছরে প্রায় এক লাখ কর্মী প্রেরণ কমে গেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। উলটো উৎপাদন কমাতে হচ্ছে বিধায় কর্মসংস্থানে ভাটা পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজি আমদানিতে বিকল্প উৎসের পাশাপাশি বিদ্যমান সমস্যাগুলো প্রায়োরিটি দিয়ে সমাধান করতে হবে। তাতে অন্তত এই সংকটময় মুহূর্তে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলেও কর্মসংস্থান ধরে রাখা যাবে। এছাড়া দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ওএমএস কর্মসূচির পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড বিস্তৃত করতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানির অভাবে অর্থনীতির ওপর একটি চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে যারা কর্মরত আছেন, তাদের ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে কর্মহানির ঘটনা ঘটছে এবং এ ধরনের কর্মহানি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের জন্য এমন পরিস্থিতি বিব্রতকর। কারণ সরকার যেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে, সেখানে উলটো বিদ্যমান কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারকে কীভাবে জ্বালানি-সংকট মোকাবিলা করা যায় এবং শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনের মধ্যে রাখা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মহানি যাতে না ঘটে এবং মানুষ যাতে বেকার না হয়ে পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
অর্থনীতির জন্য সরকারের করণীয় সম্পর্কে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রথমত জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে কর্মহানি না ঘটে এবং শিল্পকারখানাগুলো সচল থাকে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বেশি কর্মহানি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব এলাকাকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। পরিবারভিত্তিক সহায়তার জন্য যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সেখানেও বেশি কর্মহানি হতে পারে এমন এলাকাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জ্বালানিতে বড় ঝুঁকি : বিশ্বব্যাংকের মতে, এলএনজির ওপর বাংলাদেশের ব্যাপক নির্ভরতা বড় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে, যা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বারবার দেখা গেছে। বর্তমানে জ্বালানি খাতই বাংলাদেশের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহে বড় ধরনের সংকট হলে বাংলাদেশ সরাসরি এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সংকটের মধ্যেই সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।
কালের কণ্ঠ
‘হদিস নেই আড়াই শ ব্যক্তির’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলের বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর আর হদিস নেই—এমন আড়াই শ অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, আড়াই শ অভিযোগ তদন্তের জন্য গুম বিশেষজ্ঞ পাঁচজন তদন্তকারী কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি তদন্তদল গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম নিজে এই তদন্তদলের তত্ত্বাবধান করছেন। আগামী মাসের (সেপ্টেম্বর) মধ্যে তদন্ত শেষ করে ট্রাইব্যুনালে ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ দাখিলের চেষ্টায় আছে প্রসিকিউশন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুমসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলা বিচারাধীন।
আড়াই শ গুম গুম অভিযোগের (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) মামলাটি নিয়ে তদন্ত পর্যায়ে আছে ১১টি মামলা। অচিরেই এসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।
‘গুম’ যেভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ : চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। এর মধ্যে ৯২টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিদ্যমান আইনে সংশোধন আনা হয়।
সম্পূর্ণ নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয় ৩৮টি। আর পূর্ববর্তী আইন রহিত করে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই বছর ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে তিনবার সংশোধন আনে অন্তর্বর্তী সরকার। তিনটি সংশোধনই অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়, যা পরে আইনে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে প্রথম সংশোধন এনে অধ্যাদেশের গেজেট জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
ওই সংশোধনীতে অপহরণ, দাসত্ব, আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক নির্বাসন, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক গুম, মানবপাচার, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, গর্ভধারণ, বন্ধ্যত্বকরণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে যুক্ত করে সরকার। আন্তর্জাতিক রোম সংবিধি সনদ অনুসারে এই অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয় অধ্যাদেশে। ২০১৩ সালের ২৩ মার্চ বাংলাদেশ রোম সংবিধি সনদে স্বাক্ষর করে এসব অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ, সংগঠন বা সংস্থার কোনো সদস্য, যেকোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী, সহায়ক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থা, যারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে বা বাইরে এসব অপরাধ করবে তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে পারবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই সংশোধনীর পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে ও তদন্ত সংস্থায় একের পর এক গুমের অভিযোগ আসতে শুরু করে।
