বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে হিমালয়ঘেরা দেশ নেপাল। দুর্যোগে বিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী। এদিকে নেপালে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর গতকাল ফের অভিযান শুরু হয়। এখনও প্রায় ৩ হাজার নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
গত বুধবার হিমবাহ ধসে পাহাড়ি নদীগুলোতে নেমে আসে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত। মুহূর্তেই ভেসে যায় বহু ভবন, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। নেপালে এ ঘটনায় অন্তত ৬৬৯ জন নিহত হয়েছেন। চীনের তিব্বতে প্রাণ গেছে আরও সাতজনের। নিখোঁজদের মধ্যে নেপালে রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ ৫৫৪ জন। তাদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের বড় একটি অংশ ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কারিগরি সহায়তার আহ্বান ও পুনর্বাসনের বিশাল ব্যয়: নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানান, সাধারণ তল্লাশি ও উদ্ধারকাজের জন্য তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধার, ধ্বংস হওয়া যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় ধরে মৃতদেহ সংরক্ষণের মতো বিষয়ে তাদের বিশেষজ্ঞ টিমের সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে আমাদের পর্যাপ্ত দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান নেই, সেসব ক্ষেত্রে আমরা ইতিমধ্যে বিশেষায়িত পরিষেবা ও কারিগরি সহায়তার জন্য অনুরোধ করেছি। ভারত ও চীন থেকে সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে নেপালে পৌঁছে উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া ভারত ৬০ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। অন্যদিকে নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানান, পুনর্বাসনের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি প্রাথমিক হিসাব। ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিরূপণ করা হচ্ছে।
পচন ধরা মৃতদেহ ও স্বজনদের হাহাকার: নেপালে ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। যাদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক। কাঠমান্ডুর মহারাজগঞ্জ মেডিকেল ক্যাম্পাসের বাইরে নিখোঁজদের স্বজনরা ভিড় করছেন। অনেকেই সীমানাপ্রাচীর ও গেটে ঝুলানো ছবি দেখে প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্তের চেষ্টা করছেন। তবে দুর্যোগের তিনদিন পর উদ্ধার হওয়া অনেক মৃতদেহ পচে বিকৃত হয়ে গেছে। ফলে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পরেছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগ ছড়ানোর আশঙ্কায় এসব মৃতদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চিতওয়ান জেলা প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মৃতদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে এবং সেগুলো একটি খোলা জায়গায় সমাহিত করা হবে। মালয়েশিয়ার ৯১ জন নাগরিক নিখোঁজ থাকায় সেখানকার স্বজনরাও চরম উদ্বেগে আছেন। নিখোঁজদের স্বজনদের প্রতিনিধি মানিবান্নান রেথিনাম এই তথ্যহীন অপেক্ষাকে ‘গভীর যন্ত্রণাদায়ক’ বলে উল্লেখ করেন।
হ্রদ ভাঙার ঝুঁকি হ্রাস ও বেঁচে ফেরা মানুষের আতঙ্ক: নেপাল-চীন সীমান্তে সৃষ্ট নতুন হ্রদটি থেকে পানি উপচে পড়ায় শুক্রবার উদ্ধারকাজ ব্যাহত হলেও শনিবার সেই ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। চীনের সমপ্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে হ্রদটি থেকে ধীরে ধীরে পানি সরে যাচ্ছে এবং এর আকার ছোট হয়ে আসছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি বিপদমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত নজরদারি অব্যাহত থাকবে। এদিকে বেঁচে ফেরা মানুষদের জন্য সামনের দিনগুলো আরও কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বন্যায় বাড়িঘর হারানো ৪৩ বছর বয়সী সরস্বতী ঘালে জানান, পানি আঘাত হানার সময় ভূমিকম্পের মতো মাটি কাঁপছিল। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার আর কিছুই (অবশিষ্ট) নেই। আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়- কে জানে।
