একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ। থানায় মামলা নেই। আদালতে হাজির করা হয়নি। কোথায় আছেন? কেমন আছেন? বেঁচে আছেন কি না-কোনো প্রশ্নের জবাব নেই। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শুধু অপেক্ষা। গুম হওয়া স্বজন ফিরে
আসবে এই অপেক্ষায় এখন সময় কাটে হাজারো পরিবারের। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে গুম হওয়া অনেকের স্বজনরা এখন শুধু প্রিয়জনের স্মৃতি হাতড়ে কান্না করেন। দিন-রাত অপেক্ষায় থাকেন এই বুঝি তার স্বজন ফিরে এলো। তাদের অপেক্ষা আর শেষ হয় না। স্বজনও আর ফিরে আসে না। এক দুঃসহ পরিস্থিতিতে সময় কাটছে তাদের। গুম হওয়া হাজারো পরিবারের এমন অপেক্ষার মধ্যেই দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুমের শিকার মানুষদের বিষয়ে তদন্ত ও তাদের পরিণতির বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। তবে নতুন করে কেউ এখন আর গুমের শিকার হচ্ছে না- এটি বড় স্বস্তির।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের কাজ ছিল ২০১০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা। গত জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে জমা দেয়া গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলেছে, কমিশন ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে এবং যাচাইয়ের পর তাদের তথ্যমতে, ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে এমন মামলা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে এবং ধারণা করা হচ্ছে, ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। কারণ, দীর্ঘদিন ভয়, সামাজিক চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কখনোই কমিশনের কাছে আসেননি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা সরকারি বা কমিশনের নথিভুক্ত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে।
‘আয়না ঘরের’ ভয়াবহতা
বাংলাদেশে গুমের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি ‘আয়না ঘর’। ২০২৪ সালের পর একাধিক ব্যক্তি গোপন আটককেন্দ্রে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনেন। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, একাকী আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের অভিযোগ। গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশনও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপন আটককেন্দ্র থাকার তথ্য সামনে এনেছে। বেশ কয়েকটি আয়নাঘর পরিদর্শনও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত এসব গোপন ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দিশালার ছোট ছোট কক্ষে কীভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মানুষকে বন্দি রেখে নির্যাতন করা হতো তারও চিত্র উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের সামনে। গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সদর দপ্তরের ভেতরের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলসহ, র্যাব, ডিবি ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন সংস্থার অন্তত ৮টির বেশি গোপন বন্দিশালা বা আয়নাঘরের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। ডিজিএফআই’র সদর দপ্তরের ইন্টারোগেশন সেল পরিদর্শনও করেছে কমিশন। সেখানে অন্তত ২২টি সেল ছিল।
ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন- গুমের ঘটনা অনুসন্ধানে কমিশন গঠন করে শুধু তালিকা তৈরি বা অভিযোগ নথিভুক্ত করলেই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অপেক্ষার অবসান হবে না। প্রয়োজন-প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগী ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, গোপন আটককেন্দ্রের তথ্য প্রকাশ এবং পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জরুরি।
এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য মো. নূর খান লিটন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুমের ঘটনাগুলো আড়াল করা হয়েছে। তাই গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেয়া হলে কার্যকর এর তদন্ত হবে না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শুধু আইন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, কমিশনে সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তিদের নিয়োগও জরুরি।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের আরেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের অভিযোগ পুলিশের কাছে দেয়া এবং পুলিশকেই তদন্তের দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা রয়েছে। গুম কমিশনের কাছে পাওয়া দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে প্রায় ২৫০টিতে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। আগে এসব বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ার একটি কারণ ছিল, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ জিডি বা অভিযোগ গ্রহণ করতো না।
এসব বিষয়ে গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। তিনি বলেন, কারোর মৃত্যু হলে পরিবারের সদস্যরা শোকপ্রকাশ করতে পারেন, দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না সে কোথায় আছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক স্থগিত অবস্থায় তারা সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও একঘরে হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সে সময় চরম নৃশংসতা বিদ্যমান ছিল এবং যেখানে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রে ছিল গুম। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে এর অবসান ঘটেছে। আমরা আর এই ভয়াবহতার সম্মুখীন হতে চাই না।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে গুমের সংস্কৃতির অবসান হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত গুমের কোনো অভিযোগ ওঠেনি। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯শে আগস্ট জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করে, যা অপরাধটি প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে দেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করে। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করে। যাতে তদন্ত, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা এবং গুমের ঘটনাগুলোর জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