ব্যাপক মাত্রায় পদ্ধতিগত গুমের বিচার ট্রাইব্যুনালে : সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে গুমের বিচার নিয়ে ৪ ধারায় বলা হয়েছে, “তবে শর্ত থাকে যে, ব্যাপক (ওয়াইডস্প্রেড) বা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে (সিস্টেমেটিক) সংঘটিত কোনো গুম এই আইনের অধীন ‘গুম’ হিসাবে গণ্য হইবে না; উহা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং উক্ত আইনের অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার্য হইবে।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খসড়া আইনটি বিল আকারে আগামী সংসদে উত্থাপিত হবে বলে আমরা মাননীয় আইনমন্ত্রী মাধ্যমে জানতে পেরেছি।’
ঠিক কতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছে, সে বিষয়ে ঠিকঠাক তথ্য দিতে না পারলেও চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ গুমের অভিযোগ জমা পড়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেক গুমের অভিযোগ আছে। আমরা প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটিকে মাথায় রেখে আপাতত আড়াই শ ব্যক্তি, যাদের ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গুম করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত হদিস নেই, এমন অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছি। এই আড়াই শ অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটা গুম পদ্ধতিগতভাবে এক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে অথবা সাদা পোশাকে হয় বাড়ি থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়েছে, অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, পরে তাঁদের আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। আর এসব গুম সারা দেশে ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত হয়েছে। ফলে এই গুমগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছি আমরা।’
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫০ গুমের তদন্ত হচ্ছে: যে আড়াই শ অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হচ্ছে, এসব অভিযোগের দেড় শ অভিযোগই এসেছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ থেকে। ৬০টি অভিযোগ এসেছে ‘আমরা গুম পরিবার’ থেকে। বাকি ৪০টি অভিযোগ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে বলে জানিয়েছে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।
এসব অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইনভেস্টিগেশন করছি। ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে এরই মধ্যে আমরা যেটা করেছি, সেটা হচ্ছে—এই আড়াই শ ব্যক্তির কাকে কোথা থেকে কত তারিখে কিভাবে নিয়ে গেছে। এই বিষয়গুলো আমরা এরই মধ্যে চিহ্নিত করেছি। আমরা তাঁদের ফটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছি। তাঁদের পরিবারের বক্তব্য আমরা শুনেছি। অনেকের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। আলামত হিসেবে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।’
আড়াই শ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গণশুনানি হবে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৫ আগস্ট গুম হওয়া ৬০ জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় ফের বৈঠক হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
সেপ্টেম্বরে আসতে পারে তদন্ত প্রতিবেদন: তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁরা (আড়াই শ ব্যক্তি) গুমের শিকার হয়েছেন। ফলে সময়সাপেক্ষ তদন্তের ব্যাপার। তা ছাড়া তখনকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপহরণের পর কিছু কিছু তথ্য-প্রমাণ অসাবধানতাবশত রেখে গেছে। এগুলো আমরা সংগ্রহ করছি। তদন্তে নেমে আমাদের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড), ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল অ্যাভিডেন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যাই হোক, গুম বিশেষজ্ঞ পাঁচজন বিশেষজ্ঞ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার এ বিষয়ে কাজ করছেন। আমিসহ বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর এই ইনভেস্টিগেশনটা সরাসরি তত্ত্বাবধান করছি। এক সপ্তাহ পর পর আমরা বসছি। তদন্তের সব কাজ শেষ হলে মনে করছি আগামী এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়ার চেষ্টা করব।’
