ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। কালিউড়ি নদীর পানিতে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ার আগেই নিস্তব্ধতা ভাঙে ডানার শব্দে। একের পর এক পানকৌড়ি উড়ে এসে বসে উঁচু গাছের ডালে। কোথাও সাদাবকের আনাগোনা। কোনোটি ঠোঁটে খাবার নিয়ে ফিরছে বাসায়, কোনোটি ডানা মেলে রোদ পোহাচ্ছে। গাছের ডালে ডালে ব্যস্ততা- যেন ঘুম ভাঙতেই শুরু হয়েছে পাখিদের নিজস্ব এক নগরজীবন। নিচে দোয়ারাবাজার থানা। আর তার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে কালিউড়ি নদী। মানুষের কোলাহল আর প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝখানে উঁচু গাছগুলোতে গড়ে উঠেছে পাখিদের এক নিরাপদ সংসার। সেখানে শত শত পানকৌড়ি ও বক মিলেমিশে বসবাস করছে। জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রাণ। পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে থানা আঙিনা।
যেখানে মানুষের হাতে একের পর এক পাখির আবাস হারিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হাওরের জলাভূমি আর বৃক্ষরাজির ওপর প্রতিনিয়ত পড়ছে মানুষের চাপ, সেখানে কালিউড়ির তীরে কয়েকটি গাছ যেন প্রকৃতির কাছে মানুষের রেখে যাওয়া শেষ কয়েকটি নিরাপদ দরজা। সেই দরজা দিয়েই ফিরে এসেছে পাখিরা।
দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত পাখিময় সেই দিনগুলো। থানা ও তার আশপাশ, কামারপট্রি এলাকা কিংবা হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি-সবখানেই ছিল পাখিদের অবাধ বিচরণ। সকাল হতো পাখির ডাকে, সন্ধ্যা নামতো ডানার শব্দে। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, বদলেছে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্ভরতার ধরনও। গাছ কাটা, জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া, পাখি শিকারসহ নানা কারণে ধীরে ধীরে কমেছে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। যে হাওর একসময় হাজারো পাখির ডানায় মুখর থাকতো, সেখানেও এখন অনেক প্রজাতির দেখা মেলে কদাচিৎ। পাখিরা অবশ্য মানুষকে ছেড়ে যায়নি পুরোপুরি। তারা শুধু নিরাপদ জায়গা খুঁজেছে। আর সেই খোঁজে কালিউড়ি নদীর তীরের কয়েকটি উঁচু গাছ হয়ে উঠেছে তাদের আপন ঠিকানা।
সকাল একটু গড়ালেই দৃশ্যটি আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। নদী থেকে পানকৌড়ির দল উড়ে আসে। কেউ ডালে বসে, কেউ আবার বাসার কাছে ঘুরঘুর করে। সাদাবকেরাও যোগ দেয় সেই কোলাহলে। উঁচু গাছগুলোর দিকে তাকালে কোথাও দেখা যায় বাসা। কোথাও পাখির বাচ্চা। মা-বাবা পাখির আনাগোনায় মুখর হয়ে ওঠে বাসার চারপাশ। খাবারের জন্য ছুটে যাওয়া, ফিরে এসে বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দেওয়া- প্রকৃতির চিরন্তন এই দৃশ্য এখন প্রতিদিনই দেখা যায় থানা আঙিনায়। পাখিদের কাছে জায়গাটি কেবল রাত কাটানোর আশ্রয় নয়; এটি তাদের প্রজননস্থল, নিরাপদ আবাস এবং নতুন প্রজন্মকে পৃথিবীতে আনার ঠিকানা।
থানার আশপাশের মানুষের কাছে পাখিদের এই উপস্থিতি এখন নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তাদের ডাকাডাকি। নিস্তব্ধ রাত পেরিয়ে নতুন দিনের আগমনী বার্তা যেন তারাই দেয়। থানা চত্বরে দায়িত্ব পালন করা মানুষদের কাছেও দৃশ্যটি আলাদা এক অনুভূতির জন্ম দেয়।
প্রকৃতির এই দৃশ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হয়তো এখানেই। পাখিদের ফিরে আসতে খুব বেশি কিছু লাগে না। লাগে নিরাপদ আশ্রয়, কিছু উঁচু গাছ, জলাভূমি আর মানুষের একটু সহমর্মিতা। কালিউড়ির তীরের এই পাখির আবাস যেন সেই সত্যেরই জীবন্ত প্রমাণ। মানুষের অত্যাচার থেকে কয়েকটি গাছকে রক্ষা করা গেছে বলেই সেখানে পাখিরা নিশ্চিন্তে বাসা বাঁধতে পেরেছে। প্রজনন করতে পেরেছে। নতুন প্রজন্ম জন্ম নিতে পেরেছে। একটি পাখির নিরাপদ বাসা আসলে শুধু একটি বাসা নয়; এটি একটি এলাকার জীববৈচিত্র্যের বেঁচে থাকার গল্প।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই পাখির আবাসস্থলটি যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। গাছগুলো রক্ষা করা, পাখি শিকার বন্ধ করা এবং প্রজনন মৌসুমে পাখিদের বিরক্ত না করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা গেলে কালিউড়ির তীর আরও বড় পাখির অভয়াশ্রমে পরিণত হতে পারে। কারণ পাখিরা চলে গেলে শুধু আকাশটা ফাঁকা হয় না; ফাঁকা হয়ে যায় প্রকৃতিরও একটি অধ্যায়।
দোয়ারাবাজারের মানুষ তাই হয়তো আবার সেই পুরনো সকাল দেখতে চান, যে সকালে ঘুম ভাঙবে পাখির ডাকে, হাওরের আকাশ ঢেকে যাবে ডানায়, নদীতীরের গাছগুলো ভরে থাকবে বাসায় বাসায়। কালিউড়ির তীরে এখন সেই স্বপ্নেরই ছোট্ট শুরু। থানা চত্বরের উঁচু গাছগুলোতে পানকৌড়ি আর সাদাবকের এই বসতি যেন প্রকৃতির এক নীরব প্রত্যাবর্তন। মানুষ যখন একের পর এক আশ্রয় কেড়ে নিচ্ছে, তখনও কয়েকটি গাছ আঁকড়ে ধরে পাখিরা জানান দিচ্ছে- প্রকৃতিকে বাঁচার একটু সুযোগ দিলেই, প্রকৃতি তার সৌন্দর্য নিয়ে ফিরে আসে।