গুম প্রতিরোধের লক্ষ্যে ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নামে আইনপ্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিলটি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ওদিকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বাণী দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল গুম হওয়া ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানাই। বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধ হচ্ছে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। বিশেষ করে বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা অনেক সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে এ ধরনের নির্দয়, নির্মম ও নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করার জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। গুম-অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে আটক রাখার জন্য তৈরি করেছিল গোপন বন্দিশালা। পলাতক ফ্যাসিস্ট আমলের এসব গোপন বন্দিখানা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।
সরকারপ্রধান বলেন, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করেছে। এটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে ‘গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ বন্ধ করতে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করছে। ইতিমধ্যেই জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। একইসঙ্গে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’-ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকার আশা করে, উত্থাপিত বিলগুলো যথানিয়মে আইনে পরিণত হলে ভবিষ্যতে আর কেউ গুম কিংবা অপহরণের মতো মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের পথ বেছে নেবে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে রাখতে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’। আমি এই মনুষ্যত্বহীন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচার ও জবাবদিহিতার জন্য দুনিয়া জুড়ে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানাই।
ওদিকে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত করার ক্ষমতা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দিতে হবে- এমনই দাবি উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের এক আলোচনা সভায়। শেখ হাসিনার সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের হয়ে এই দাবি জানিয়েছে অধিকার। আলোচনা সভায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও গুমফেরত ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল রাজধানীর বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে অধিকার। আলোচনা সভায় গুমফেরত ব্যক্তিরা গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। এ সময় গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ বাতিলের দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা।
গত ৩রা আগস্ট মন্ত্রিসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ অনুমোদন করেছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল পুলিশকে। গত ২৭শে আগস্ট এই খসড়া আইনের কিছুটা পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। এই আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী পরিচালনা করতে পারবে না এবং উক্ত ক্ষেত্রে সরকার উক্ত অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃ বাহিনীর তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করতে পারবে।
অধিকার ও গুমের ভুক্তভোগীরা বলছে, এটি বাস্তবায়ন যোগ্য নয়। কারণ পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হবে। বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সরকার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে এবং তাদের তদন্ত প্রায়শই পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রতিভাত হয়েছে। অধিকার এবং গুম সংক্রান্ত ইনকোয়ারি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে গুমের ক্ষেত্রে এক বাহিনী আরেক বাহিনীর নামে মানুষকে তুলে নিয়ে যেতো। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের আগে কোন বাহিনী গুম করেছে সেটা কখনোই জানা সম্ভব হয় না।
আমার স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে- এটুকু জানতে চাই: আমেনা আক্তার মিষ্টি। তার স্বামী মোহাম্মদ ফিরোজ খান পিন্টুকে ২০১২ সালের ২৪শে আগস্ট চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে গুম করা হয়। তারও তিন মাস আগে তার দেবরকে ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর থেকে পুলিশ পরিচয়ে তিনজনের সঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মিষ্টি বলেন, স্বামীকে হারানোর সময় তাদের দুই বছরের সন্তান ছিল। সেই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সন্ধানের আশায় কেটে গেছে ১৪ বছর। ২৪শে আগস্টে তিনি ১৫ বছরে পদার্পণ করেছেন- তবুও একটাই প্রশ্ন, স্বামী ও দেবর কোথায়? তাদের সঙ্গে কী করা হয়েছে?