এই মামলায় আড়াই শ ঘটনায় আড়াই শ ‘অভিযোগ’ হতে পারে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি প্রত্যেক পরিবারের জন্য আলাদা চার্জ রাখতে। কিন্তু ট্রায়াল (বিচার) হবে এক সঙ্গে। আমরা মনে করি, আলাদা অভিযোগ গঠন করে বিচারের চেয়ে এক সঙ্গে বিচার হওয়াটা ভালো। এতে যেমন সময় বাঁচবে, তেমনি একটা বিচারের মধ্য দিয়ে সবার বিচারটা হয়ে যাবে। এমনটা হলে তা হবে এক ঐতিহাসিক মামলা।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘খুলনায় খুনোখুনি বন্ধে এক মাসের সময়সীমা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, খুলনাসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে খুলনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে খুনখারাবিতে জড়াচ্ছে একাধিক পক্ষ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করতে এক মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি পুলিশ সুপারকে (এসপি) এ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় খুলনা অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে। এ সময় সারাদেশে পুলিশকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভায় খুলনার পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান, ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুকের কাছে নিজ এলাকার বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণ ও প্রতিকারে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- জানতে চাওয়া হয়। খুলনার কমিশনার ও ডিআইজির ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি নীতিনির্ধারকরা। এর পর ৩০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত ও দৃশ্যমান উন্নতি সাধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। গতকাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজারবাগে অনুষ্ঠিত সভায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসের অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সভায় অতিরিক্ত আইজি, সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সুপাররা উপস্থিত ছিলেন। পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সভায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় এপ্রিল থেকে জুন মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে। এ ধরনের ঘটনায় করা মামলার যথাযথ তদন্ত ও অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি একজন চিকিৎসককে টার্গেট করে হামলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় জুন মাসে দুই হাজার ২০০টি, মে মাসে এক হাজার ৯৫২টি এবং এপ্রিলে দুই হাজার ১১টি মামলা হয়েছে। এ তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট মামলা ছয় হাজার ১৬৩টি। এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে একই ধরনের অপরাধে মামলা এক হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১ ও মার্চে এক হাজার ৪৮৫টি। বছরের এই তিন মাসে মোট মামলা তিন হাজার ৯৪৭টি। বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় দ্বিতীয় তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে দুই হাজার ২৬১টি।
একাধিক সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান আরও উন্নতি চেয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। এ লক্ষ্যে পুলিশকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে। সভায় বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে না। তাহলে কেন জনপ্রত্যাশামাফিক কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হবে না? পুলিশের জনবল বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেটি বাস্তবায়নে কাজও শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ইত্তেফাক
‘গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর, কেউ ফেরে কেউ ফেরে না’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আজ ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। ‘গুম’ শব্দটি ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম। যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ ফিরে আসতে পারে, কেউ কোনদিনই ফিরে না। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের দিন কাটে এক অনিশ্চিত বাস্তবতায়, যেখানে কোনো সমাপ্তি নেই। কেউ মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশ করতে পারেন, দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন, কবর জিয়ারত করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হয়ে আর না ফিরলে সেক্ষেত্রে স্বজনদের শোক পালনের সুযোগটুকুও থাকে না। কী নির্মম!
‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’-এই প্রতিপাদ্যে এবার পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সাত শতাধিক মানুষকে গুমের অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে ‘সৌভাগ্যবান’ কেউ কেউ পরিবারের কাছে ফিরেছেন। কিন্তু, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনও ‘নিখোঁজ’। নিখোঁজদের স্বজনরা এখনও অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন, ডুকরে কাঁদেন। সন্তানহারা মা, নিখোঁজ বাবার সন্তান, তুলে নিয়ে গেছে এমন ভাইয়ের বোন, গুম হওয়া স্বামীর স্ত্রীসহ পরিবারের জিজ্ঞাসা- স্বজনেরা কোথায়? বেঁচে আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে? মেরে ফেলা হলে মরদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছে? তাদের অনেকেরই এই প্রশ্নের জবাব হয়তো আর কোনদিনই মিলবে না।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে গুম হওয়া ব্যক্তির স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করছে। জোরপূর্বক গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে এধরনের অপকৌশল ব্যবহার করে থাকে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারে না এবং বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, স্মরণ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়্যারেন্স’ সম্মেলনে যে আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয়, সেই সনদে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন, সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দিবসটি পালন করে।
