গণফোরামের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বক্তারা

মতের বিভেদই গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র

ফন্ট সাইজ:

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেছেন, আমরা মতের বিভেদ করি, এটাই গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র। আমার বিশ্বাস, ড. কামাল হোসেন যখন গণফোরাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তিনি গণতন্ত্রের এই মূলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করেই দলটি গড়ে তুলেছিলেন। গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সংবর্ধনা ও দলের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেনকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয় দলের পক্ষ থেকে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ছোট একটি ভূখণ্ড হলেও এর জনসংখ্যা বিপুল। সীমিত সম্পদের মধ্যেই দেশের মানুষকে জীবনযাপন ও অগ্রগতির সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কর্মসংস্থানের অভাব আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।

ড. মঈন খান বলেন, গণতন্ত্র শুধু ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগই নয়; এটি মানুষের কথা বলার অধিকার, অর্থনৈতিক সমতা, উন্নত জীবনযাপন এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার পথ। একইসঙ্গে গণতন্ত্র মানুষের মনের বিকাশ, স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার ও চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। গণতন্ত্র না থাকলে একটি দেশ সবদিক থেকেই পিছিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে আমরা বারবার হোঁচট খেয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে আমি হোঁচট খাওয়াটাকে বড় করে দেখি না। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবারই সেই হোঁচট থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং সামনে এগিয়ে গেছে। তারা সত্য, ন্যায়, জনগণের অধিকার ও নারীর অধিকারের কথা বলেছে। আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণআন্দোলনÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ গণতন্ত্র ও অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে।

গণতন্ত্রের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ নয় জানিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, এই চ্যালেঞ্জ আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে মোকাবিলা করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য নিয়েই আমাদের একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুষম সমাজ গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীর সব মানুষের মত এক হবেÑ এটি প্রকৃতির নিয়মেরও পরিপন্থি। ভিন্নমত থাকবে, তবে যুক্তি ও তর্কের মাধ্যমে যেটি সঠিক, আমাদের সেই পথে এগিয়ে যেতে হবে।

ড. মঈন খান বলেন, ড. কামাল হোসেনের জীবন থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছেনÑ কাজের ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ ও পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ড. কামাল হোসেন কীভাবে অফিস পরিচালনা করতেন, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিভাজনের দেশে গণফোরাম জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছে। আমরাও অনেকদিন তাদের সঙ্গে একসঙ্গে চলেছি। সেই স্মৃতি এখনো বুকের মধ্যে আছে। এখনো আমরা একসঙ্গে চলি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে যে পথে চলি, সেই পথের ট্রাফিক সিগন্যালগুলোর রং যেন বদলে গেছে। এখন বেশির ভাগ সিগন্যালে সবুজ কিংবা লাল বাতি দেখা যায় না, সবই যেন হলুদ। ২০২৪ সালে যে বিশাল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই আকাক্সক্ষা এখন অনেকখানি বিবর্ণ। এর কতোটা ঠিক, কতোটা বেঠিক, গত ছয় মাসে সরকার কতোটা করেছে, কতোটা করেনি, কতোটা সত্যিকার অর্থে করেছে আর কতোটা বেইমানি করেছে। এসব নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। আমরা সবাই একসঙ্গে চলবো, তার আগে বুঝতে হবে আমরা সত্যিকার অর্থে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ও ইনক্লুসিভ একটি রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণফোরাম যে লড়াই করে আসছে, সেজন্য যারা আজও গণফোরামের সঙ্গে আছেন, তাদের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে গণফোরামের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছি। গণফোরাম আজও সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

জেএসডি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি তানিয়া রব বলেন, জাতীয় ঐক্যের কথা বলতে চাই। আমরা আসলে জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি যথাযথভাবে ধারণ করি না বলেই এত বিভাজন। যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই একলা চলার নীতি অনুসরণ করি। অথচ সংঘাত, বিপদ ও সংকট যদি আমরা একসঙ্গে রাজপথে মোকাবিলা করতে পারি, তাহলে পরবর্তী কাজগুলোও হয়তো আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে করতে পারতাম। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

যখন একটি বিপদসংকুল সময় পার হয়ে আসি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন পরবর্তীতে কেন সেই অভিজ্ঞতা ও ঐক্যের বিষয়টিকে আমরা পাশ কাটিয়ে যাই? এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
সভাপতির বক্তব্যে গণফোরামের সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও গণফোরাম সবসময় জাতীয় ঐক্য রক্ষায় জনগণের পাশে থেকে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দলটি রাজপথে থাকবে।

তিনি বলেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে আমাদের চলতে হয়েছে। দেশের রাজনীতির বিভিন্ন বাঁক এবং পট পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে গণফোরাম সবসময় জাতীয় ঐক্যকে রক্ষা করে পথ চলার চেষ্টা করেছে। জনগণ গণফোরামের এই ঐতিহাসিক ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটা আমরা আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। এ সময় ড. কামাল হোসেনের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান দলটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেনÑ অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান।