হিমালয় গলছে, দায় নেবে কে?

প্রসঙ্গ দক্ষিণ এশিয়া

হিমালয় গলছে, দায় নেবে কে?

ফন্ট সাইজ:

নেপালের বিপর্যয় শুধু একটি দেশের সংকট নয়; কপ৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচারের কঠিন পরীক্ষা!
হিমালয় কি শুধু নেপালের? না। হিমালয় এশিয়ার জলভাণ্ডার। এই পর্বতমালা থেকে নেমে আসা নদীগুলো কোটি কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অথচ সেই হিমালয়ই এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হিমবাহ সঙ্কুচিত হচ্ছে, বরফ গলছে, পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হচ্ছে। বাড়ছে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগ সেই বাস্তবতাকে আবারও চোখের সামনে এনেছে। হিমবাহ ও শিলার বিশাল ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক স্রোত নদী উপত্যকায় নেমে এসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। প্রাণহানি, নিখোঁজ মানুষ, সড়ক ও সেতু ধ্বংস—সব মিলিয়ে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই বিপর্যয়ের মধ্যেই নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা স্পষ্ট—নেপাল বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সামান্য অবদান রাখলেও উষ্ণায়নের অভিঘাত বহন করছে বড় আকারে। তাহলে ক্ষতির দায় নেবে কে?

প্রশ্নটি শুধু নেপালের নয়। প্রশ্নটি ভারতের। ভুটানের। বাংলাদেশের। এমনকি চীনেরও। কারণ হিমালয়ের সংকট কোনো সীমান্তে থেমে থাকে না।
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। সাম্প্রতিক বন্যাটিকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ও শিলার বড় ধরনের ধস এবং তার ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি নদীতে নেমে আসাই তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের কারণ। কিন্তু এখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের কাঠামো বদলাচ্ছে। বরফের স্থিতিশীলতা কমছে। উচ্চভূমির পারমাফ্রস্ট গলছে। পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হচ্ছে। ফলে ভূতাত্ত্বিক বা আবহাওয়াজনিত কোনো ঘটনা আগের তুলনায় বড় বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিটি দুর্যোগের একমাত্র কারণ নয়; কিন্তু এটি দুর্যোগের ঝুঁকি ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এটাই মূল উদ্বেগ।

হিমালয়ের বরফ হারানোর হিসাব! হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চল নিয়ে ICIMOD-এর সাম্প্রতিক গবেষণা উদ্বেগের মাত্রা স্পষ্ট করেছে। ২০০০ সালের পর এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বরফ হারাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
হিমবাহ সঙ্কুচিত হলে স্বল্পমেয়াদে নদীতে অতিরিক্ত পানির প্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বরফের মজুত কমে গেলে শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর পানিপ্রবাহ কমার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে ‘অতিরিক্ত পানি’ এবং ‘পানির ঘাটতি’ দুই বিপদই তৈরি করতে পারে।

গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু অববাহিকার পানি ব্যবস্থার সঙ্গে হিমালয়ের বরফ ও তুষারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কোনো দেশই এই পরিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই হিমালয়ের বরফ গলাকে শুধু নেপালের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কপ৩১ : নেপালের সামনে বড় কূটনৈতিক সুযোগ: এই বাস্তবতায় আগামী কপ৩১ নেপালের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর ২০২৬ তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে। তুরস্ক সম্মেলনের আয়োজক ও প্রেসিডেন্সির দায়িত্বে থাকবে এবং অস্ট্রেলিয়া আলোচনার নেতৃত্ব দেবে। জলবায়ু কূটনীতিতে এটি একটি ব্যতিক্রমী যৌথ ব্যবস্থা।

কপ৩১-এর প্রস্তুতিতে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, বাস্তবায়ন, জ্বালানি রূপান্তর এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নেপালের জন্য এটাই সুযোগ।
কাঠমান্ডুর উচিত কপ৩১-এ হিমালয়কে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। পাহাড়ি ও হিমবাহনির্ভর দেশগুলোর বিশেষ ঝুঁকি তুলে ধরে নেপালকে climate finance, adaptation, loss and damage এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবি আরও জোরালো করতে হবে।

বিশেষ করে হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ বসতি, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পাহাড়ি কৃষির জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
কপ৩১ যদি সত্যিই প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দিকে যেতে চায়, তাহলে হিমালয় তার একটি বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হতে পারে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নেপালের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই।
শিল্পোন্নত দেশগুলো গত দুই শতকে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিপরীতে নেপালের মতো দেশ বৈশ্বিক নিঃসরণে সামান্য অবদান রেখেও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় অভিঘাতের মুখে পড়ছে।

এটি শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়। এটি নৈতিকতার প্রশ্ন। জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল যুক্তি হলো, যারা সংকট তৈরিতে বেশি অবদান রেখেছে, তাদের দায়িত্বও বেশি হওয়া উচিত।

তাই শুধু ‘সব দেশ কার্বন কমাবে’—এই ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দরকার বাস্তব অর্থায়ন। দরকার অভিযোজনের জন্য অর্থ। দরকার দুর্যোগের পর পুনর্গঠনের সহায়তা। দরকার প্রযুক্তি। দরকার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা।
বিশেষ করে নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে নতুন ঋণের বোঝা চাপিয়ে জলবায়ু অভিযোজনের অর্থ দেওয়া টেকসই সমাধান হতে পারে না। অনুদান, সহজ শর্তের অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি সহায়তা প্রয়োজন।