দিবসটির মূল উদ্দেশ্য ছিল গুম নামক মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহিতার চাপ সৃষ্টি করা। ২০১১ সাল থেকেই বাংলাদেশে দিনটি পালিত হতে থাকে। বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়, কিন্তু তা তীব্রভাবে আলোচিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে গুম করে ‘আয়নাঘরে’ আটক রেখে নির্মমতার চিত্র গুম কমিশন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে গা শিউরে উঠে।
বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি সাংবাদিকদের গুমের ঘটনার চিত্র উঠে আসে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে আর খোঁজ মেলেনি।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক আবেদন দাখিল করেছেন গুমের শিকার ও ভুক্তভোগী পরিবার। কয়েকটির বিচারও শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সই করেছে বাংলাদেশ।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘মেট্রোরেলে খরচের লাগামহীন দৌড়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মেগাপ্রকল্পগুলো যেন ব্যয়ের মেগা-দুর্নীতি ও অপচয়ের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। বিগত সরকারের অপচয়ী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবার দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বা এমআরটি লাইন-১-এর খরচ ও সময় বাড়ানোর এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। আঞ্চলিক প্রতিবেশী ভারত ও মালয়েশিয়ার সমমানের প্রকল্পের চেয়ে বহুগুণ বেশি খরচে নির্মিত হতে যাচ্ছে ঢাকার এই মেট্রোরেল। পরিকল্পনা কমিশনের কাছে পাঠানো সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণের খরচ হিসাব করলে ঢাকার এই লাইন দিল্লির চেয়ে প্রায় ৭ থেকে ১২ গুণ এবং মালয়েশিয়ার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। ৩১.২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের ব্যয় সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১২৯.৮২ শতাংশ বাড়িয়ে এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে সোয়া সাত বছরের প্রকল্পটি শেষ করতে এখন সময় চাওয়া হচ্ছে সোয়া ১৬ বছর। অথচ গত সাত বছরে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭.৩০ শতাংশ এবং অর্থ ব্যয় হয়েছে ৩.২৪ শতাংশ।
পরিবহন চাহিদা বনাম প্রকল্পের করুণ বাস্তবচিত্র
রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৪ হাজার ১০০ মানুষ বসবাস করে। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, ঢাকা ও পাশের এলাকায় প্রতিদিন সৃষ্ট প্রায় তিন কোটি ট্রিপ ২০২৫ সালে চার কোটি ২০ লাখে এবং ২০৩৫ সালে পাঁচ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হবে। এই বিশাল পরিবহন চাহিদা সামাল দিতেই পাতাল ও উড়াল পথের সমন্বয়ে এমআরটি লাইন-১ পরিকল্পনা করা হয়।
বিমানবন্দর রুট (পাতাল) : ১৯.৮৭৫ কিলোমিটারের এই রুটে ১২টি ভূগর্ভস্থ স্টেশন থাকবে। এগুলো হলো- বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল ৩, খিলক্ষেত, নদ্দা, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, আফতাবনগর, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।
পূর্বাচল রুট (উড়াল ও আংশিক পাতাল) : ১১.৩৬৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই রুটে ৯টি স্টেশন থাকবে। এগুলো হলো- নতুন বাজার, নদ্দা, জোয়ার সাহারা, বোয়ালিয়া, মাস্তুল, পূর্বাচল ক্রিকেট স্টেডিয়াম, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল পূর্ব, পূর্বাচল টার্মিনাল এবং পিতলগঞ্জ ডিপো।
২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর একনেকে অনুমোদনের সময় এই ৩১.২৪১ কিলোমিটার প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সে সময় সরকারের অর্থায়ন (জিওবি) ছিল ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা এবং জাপানি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থায় (জাইকা) ঋণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। সময়সীমা নির্ধারিত ছিল সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাত বছরে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭.৩০ শতাংশ, আর অর্থ ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৯০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা (৩.২৪ শতাংশ)।
ব্যয় বাড়ছে ৬৮ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা
বাস্তবায়নে চরম ধীরগতির অজুহাতে প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে (১ম সংশোধন) মূল ব্যয়ের সাথে আরো ৬৮ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা যোগ করে মোট ব্যয় ১২০,৭৯৪ কোটি টাকা (প্রায় ১২১ হাজার কোটি টাকা) করার আবেদন করা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির এই খড়গ সবচেয়ে বেশি পড়ছে সরকারি তহবিলের ওপর। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা থেকে ১৬৮.১২ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে (বৃদ্ধি ২২ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা)। অন্য দিকে জাইকার ঋণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা থেকে ১১৬.৮২ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে (বৃদ্ধি ৪৬ হাজার ৮৫ কোটি টাকা)।
মূল খরচে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ছিল এক হাজার ৬৮২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাব পাস হলে কিলোমিটারপ্রতি খরচ দাঁড়াবে তিন হাজার ৮৭২ কোটি ২৮ লাখ টাকা, যা মূল খরচের চেয়ে ২.৩০ গুণ এবং প্রতি কিলোমিটারে অতিরিক্ত দুই হাজার ১৯০ কোটি টাকা বেশি।