স্বামীকে হারানোর পরের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আমেনা বলেন, তিনি তার শাশুড়ির কাছে দুই বছর ছিলেন। পরে সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যেতে হয়। স্বামী গুম হওয়ার কারণে বাসা ভাড়া পেতেন না। তাকে এমনভাবে ট্যাগ দেয়া হয়েছিল- স্বামী খারাপ ছিল, তাকে সরকার নিয়ে গেছে। কথাগুলো বলতে বলতে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আমেনা। তিনি বলেন, তার শাশুড়ির দুই সন্তানই গুম হয়েছেন। বৃদ্ধ শাশুড়ির এখন স্বামী নেই, সন্তান নেই। তার ওষুধ ও ভাতের জন্য কেন এখনো তাকে হাত পাততে হবে- এটাই সরকারের কাছে তার প্রশ্ন।
২০২০ সাল থেকে তিনি সাহস করে স্বামীর সন্ধানে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ১৫ বছর পরও তাকে স্বামীর সন্ধান চাইতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমেনার প্রশ্ন- কেন এখনো আমরা কষ্ট করবো? আমার স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে- এটুকু জানতে চাই। তিনি বলেন, গুমের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে সাজা দেয়া হোক এবং স্বামী-দেবরকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। আমার মতো কোনো স্ত্রীকে যেন আর স্বামীর সন্ধানে কাঁদতে না হয়, বাংলাদেশে যেন আর গুম দেখতে না হয়।
সন্ধান চাইতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার স্ত্রী-পরিবার: বাগেরহাট জেলার মোংলা এলাকা থেকে কোস্ট গার্ড কর্তৃক গুমের শিকার হন মিরাজ শেখ। চলতি বছরের ঘটনা। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন। স্বামীকে গুম করার কথা জানাতে গিয়ে মুক্তা জানান, তিনি স্বামীর গুমের সন্ধান করতে গিয়েও হামলা-মামলার শিকার হন। বর্ণনা দিয়ে মুক্তা বলেন, ১০ই এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার সময় আমার স্বামীকে কোস্ট গার্ড আটক করে। সে একটা লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরা ছিল। যখন ধরে তখন মিরাজ বলেন, ‘স্যার, আমার অপরাধ কি জানতে পারি?’ তখন তারা বলেন, ‘অপরাধ কি জানতে পারবি, চল প্লাটুনে চল।’ তারপর ওরে মারতে মারতে জেটির মাথায় নিয়ে যায়। জেটিতে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে কালো একটা কম্বল টানা হয়। ওকে অনেক অত্যাচার করে, টর্চার করে। ওই জায়গা থেকে অনেক চিৎকারের আওয়াজ পাই আমরা। তারপর আমি যাই। কোস্ট গার্ডের স্পিডবোটে তোলা হয় মিরাজকে। আট-দশজন সব কোস্ট গার্ডের পোশাকেই ছিল। সবাই একত্রিত হয়ে আমার স্বামীকে নিয়ে ছবি তোলে, ভিডিও করে। পরে নিয়ে চলে যায়।
মুক্তা জানান, এরপর দফায় দফায় তিনি কোস্ট গার্ডের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেন স্বামী কোথায় আছেন, কেমন আছেন সেটি জানার জন্য। সবশেষ কোস্ট গার্ডের কাছ থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসেন মুক্তা। এরপর বিভিন্ন নেতা, থানা-পুলিশ সব করেছেন বলে জানিয়েছেন।
মুক্তা কান্নারত কণ্ঠে বলেন, তারপর আমরা মানববন্ধন করি। আমাদের নামে মামলা দেয়া হয়, সন্ত্রাসী মামলা। আমার স্বামীকে যখন প্লাটুনে আটক করে, ওই জায়গা থেকে আমার স্বামীর সন্ধান চাইতে আমাদের অনেক অত্যাচার করে। ওদিন আমাদের নামে আরেকটা মামলা দেয়া হয়, অজ্ঞাতনামা মামলা। গ্রামবাসীর ওপর অত্যাচার করে। গ্রামবাসী দাবি তোলেন, ‘মিরাজকে এই জায়গায় থেকে নিয়েছেন, এই জায়গায় দিয়ে যাবেন।’ এরপর গ্রামবাসীরে গুলি করে, মারধর করে। গ্রামবাসী সব লাফিয়ে লাফিয়ে নদীতে পড়ে। আমার শাশুড়ি, ননদ, আর আমি- তিনজনকেই আটকে রাখা হয়। কোনো মহিলা পুলিশ ছিল না, মহিলা কোস্ট গার্ড ছিল না, সব পুরুষ। আমাদের চুল ধরে ওদের লোহার বোটের সঙ্গে টাঙায়। আমাদের এখনো মেডিকেল রিপোর্ট আছে।
তিনি বলেন, এতেই শেষ নয়, আমাদের জেলে দেয়া হয়। দুইটা মামলা দেয়া হয়। আমরা ২৭ দিন জেল খাটি। জেল খাটার পর আমরা বাড়ি আসলেও হুমকি আসে।
স্বামীর ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে মুক্তা বলেন, আমার স্বামীকে অমানুসিক অত্যাচার করে নখ উপড়ে ফেলে দেয়। তারা বলে, ‘আপনার স্বামী আমরা আনি নাই, মিরাজকে আমরা চিনি না।’ দুই-তিনদিনের সে জায়গা থেকে আজ পাঁচ মাস হয়ে গেছে, আমার স্বামীর কোনো খবর নাই। আর আমি জামিনের পরও এক মাস আত্মগোপনে থাকি। তারপর আমার স্বামীর সন্ধান চাই, কোনো জায়গায় আমার স্বামীর সন্ধান পাই না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি, আমার স্বামীরে ফেরত দিয়ে দিক। আমার একটা ছেলে আছে, আমি ছেলে নিয়ে কোথায় যাবো?