তবে নিজেদের দায়ও অস্বীকার করা যাবে না! নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোকেও নিজেদের দায়িত্বের জায়গাটি স্বীকার করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তব। কিন্তু তার সঙ্গে যদি অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি, দুর্বল ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ যুক্ত হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বাড়তে পারে।

উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পর্যটন ও কর্মসংস্থান ছাড়া নেপালের মতো দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথ নেই। কিন্তু পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিকে অস্বীকার করে উন্নয়ন করলে প্রকৃতি একদিন সেই উন্নয়নের মূল্য আদায় করবে।
তাই জলবায়ু অভিযোজনকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রেই আনতে হবে।
রাজনীতি থাকুক, হিমালয়কে বাদ দিয়ে নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আছে। সীমান্ত বিরোধ আছে। পানি ও অবকাঠামো নিয়েও স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। নেপাল ও ভুটানেরও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ আছে।
কিন্তু প্রকৃতি এসব রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না।
এক দেশের পাহাড়ে হিমবাহ গললে তার পানি অন্য দেশের নদীতে যায়। এক দেশে ভূমিধস হলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারে। উজানের পরিবর্তন ভাটির জনজীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
সুতরাং হিমালয়কে ঘিরে পরিবেশগত সহযোগিতা এখন আর কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
প্রয়োজন একটি আঞ্চলিক হিমালয় জলবায়ু ও দুর্যোগ সহযোগিতা ব্যবস্থা। ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও এতে যুক্ত করা যেতে পারে।
যৌথভাবে হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট তথ্য বিনিময়, নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ, হিমবাহ-হ্রদের পানির স্তর পরিমাপ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
একটি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা কয়েক ঘণ্টা আগে পৌঁছাতে পারলেও বহু জীবন বাঁচানো সম্ভব।
এবার দরকার ‘হিমালয় চুক্তি’। নেপালের বর্তমান আহ্বানকে একটি বড় আঞ্চলিক উদ্যোগে পরিণত করার সময় এসেছে।
একটি ‘হিমালয় জলবায়ু ও দুর্যোগ চুক্তি’ হতে পারে সেই উদ্যোগের ভিত্তি। এতে থাকতে পারে যৌথ গবেষণা, অভিন্ন দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময়, আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ মহড়া এবং পাহাড়ি অবকাঠামোর জন্য অভিন্ন পরিবেশগত মানদণ্ড।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলেও দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় বন্ধ হবে না। কারণ বন্যার পানি কূটনীতি বোঝে না।

কপ৩১ হতে পারে এমন একটি আঞ্চলিক উদ্যোগের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির উপযুক্ত মঞ্চ। নেপাল চাইলে সেখানে শুধু নিজের ক্ষতির কথা না বলে পুরো হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা সামনে আনতে পারে।
নেপালের সতর্কবার্তা বাংলাদেশেরও! নেপালের বর্তমান বিপর্যয় একটি নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক ঘটনার ফল হতে পারে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে বৃহত্তর সংকেত পাওয়া যাচ্ছে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। হিমালয় বদলাচ্ছে। আর হিমালয় বদলালে দক্ষিণ এশিয়ার পানি ব্যবস্থাও বদলাবে। আজ নেপালের পাহাড়ে বিপর্যয়। কাল ভারতের কোনো নদী অববাহিকায় অতিরিক্ত বন্যা। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ সঙ্কুচিত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের ওপরও পড়বে।
বাংলাদেশের জন্য তাই হিমালয় কোনো দূরের পর্বতশ্রেণি নয়। এটি আমাদের নদী, কৃষি ও পানির ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।
এই কারণে কপ৩১-এ বাংলাদেশেরও হিমালয়, আন্তঃসীমান্ত নদী, জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ-এর প্রশ্ন আরও সক্রিয়ভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
নেপালের আবেদনকে শুধু একটি দুর্যোগপীড়িত দেশের সাহায্যের আবেদন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
যে দেশ জলবায়ু সংকট তৈরিতে সামান্য অবদান রেখেছে, সে দেশ কেন তার সবচেয়ে কঠিন মূল্য দেবে? এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন।
যারা ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তারা কি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষতি মোকাবিলায় যথেষ্ট দায়িত্ব নেবে?
এটি একটি আঞ্চলিক প্রশ্ন। হিমালয়ের পানি, বরফ ও নদীকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কি রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে?
আর এটি একটি বৈশ্বিক প্রশ্ন। কপ৩১ কি আবারও প্রতিশ্রুতির মঞ্চ হবে, নাকি জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজনের বাস্তব ফল দেখা যাবে?
হিমালয়ের বরফ গলছে। সময়ও গলছে। তাই এখন শুধু প্রশ্ন তোলা যথেষ্ট নয়, কাজ শুরু করতে হবে।
হিমালয়কে বাঁচানো মানে শুধু পাহাড় বাঁচানো নয়। এর অর্থ এশিয়ার পানি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ‘দায় নেবে কে?’ প্রশ্নটি আরও বড়—‘বিশ্ব কি এবার সত্যিই দায়িত্ব নেবে?’
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]