বণিক বার্তা
‘লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নিতে হবে সরকারকে’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ সংকটে থাকা সরকারের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। কেবল চলতি অর্থবছরেই প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্ণ হতে যাচ্ছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ও শরিয়াহভিত্তিক সুকুকও রয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া এসব ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সরকারকে নতুন ঋণও নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের এত বেশি ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতকে আরো বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হতে যাওয়া বিল-বন্ডের দায় পরিশোধের আর্থিক সামর্থ্য সরকারের নেই। ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে ঋণ নিয়েই তা পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ঋণ চক্রে জড়িয়ে পড়া সরকারের দায় আরো বাড়বে। ‘ঋণ চক্র’ হলো এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে পুরনো দায় শোধ করার জন্য নতুন করে ঋণ নিতে হয় এবং ঋণের স্থিতি না কমে দিন দিন বাড়তে থাকে।
সরকারের সিকিউরিটিজের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি ত্রৈমাসিকে ‘কোয়ার্টারলি বুলেটিন অব বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকাশনাটির এপ্রিল-জুন সংখ্যা প্রকাশিত হয় গত সপ্তাহে। এতে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্ণ হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ট্রেজারি বিল, যার পরিমাণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি ৭১ হাজার ৯৬০ কোটি ৯৪ লাখ টাকার ট্রেজারি বন্ড মেয়াদপূর্তির তালিকায় রয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক ও ১ হাজার ৯৯২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার শর্ট টার্ম বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজের (এসপিটিবি) মেয়াদ পূর্ণ হবে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া সরকারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারকে পরিশোধ করতে হবে এমন ট্রেজারি বিল-বন্ড ও সুকুকের পরিমাণ ৭১ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। তিন মাস আগে গত মার্চেও এ স্থিতির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (মার্চ-জুন) সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি ৬০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেড়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে নেয়া সরকারের এ ঋণের ২২ শতাংশ ট্রেজারি বিলের।
বর্তমানে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিল প্রচলন রয়েছে। আর দুই থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে ঋণ স্থিতি রয়েছে ৬৭ শতাংশ। বাকি ১১ শতাংশ সুকুক ও বিশেষ বন্ডের বিপরীতে ঋণ নিয়েছে সরকার।
ঋণ নিয়ে ঋণ শোধের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে সরকারের জন্য ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না। এ কারণে বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় ঋণ নিতে হচ্ছে। সমস্যা হলো অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদহার অনেক বেশি। যেসব ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ চলতি অর্থবছরে শেষ হবে, সরকার সেগুলো “রোলওভার” করতে বাধ্য হবে। কারণ এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এ মুহূর্তে সরকারের নেই।’
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া উচ্চ সুদের ঋণ সরকারের জন্য ‘বিষফোড়া’ হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘সরকার চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত পরিমাণ রাজস্ব আয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির যে সংকট চলছে, তার প্রভাবে বেসরকারি খাতের পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতি আরো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। চলতি বাজেটে সরকার ঋণের সুদ খাতে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ধরেছে। এ সুদের ৭৫ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে চলে যাবে। একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি সরকারের জন্য বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে।’
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। রেকর্ড এ বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। ট্রেজারি বিল-বন্ড তথা সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে এ ঋণ নেয়া হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে সরকারকে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি পরিমাণ ঋণ নিতে হতে পারে। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটের চেয়েও ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে কেবল ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। একই সময়ে পরিশোধ করেছে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ। সে হিসাবে গত জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণ ছিল ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের কোন সময়ে কী পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ পূর্ণ হবে, সেটি বিবেচনা করেই বাজেটে নিট ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়। প্রাক্কলনের তুলনায় সরকারের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে সেটি সংশোধিত বাজেটে সমন্বয় করা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া বিল-বন্ডের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এরই মধ্যে বাজার থেকে ঋণ উত্তোলন শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে আসায় দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে। এ কারণে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় আগস্টেও রেকর্ড পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলাম হয়েছে। এতে সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া ঋণের মেয়াদ নতুন করে বাড়ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। আমরা কেবল সে দায়িত্ব পালন করছি। এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে, সেটি সরকারকেই ভাবতে হবে।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না। তাই ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আবার ঋণনির্ভরতা সত্ত্বেও বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সরকারের ঋণ কমার কথা নয়। বরং সময়ের সঙ্গে তা আরো বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম আইনটি হবে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ স্বাধীন তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুম প্রতিরোধ ও বন্ধে সরকার যে নতুন আইন করতে যাচ্ছে, তাতে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের কয়েকটি ধারা সংস্কার না হলে গুম আবার ফিরে আসতে পারে। দরজা খোলা রেখে বন্ধ করার কথা বলার মতো হবে আইনটি।
রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে আজ শনিবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের সদস্যরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, জনপ্রতিনিধিদের কাজ নিরাপত্তা বাহিনীকে তুষ্ট করা নয়, জনগণের স্বার্থরক্ষা করা। প্রস্তাবিত আইন পাস হলে উচ্চবিত্ত বা সমাজে পরিচিত কেউ গুমের শিকার হলে গণমাধ্যম ও জনমতের চাপে কিছুটা সুরাহা মিলতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষ ভুক্তভোগী হলে, তা নানা কারণে কঠিন হবে। সরকার গুম না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আইনে ‘ছাড়’ বা ‘খোলা পথ’ রাখা হয়েছে, যা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার জন্য হুমকি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, কোনো ভুক্তভোগী গুমের অভিযোগ করার পর তদন্তে তা সত্য প্রমাণিত না হলে উল্টো অভিযোগকারীকে শাস্তির আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে। এতে গুম বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা বিচার চাইতে ভয় পাবেন।
গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমসংক্রান্ত আইন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৪ ও ১৯ ধারায় বড় ধরনের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রয়েছে। নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ রাখা হয়নি। মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারে না; অভিযুক্ত বাহিনীর কাছেই প্রতিবেদন চাইতে হয়। নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় কালক্ষেপণের সুযোগ থাকে। আবার সুপারিশ পাঠানোর পরও ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়, যা প্রমাণ নষ্টের জন্য যথেষ্ট।
এইচআরএসএসের উপদেষ্টা মো. নূর খান বলেন, গুম না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আইনে এমন ‘খোলা পথ’ রাখা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।
আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, একাধিক সংস্থা গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল। নতুন বাংলাদেশেও গুম, নির্যাতন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহির অভাব দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব।
চলতি বছরের ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলার জয়মনি এলাকার জেলে ও মোটরসাইকেল রাইডার মিরাজ শেখকে স্থানীয় কোস্ট গার্ডের পন্টুনে তুলে নেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করে শহিদুল আলম বলেন, তাঁর পরিবার বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছে। হাইকোর্টও মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
দেশ রূপান্তর
‘গুমের বিচার কতদূর’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাধারণ নাগরিক থেকে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এসেছেন। আবার অনেকেই বছরের পর বছর আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন, আবার চিরতরে হারিয়ে গেছেন। বিশেষ করে বিএনপির অনেক নেতা গুমের শিকার হয়েছেন। গুম ও নিখোঁজের বিষয়ে থানা ও আদালতে ফৌজদারি মামলা-জিডি করা হলেও থমকে আছে তদন্ত। জানা গেছে, একটি মামলারও তদন্ত শেষ হয়নি। এক্ষেত্রে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেও এটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন আইনটি হলে মামলার তদন্তে গতি আসতে পারে।
