নবায়নযোগ্য জ্বালানি

৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ, খরচ অন্য খাতে

ফন্ট সাইজ:

দেশে সবুজ ঋণ বাড়ছে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ কমছে। পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তা অন্য খাতে ব্যয় করছেন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে ঋণ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। শুধুমাত্র সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে নয়, সম্প্রতি সবুজ ঋণ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, চালকল, টিম্বার মিল ও অন্যান্য প্রকল্পেও দেয়া হয়েছে। যার যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকায় অনেকে সবুজ কারখানা করার কথা বলে লোন নিয়ে তা কারখানা বর্ধিত করার কাজে ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ আবার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আড়ালে ঋণ নিয়ে অন্যখাতে ব্যবহার করছেন। এমন বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গেল দুই অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানিখাতে অন্তত ৩০ হাজার ৩৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করেছেন। বছর শেষে যার বকেয়া ঋণ ছিল ৭৭ হাজার ১৪০ কোটি ২২ লাখ টাকা। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংকের ছাড় করা অর্থের মাত্র ৭.৮৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যবহার হয়েছে। বাকি টাকা অজ্ঞাত খাতে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলছে, শুরুতে ২০২১ সালে ৭ হাজার ২৩২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা সবুজ অর্থায়ন ছিল। চার বছরে তা বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। তবে দেশের জ্বালানি অবকাঠামো, পরিবেশ বান্ধব কারখানা ও বিদ্যুৎ সংকট কমেনি।

এদিকে সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসআরইডিএ)-এর প্রকাশিত নীতিমালাতেও ২০২৬-৩০ পর্যায়ে ২০ শতাংশের লক্ষ্য উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সক্ষমতা সেই লক্ষ্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এসআরইডিএ-এর তথ্যভাণ্ডারে দেশের সৌর, বায়ু ও অন্য নবায়নযোগ্য প্রকল্পের তথ্য আছে। অর্থায়নের ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রায়। ২০২৫ সালে সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্য ছিল ৬৭ হাজার ৮২০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের তথ্য রয়েছে।

তবে ২০২৫ সালের শেষে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পেয়েছে ৬ হাজার ৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। যা মোটের ৭.৮৪ শতাংশ। বড় অংশ অন্য খাতে চলে গেছে। জ্বালানি ও সম্পদ দক্ষতা খাতে গেছে ৩১ হাজার ৯৩১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এটি মোটের ৪১.৪ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ১৬ হাজার ৫২৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২১.৪ শতাংশ। দুই খাতেই গেছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ টাকা।
বাংলাদেশ যখন আমদানি করা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মুখে রয়েছে। তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাংক ঋণের এই বৈষম্য শুধু জলবায়ু নীতির সমস্যা নয়। এটি ক্রমেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও পরিণত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌর ও অন্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে ঋণ না বাড়ালে আমদানি করা জ্বালানির ওপর চাপ কমবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব পণ্য ও প্রকল্পের জন্য পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু ওই অর্থায়ন ব্যবহার এবং প্রকল্পভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে কতটি ছাদ সৌর প্রকল্প ঋণ পেয়েছে, কত টাকা পেয়েছে এবং প্রকল্পগুলো বাস্তবে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছ্তেএসব তথ্য এক জায়গায় না থাকায় অর্থায়নের কার্যকারিতা যাচাই কঠিন। সমস্যাটি শুধু অর্থের অভাব নয়; বরং অর্থায়ন কাঠামো, প্রকল্প মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, জামানত এবং পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার জটিলতা নবায়নযোগ্য প্রকল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন:
মর্মান্তিক

কোন ব্যাংক কত ঋণ দিলো: ২০২৫ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন ছিল ১ হাজার ৯৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৭৪ কোটি ৬ লাখ কোটি টাকা। জ্বালানি ও সম্পদ খাতে গেছে ৮৯৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানে গেছে ৪০৯ কোটি টাকা। একই বছর সিটি ব্যাংক নবায়নযোগ্য প্রকল্পে প্রায় ৫৮১ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। ব্যাংকটি বলছে, তাদের এই অর্থায়নে প্রায় ২০২ মেগা ওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক এশিয়া ২০২৪ সালে ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ দেন এরমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২২৩ কোটি টাকা। এদিকে ট্রাস্ট ব্যাংক বলছে, তারা ২ হাজার ৯৩৪টি বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং ৪ হাজার ২০৪টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংকও সবুজ ঋণ প্রদান করেছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্র্যাক ব্যাংককে ৬০ মিলিয়ন ইউরো দিয়েছে। যা বাংলাদেশি কোম্পানির-বিশেষ গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, সার্কুলার ইকোনমি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে।

জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান (আইইইএফএ)’র হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৯৩৩ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হতে পারে। অথচ ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বার্ষিক গড় বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২৩৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ঐতিহাসিক গড়ের প্রায় চারগুণ। আইইইএফএ’র বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, সবুজ অর্থায়ন বাড়লেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনো পোর্টফোলিওর প্রায় ৮ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রয়োজন এবং ঝুঁকি বেশি মনে হওয়ায় নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো পিছিয়ে পড়ছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতাতেও সমস্যা আছে।

শিল্প প্রতিষ্ঠান খানটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির সালিম প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ মেগাওয়াট ছাদ সৌর প্রকল্প করতে চার-পাঁচটি ব্যাংকে যান। কেউ সরাসরি না বলেনি। কিন্তু বারবার কাগজ চাওয়া হয়। সময়ও যায়। শেষে প্রকল্পটি বাতিল করেন তিনি। সালিম বলেন, সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়নি। কিন্তু বারবার কাগজপত্র চাওয়ার কারণে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মানুষ এসব প্রকল্পের পেছনে ছোটা বন্ধ করে দেয়।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর অর্থের অভাবে আটকে নেই। এটি নীতিগত ঘোষণা ও আর্থিক বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কারা পেলো, কোথায় গেল টাকা: ব্যাংকগুলোর প্রকাশ্য নথিতে সবুজ ঋণ পাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়। ব্যাংক এশিয়া-এর প্রদর্শন সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স পোর্টফোলিওতে পাওয়া নামের মধ্যে রয়েছে- স্পেকট্রা সোলার পার্ক লিমিটেড, ইকোটেক্স লিমিটেড, ইকোকনিটস লিমিটেড, রবিনটেক্স বিডি লিমিটেড, ফারিহা স্পিনিং মিলস লিমিটেড, অ্যামেক্স নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, থার্ম্যাক্স ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড, ভালমর্ট সোয়েটার লিমিটেড, কোয়েট্রো ফ্যাশন, সোহা অটো রাইস মিল, নিউ মোমেনা অটো রাইস মিল, প্রগতি এগ্রো ফুড লিমিটেড, প্লামি ফ্যাশন, ফুজি নিট ওয়্যার, ফেম সোয়েটার, পসমি সোয়েটার এবং কোয়াট্রো ফ্যাশন লিমিটেড-এর মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একমাত্র প্রতিষ্ঠানের অর্থের উদ্দেশ্য সোলার পার্ক, গ্রিন বিল্ডিং, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং বর্জ্যপানি শোধনাগার রয়েছে।

অনিয়মের প্রশ্ন, স্বচ্ছতা নিয়ে ঘাটতি: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ঋণগ্রহীতার পূর্ণ তালিকা নেই। প্রকল্পভিত্তিক টাকার হিসাবও এক জায়গায় নেই। ঋণের টাকা ঘোষিত কাজে গেছে কি না, প্রকল্প হয়েছে কি না তারও পূর্ণ তথ্য প্রকাশ্যে নেই। আর সবুজ ঋণের বড় অংশ অন্য খাতে গেলেও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে অংশ ৭.৮৪ শতাংশ। এতে সরকারি লক্ষ্যের সঙ্গে ব্যাংক ঋণের মিল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এবং সবুজ ঋণের টাকা কারা পেলো, কী শর্তে পেলো, কোথায় বিনিয়োগ করলো এবং বিনিয়োগের বিনিময়ে কতটা পরিবেশগত ফলাফল পাওয়া গেল সেই হিসাব প্রকাশ্যে আনা হয়নি। কোন প্রতিষ্ঠান কত নবায়নযোগ্য প্রকল্প ঋণ পেয়েছে, কত মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, অর্থ ছাড় হতে কত সময় লেগেছে এবং এসব প্রকল্প কতটা আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিস্থাপন করতে পারছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ব্যাংকভিত্তিক ও প্রকল্পভিত্তিক একটি উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ডে ঋণগ্রহীতা, ঋণের পরিমাণ, প্রকল্প, মেয়াদ, সুদহার, প্রকল্পের অবস্থান ও বাস্তবায়ন-অবস্থা প্রকাশ করা।