জামিন পেয়েই জেলগেট থেকে ফের গুম হন কাইয়ুম: আব্দুল কাইয়ুম। ভয়েস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপেয়ার্ড পারসন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিজেই গুমের শিকার ভুক্তভোগী। কাইয়ুমকে গুম করার পর ২৩ দিন নির্যাতন করা হয়। এরপর তিনি ছাড়া পান। কিন্তু ছাড়া পেয়ে জেলগেট থেকেই ফের গুমের শিকার হন তিনি। কাইয়ুম বলেন, ২০১৭ সালের ১০ই এপ্রিল সাদা পোশাকধারী একদল লোক আমাকে রামপুরা থেকে তুলে নিয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে প্রশাসনের পরিচয় দেয় তার। আমাকে র্যাব-১১-তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং র্যাব-১১-তে তখন কর্মরত ছিলেন এসএইচ আরিফুদ্দিন, যিনি এখন কারাগারে বন্দি রয়েছেন, যার ট্রাইব্যুনালে মামলা চলমান রয়েছে। সেই আরিফুদ্দিনের নেতৃত্বে এবং সে নিজেই আমাকে গুম করে নিয়ে যায়। ওই সময় আমাকে দীর্ঘ ২৩ দিন একটানা গুম রাখা হয়। এই ২৩ দিনের সময় একটি জিডি করতে পেরেছিল আমার পরিবার, জিডি করতে গিয়ে কমপক্ষে ২০টি থানার শরণাপন্ন হয়েছিল। আমার এক আপন চাচা, তিনি প্রশাসনে কর্মরত ছিলেন, তার সুপারিশে সেই জিডিটা নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই জিডিটা নেয়ার পরে জিডির অপরাধে আমার ওই চাচাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের মধ্যদিয়ে ২৩ দিন আমাকে গুম রাখার পরে আমাকে চালান দেয়। কিন্তু চার মাস পরেই আমি মামলায় হাইকোর্টের মাধ্যমে আমি যখন জামিন পাই, কিন্তু সে জামিন পেয়ে আর বের হতে পারি না। জেলগেট থেকে আমাকে আবারো নতুন করে গুম করা হয়। বলছিলেন কাইয়ুম। তিনি বলেন, র্যাব-১১-এর এক কর্মকর্তা আমাকে চালান দেয়ার সময় বলছিল, ‘তোকে কে জামিন করালো? তোরে যদি কেউ জামিন করায়, নিষেধ করে দিস। কারণ তুই যদি জামিনে বের হোস, তাহলে তোরে গেট থেকেই তোর টেক অফ করে দেয়া হবে।’
গুমের বর্ণনা দিয়ে কাইয়ুম বলেন, আমাকে যখন গুম করা হয় তখন এই ২৩ দিনের মধ্যে এমন কোনো নির্যাতন নাই যা আমার সঙ্গে করা হয়নি। ২৩ দিনে আমার প্রতিদিনই মনে হতো যে আজকে মারা যাবো, হয়তো আর জীবনে আর বাঁচার কোনো স্বপ্ন নেই। নির্যাতনের বর্ণনা নানা ধরনের, তার মধ্যে সবচাইতে যে বর্ণনাটা বলা যায় না, উলঙ্গ করে একটা মানুষকে তারপরে ঝুলিয়ে পিটানো, এটা সম্ভবত অধিকাংশ লোকের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। মা-বোনদের নিয়ে যে বিশ্রী ভাষায় তারা গালাগালি করতো এবং আমাদের একপর্যায়ে বলতো, ‘তোর স্ত্রীকে, তোর বোনকে, তোর মাকে এনে ধর্ষণ করা হবে।’ এসব কথা বলে একটা মানুষকে সারাদিন পিটানোর চেয়ে সবচাইতে মানসিক যন্ত্রণা দেয়া হতো।
গুমের শিকার হওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, যেই আইন করা হয়েছে, এখানে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তি সব প্রমাণ করতে না পারলে ৫ বছরের দণ্ড। তিনি বলেন, গুম তো করা হয় ওইভাবে, যাতে কোনো আলামত রাখা না হয়, প্রমাণ করবেন কীভাবে? এই জিনিসটা আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে না বুঝান, কিছু বলার নাই। আমি অনুরোধ করবো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, আমার ভাবী, একটু হোমওয়ার্ক করুক। ভাবী কীভাবে প্রমাণ করবে সালাহউদ্দিন সাহেব গুম হয়েছেন? এটা তো উনি করতে পারে। উনি তো গুম ছিলেন।
এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত আমি দুইবার গুম হয়েছি। কিন্তু দ্বিতীয়বার যে গুম হলাম, আমি নাম দিলাম, তাদের অ্যারেস্ট করা যায় নাই? বা আমি জানি না কে আমারে আসলে গুম করছে। ডিজিএফআই? নাকি ডিবি? কারণ আপনারা ওই জায়গাতে বেরিয়ে আসতে পারেন নাই। আপনারা কোনো এক ব্যক্তিকে ভয় পান, যার জন্য কোনো কাজ করতে পারতেছেন না। আমি কেন জানবো না কে আমাকে গুম করছে?
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধন চান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। ক্যারিয়ারে সরাসরি আইনিভাবে লড়ে তিনটি গুমের বর্ণনা দেন এই সংসদ সদস্য। এর মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হওয়ার সময়ের বর্ণনা দেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি তিনটা ঘটনার দেখা পেলাম। কমপ্লেন নিজেই জানে না, কে নিয়ে গেছে! যেমন ইলিয়াস আলীর গুমের বিষয়টি পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি ইনকোয়ারি করে, ডিবি প্রমাণ করতে পারেনি আর সিভিলিয়ান প্রমাণ করবে! এইটা আমার মনে হয় রিজনেবল না। এই আইনে শাস্তি রিজনেবল না। তবে মিসইউজের চান্স আছে। হয়তো যারা ল’টা ড্রাফট করেছিল, তাদের মাথার মধ্যে ছিল যে মিসইউজ হতে পারে আইনটা, এজন্য হয়তো বা এটা করতে পারে। এজন্য আমার মনে হয়, এইভাবে না করে অন্য কোনো শব্দ বা অন্য কোনো সেন্টেন্স ইউজ করা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি। আর আমার কাছে মনে হয়, পুলিশের কাছেও গুমের ইনকোয়ারি দেয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়েছে। আমার মনে হয় যে, দীর্ঘ সময়ের জন্য যদি এই আইনটা রাখতে চাই, আইনটা পোলিশড হতে হবে, সর্বজনীন হতে হবে এবং কেননা বাংলাদেশে তো অন্য দেশগুলোতেও এমন সিচুয়েশন হতেই পারে। এটা সর্বজনীন করা উচিত বলে আমি মনে করি।
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, পূর্বের সরকার গুম কমিশন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করে গিয়েছিল। এটিকে আরও বেশি অর্থায়ন করে, এটিকে আরও বেশি শক্তিশালী করে, আরও বেশি ইন্ডিপেন্ডেন্ট করার কথা ছিল। এই আইন দিয়ে এই দু’টি প্রতিষ্ঠানকে বিকলাঙ্গ করে দেয়া হয়েছে। একজন গুমের ভিকটিম হয়ে এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু হতে পারে না। যখন আমি ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, আমি শুধু একটি জিনিস দেখি- আমাদের সন্তানদেরও মতামত প্রকাশ করার সময় এই ভয়ে থাকতে হবে, ‘আমাদের গুম করা হবে’।
আলোচনা সভায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গের সংশ্লিষ্টরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