ইতিমধ্যে গুমের ঘটনার দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা এসেছে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানদের কাছে। গুমের নায়করা অধরা থাকায় ভুক্তভোগীরা ক্ষোভও জানিয়েছেন। কমিশন গঠন করেও হচ্ছে না কোনো কাজ। তবে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বলেছেন, পলাতক রাঘববোয়ালদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে গুমের অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় গতি না থাকলেও গুমের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আগামী মাসে এ মামলাগুলো রায়ের পর্যায়ে আসতে পারে। আর পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুমের অভিযোগ নিয়ে আড়াইশর মতো মামলা-জিডি তদন্তের পর্যায়ে আছে।
গুমের ফৌজদারি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য অনুসন্ধানে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিশন এই পর্যন্ত এক হাজার ৮৫০টির অভিযোগ পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানে ১৫শটি ঘটনার সত্যতা মিলেছে, যার মধ্যে বিশাল একটি অংশের খোঁজ এখনো মেলেনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর আগের ও পরের সময়গুলোতে গুমের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক ও পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’-এ বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো ভুক্তভোগীদের।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপহরণ, নিখোঁজের মামলা বা জিডির অভিযোগগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকারের’ তথ্য বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ৭০৮ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তবে অপর মানবাধিকার সংগঠন আসক-এর তথ্য বলেছে, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালে গুমের শিকার হয়েছেন ৬২৯ জন। তার মধ্যে ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ৯৭ জন গুম হন।
পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মদদে অপরাধী ছাড়াও নিরীহদের গোপন স্থানে ধরে নিয়ে আটকে রাখা হয়। তাদের মধ্যে অনেকের লাশ পাওয়া যায় মাঝে মধ্যে। এসব গুম বা নিখোঁজ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘একসঙ্গে ২৫০ গুমের বিচার’। খবরে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হয়ে এখনো সন্ধান মেলেনি এমন ২৫০ জনের ঘটনা একসঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এর মধ্যে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনায় একই ধরনের প্যাটার্ন পাওয়ায় এগুলোকে ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করতে পাঁচজন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে ২৫০ ব্যক্তির গুমের ঘটনা একক বিচারে আনার চেষ্টা চলছে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম-নির্যাতন ও গুমের ফলে হত্যার ঘটনায় চলমান তিন মামলার বিচারও শেষের পথে। এসব মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে গুম করে গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা, নির্যাতন এবং তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ করে দেওয়ার নানা রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে আসছে। অন্যদিকে গুমের শিকার পরিবারগুলো থেকে এই ধরনের মামলার বিচার ও তদন্তে ধীরগতির অভিযোগ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশেষ বিশেষ কিছু অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। এখন তারা রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে মুক্তি চায়।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আজ ৩০ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘ ২০১০ সালে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটিকে কেন্দ্র করে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের আগপর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনে তিন শতাধিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে যাচাইবাছাই করে ২৫০টি ঘটনা একসঙ্গে করে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আনা হচ্ছে। এই ২৫০ জন জীবিত না মৃত, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দায়ের হওয়া অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৫০ জন গুমের ঘটনায় ‘মায়ের ডাক’ এবং ৬০ জন গুমের ঘটনায় ‘আমরা গুম পরিবার’ অভিযোগ দাখিল করেছে। বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিসংগঠন থেকে সব মিলিয়ে তিন শতাধিক অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ২৫০ ব্যক্তির ঘটনা একক বিচারে আনার চেষ্টা করা হলেও প্রত্যেকের ঘটনায় আলাদা কাউন্ট ও অভিযোগ থাকবে। যার বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেই অনুযায়ী আসামিদের পরিচয় ও অভিযোগ নির্ধারণ করা হবে। তদন্তে এরই মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তিকে কোথা থেকে, কবে এবং কীভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তার তথ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। একাধিকবার গণশুনানি করা হয়েছে। অনেকের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামতও সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের মতে, আলাদা আলাদাভাবে বিচার করার পরিবর্তে একটি বিচারের মধ্যে আনতে পারলে সময় বাঁচবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এসব ঘটনা যে একই ধরনের প্যাটার্নে এবং ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয়েছে, সেটিও আদালতের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
